রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে উঠে আসছে অদ্ভুত সমাপতন—নিজের লেখার সঙ্গে বাস্তবের মিল, সঙ্গে একাধিক অসঙ্গতি।
.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 31 March 2026 14:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কখনও কখনও জীবন এমন এক অদ্ভুত বৃত্ত আঁকে, যেখানে কল্পনা আর বাস্তব একে অপরের প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়ায়। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু (Rahul Arunoday Banerjee Death) সেই বিরল, শিউরে ওঠা সমাপতনের এক নির্মম উদাহরণ।
৪২ বছর বয়স। জলে ডুবে মৃত্যু। আর তার বহু আগে নিজের লেখা গল্পে ঠিক এই ছবিটাই এঁকে গিয়েছিলেন তিনি।
২০১৮ সালে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা গল্প ‘বান্ধবীরা’। গল্পের শুরুতেই তিনি লিখেছিলেন, “৪২ তো যাবার বয়সও না… বেরিয়ে এলাম জল থেকে… শরীর তুলেছে অন্যরা।” সেই লাইন এখন ফিরে ফিরে আসছে। কারণ বাস্তবেও ৪২ বছরেই থেমে গেল তাঁর জীবন, আর সেটাও সেই জলের তলায়।

এই সমাপতন নিছক কাকতালীয়, না কি এক অদ্ভুত পূর্বাভাস— এই প্রশ্নে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে টলিপাড়া, সর্বত্রই আলোড়ন। কিন্তু আবেগের বাইরে, ঘটনাটার ভিতরে ঢুকলে সামনে আসে আরও কঠিন, অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন।
রবিবাসরীয় বিকেল, তালসারি সমুদ্রতট। ধারাবাহিক ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-র শ্যুটিং চলছিল। বিকেলের দিকে, শ্যুটিং প্রায় শেষের পথে। ঠিক সেই সময়েই রাহুল নামেন জলে। এখানেই প্রথম বিভ্রান্তি।
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডলের বক্তব্য, তখনও শ্যুটিং চলছিল—জলের মধ্যেই একটি দৃশ্য নেওয়া হচ্ছিল। সহ-অভিনেতারাও সেই কথাই বলেছেন। কিন্তু প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং অন্য একাংশের দাবি, প্যাকআপের পর নিজেই জলে নেমেছিলেন রাহুল।
এই দ্বন্দ্বটাই গোটা ঘটনার প্রথম ধাঁধা—তিনি কি চরিত্রের প্রয়োজনে জলে নেমেছিলেন, না কি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে?
ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, সহ-অভিনেত্রীকে নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে জলের ভেতরে এগোচ্ছেন। হঠাৎই টাল সামলাতে না পেরে দু’জনেই পড়ে যান। এখান থেকেই শুরু বিপর্যয়।
সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে আসছে একাধিক দিক। প্রথমত, পা পিছলে পড়ে যাওয়া। সমুদ্রের তলায় অসমান বালির স্তর, হঠাৎ গভীর গর্ত। দ্বিতীয়ত, স্রোতের টান। সেই সময় জোয়ার ছিল, জল ছিল টানটান। তৃতীয়ত, চোরাবালি বা সি-বেডের সমস্যা। স্থানীয়দের দাবি, ওই অংশে বালির নীচে ফাঁপা জায়গা থাকে।
এই তিনের যে কোনও একটি, অথবা সব মিলিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তাঁর সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র কোনওভাবে ফিরে আসতে পারলেও রাহুল আর পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাঁকে উদ্ধার করতে সময় লেগেছিল। যদিও ইউনিটের একাংশ বলছে, দ্রুতই তাঁকে তোলা হয়েছিল। এখানেই দ্বিতীয় বড় অসঙ্গতি। উদ্ধারের সময় নিয়ে স্পষ্ট বিভ্রান্তি।
আরও প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে। ঘটনাস্থলে কোনও লাইফগার্ড ছিল না, ছিল না কোনও মেডিক্যাল টিম। সমুদ্রে শ্যুটিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই অভাব কীভাবে রয়ে গেল? এমনকি শ্যুটিংয়ের অনুমতি নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল না।
উদ্ধারের পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, তখনও তাঁর শ্বাস চলছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
এদিকে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, দীর্ঘ সময় জলের নীচে ছিলেন তিনি—ফুসফুসে প্রচুর বালি, নোনা জল। এই তথ্য আবার উদ্ধার-সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে, রাহুলের মৃত্যু যেন এক অদ্ভুত দুই স্তরের গল্প—একদিকে বাস্তবের ট্র্যাজেডি, অন্যদিকে নিজের লেখার প্রতিধ্বনি।
একজন মানুষ, যিনি লিখেছিলেন নিজের ‘অকাল’ মৃত্যু, শেষ পর্যন্ত সেই একই পরিণতির মুখোমুখি হলেন। কিন্তু এই গল্পের শেষ হয়তো এখনও লেখা হয়নি। মিসিং লিঙ্কগুলো না মেলা পর্যন্ত হয়তো তা হবেও না।