রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুতে ১০-১২ জনকে জেরা, তবু বয়ানে অমিল। নিরাপত্তা ও টাইমলাইন নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন।

শেষ আপডেট: 31 March 2026 14:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই যেন আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু রহস্যের জট (Rahul Arunoday Banerjee Death Mystery)। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ এখন এক নতুন চিত্র সামনে আনছে, যেখানে তথ্য আছে, কিন্তু তাদের পরিপূর্ণ মিল নেই।
জানা গেছে, ইতিমধ্যেই ১০ থেকে ১২ জনকে জেরা করেছে পুলিশ। তালিকায় রয়েছেন শুটিং ইউনিটের সদস্যরা, ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, এমনকি অভিনেতা যে হোটেলে উঠেছিলেন, সেখানকার কর্মীরাও। এই বিস্তৃত জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই উঠে আসছে একাধিক টুকরো টুকরো তথ্য, যেগুলো জোড়া লাগালে একটা ছবি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ছবিটাই ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
ঘটনার টাইমলাইন দিয়ে শুরু করা যাক।
রবিবার বিকেল, তালসারি সমুদ্রতট। ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল। বিকেলের দিকে, হালকা আলো-আঁধারির সময়, রাহুল জলে নামেন। এখানেই প্রথম প্রশ্ন—তিনি কি শুটিংয়ের প্রয়োজনে জলে নেমেছিলেন, না কি শটের বাইরে গিয়ে?
পরিচালকের বক্তব্য বলছে, দৃশ্যের অংশ হিসেবেই জলে ছিলেন তিনি। সহ-অভিনেতারাও সেই দাবি সমর্থন করছেন। কিন্তু ইউনিটের অন্য একাংশের বক্তব্য, শ্যুটিং তখন প্রায় শেষ, প্যাকআপের মুখে।
এই দ্বন্দ্বটাই তদন্তের প্রথম ধাপেই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, ঘটনার শুরুটা ঠিক কোথায়?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, জলে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই আচমকা গভীরতা বেড়ে যায়। এক মুহূর্তে ভারসাম্য হারান রাহুল। সহ-অভিনেত্রী কোনওভাবে ফিরে এলেও তিনি তলিয়ে যান। কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় অসঙ্গতি। উদ্ধারের সময়টা কখন! কেউ বলছেন, দ্রুতই তাঁকে তোলা হয়েছিল। আবার স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ সময় তাঁকে দেখা যায়নি।
এই দ্বৈত বয়ানকে আরও জটিল করে তুলছে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট। সেখানে বলা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় জলের নীচে থাকার চিহ্ন মিলেছে। ফুসফুস, খাদ্যনালি, পাকস্থলীতে অস্বাভাবিক পরিমাণ বালি ও নোনা জল ঢুকে গেছিল। অর্থাৎ, প্রশ্নটা হল, তিনি কি সত্যিই দ্রুত উদ্ধার হয়েছিলেন?
সম্ভাব্য কারণ নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ। প্রথমত, পা পিছলে পড়ে যাওয়া— সমুদ্রের তলায় হঠাৎ গভীর গর্ত থাকলে এমনটা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, স্রোতের টান— জোয়ারের সময় সমুদ্রের আচরণ অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, চোরাবালি বা সি-বেডের সমস্যা— যেখানে দাঁড়িয়ে থাকাই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই সব কারণের মধ্যে কোনটি প্রধান, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, জলের গভীরতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়াটাই মূল ট্রিগার হতে পারে।
তদন্তে আরও একটি দিক উঠে এসেছে, রাহুলের আচরণ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জেরা করে এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি, যা থেকে তাঁর আচরণে অস্বাভাবিকতা বোঝা যায়। অর্থাৎ, তিনি স্বাভাবিক অবস্থাতেই ছিলেন।
তবে প্রশাসনিক প্রশ্ন এড়ানো যাচ্ছে না। এত বড় শুটিং ইউনিট, অথচ সেখানে লাইফগার্ড নেই, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। কেন? শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়ে গেছে।
অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, নিরাপত্তা গাফিলতির ফল। খরচ বাঁচাতে নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, এই ঘটনা যেন আবার তা সামনে এনে দিল।
সব মিলিয়ে, তদন্ত এগোচ্ছে, কিন্তু উত্তর এখনও অধরা। প্রত্যেক বয়ান নতুন কিছু বলছে, আবার নতুন সন্দেহও তৈরি করছে।