কলকাতা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সময় যেন থমকে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলালেও চিত্রনাট্য বদলায় না। ঠিক এক মাস আগের সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আবার ফিরে এল—নতুন অথচ পরিচিত কায়দায়।

শেষ আপডেট: 24 January 2026 13:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সময় যেন থমকে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলালেও চিত্রনাট্য বদলায় না। ঠিক এক মাস আগের সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আবার ফিরে এল—নতুন অথচ পরিচিত কায়দায়। ২৩ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ (Aritra Mukherjee, Bhanupriya Bhooter Hotel )-কে ঘিরে শুরু হয়ে গেল এক অদৃশ্য আক্রমণ, যেখানে অস্ত্র সিনেমা নয়, অস্ত্র ডিজিটাল রেটিং, ফেক প্রোফাইল আর বট বাহিনী।
ছবি মুক্তির আনন্দ তখনও পুরোপুরি উপভোগ করা হয়নি, তার মধ্যেই পরিচালক অরিত্র মুখোপাধ্যায়ের সামনে ভেসে উঠল অদৃশ্য ছায়া। পরিচালকের অভিযোগ ‘বুক মাই শো’-তে একের পর এক রেটিং কমতে শুরু করেছে তাঁর ছবি। ছবির গল্প দেখার আগেই যেন রায় লেখা হয়ে গেছে। এই দৃশ্য টলিউডের কাছে নতুন নয়।
মাত্র এক মাস আগে, রানা সরকার প্রযোজিত ও সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ মুক্তির সময়ও একইভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রেটিংয়ের বন্যা নামিয়ে ছবির ভবিষ্যৎ ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তখন প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল গোটা ইন্ডাস্ট্রি, পৌঁছেছিল লালবাজারের সাইবার সেল পর্যন্ত। মনে হয়েছিল, হয়তো শিক্ষা হয়েছে। কিন্তু না—সময়ের ব্যবধান শুধু এক মাস।
পরের টার্গেটের অভিযোগ ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’-এ। অভিযোগের আঙুল উঠছে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে পরিচিত কিছু প্রভাবশালী নামের দিকে—যাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না, কিন্তু নেপথ্যে যাদের ভূমিকা নিয়ে কান পাতলেই ফিসফাস শোনা যায়। পরিকল্পনা স্পষ্ট টাকা দিয়ে তৈরি করা বট আর ফেক আইডিতে, মুক্তির দিন থেকেই নেগেটিভ ভোটে ছবির perception ভেঙে দেওয়া। দর্শক হলে ঢোকার আগেই যেন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে—এই ছবি দেখার মতো নয়।
এই পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলি তুলে ধরেন পরিচালক অরিত্র মুখোপাধ্যায়। তিনি জানান, তিনি একজন নবীন নির্মাতা—‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ তাঁর চতুর্থ ছবি মাত্র। ইন্ডাস্ট্রিতে কারও সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো নয়ই, পরিচিত মানুষের সংখ্যাও হাতে গোনা। মুক্তির আগের দিন বেহালার অজন্তা হলে হাউসফুল শো দেখার পর তাঁর মনে হয়েছিল, দীর্ঘ পরিশ্রম বুঝি সার্থক হল। হল থেকে বেরোনোর সময় দর্শকের হাসি, হাততালি আর বাচ্চাদের উচ্ছ্বাস তাঁকে আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। ফোন খুলতেই চোখে পড়ে—বুক মাই শো-তে হু হু করে নামছে রেটিং। একের পর এক নেগেটিভ ভোট, ফেক প্রোফাইলের পরিচিত ছক, সুপরিকল্পিত ম্যানিপুলেশন।
বছরের পর বছর সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এই ধরনের নেগেটিভ ভোটিং, ট্রোলিং আর সংগঠিতভাবে একটি ছবির ভাবমূর্তি ভাঙার কৌশল তাঁর অচেনা নয়। তবু আঘাতটা লাগে অন্য জায়গায়। কারণ একটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের ঘাম, স্বপ্ন আর জীবিকা—যাদের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই ছবির সাফল্যের উপর। রেটিং নামানো সহজ, ফেক আইডি তৈরি করাও কঠিন নয়। কিন্তু হলভর্তি দর্শকের উচ্ছ্বাস, স্বতঃস্ফূর্ত হাসি আর হাততালি কখনও নকল হতে পারে না।
অরিত্র জানেন, এই পোস্টে হয়তো বাস্তবে কিছু বদলাবে না। আগামীকালও রেটিং নামতে পারে, আরও ট্রোল আসতে পারে। তবু তিনি লিখেছেন একটাই বিশ্বাস থেকে—সিনেমার ভাগ্য নির্ধারিত হয় শেষ পর্যন্ত অ্যালগরিদমে নয়, অন্ধকার হলঘরের ভেতরে। আলো নিভে পর্দা জ্বলে উঠলে, তখনই দর্শকের চোখ আর হৃদয়ের সামনে সত্যিকার বিচারটা হয়ে যায়। তাঁর কাছে ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ কেবল ভূতের গল্প নয়, এটা সত্য আর মিথ্যার মুখোমুখি লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে, যত দেরিই হোক, শেষ হাসিটা যে সত্যেরই—এই বিশ্বাসেই তিনি এখনও অটল।