সব মিলিয়ে, এই মৃত্যু আর নিছক দুর্ঘটনার গণ্ডিতে আটকে নেই। বরং একের পর এক অস্পষ্টতা, ফাঁকফোকর আর অমিলের জটিল ছবিই সামনে আসছে।

শেষ আপডেট: 30 March 2026 19:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সত্যি বলে কি সত্যিই কিছু নেই? রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু (Rahul Arunoday Banerjee Death) রহস্য ঘিরে এই প্রশ্নটা যেন ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।
২৯ মার্চ, বিকেল পাঁচটা নাগাদ ওড়িশার তালসারি সমুদ্রতটে শুটিং চলছিল ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের। পুলিশের হাতে এসেছে সেই শুটিংয়ের ভিডিও ফুটেজ। তাতেই প্রথম বড় মোড়। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, রাহুল সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্রের হাত ধরে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগোচ্ছেন। হাঁটু জল থেকে আরও গভীরে। আচমকাই দু’জনেই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শ্বেতাকে উদ্ধার করা হলেও রাহুল হারিয়ে যান জলের তলায়।
কিন্তু এখানেই শুরু ধোঁয়াশা ও প্রশ্নের ভিড়। প্রথম প্রশ্ন ওঠে, শুটিংয়ের দৃশ্য আদৌ জলের মধ্যে ছিল কি?
কারণ, পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল জানিয়েছেন, নায়ক-নায়িকার জলে শট নেওয়া হচ্ছিল। যদি সত্যিই জলের দৃশ্য না থাকে, তবে ক্যামেরা কেন সেই মুহূর্ত রেকর্ড করছিল? আর যদি শুটিং হচ্ছিল, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোথায় ছিল?
এই সিরিয়ালের প্রযোজক সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টস-এর কর্ণধার ও লেখিকা লীনা গঙ্গোপাধ্যায়-ও প্রায় একই বয়ান দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “দৃশ্যটা ছিল সমুদ্রের পাড়ে। গভীর জলে যাওয়ার কোনও শটই ছিল না। গল্পে দেখানো হচ্ছিল, রাহুল আর শ্বেতা মধুচন্দ্রিমায় এসেছে, আর রাহুলের চরিত্রটা একটু ভীতু ধরনের। মেয়েটি তাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়—এইটুকুই।”
শুটিংয়ের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, প্রথম দিন তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন এবং সেই নৌকাতেও উঠেছিলেন। তাঁর কথায়, পরের দিনও একইভাবে চারপাশে একাধিক নৌকা মোতায়েন ছিল। তাঁর মতে, সেই কারণেই ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় নুলিয়া ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীরা পরে বিস্তারিতভাবে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করতে পেরেছেন।
রাহুলকে উদ্ধার করেছেন বলে দাবি করা নুলিয়া ভগীরথ জানার দাবি, জোয়ার আসছে বলে অভিনেতাকে জলের দিকে যেতে বারবার বারণ করা হচ্ছিল। এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, দুপুর ১২টা থেকেই তিনি শুটিং স্পটে ছিলেন। কারণ, সমুদ্রে শুটিং হওয়ায় তাঁর উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল।
ভগীরথ আরও জানান, রাহুল সাঁতার জানতেন না, তাই অনেকটা জল ঢুকে গিয়েছিল। তবে তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, হাঁসফাঁস করছিলেন। পেটে চাপ দেওয়া হলে মুখ দিয়ে কিছু জল বেরোয়, বমিও হয়। এরপর তাঁকে দ্রুত গাড়িতে তোলা হয়।
তাঁর কথায়, “ওঁরা যখন গভীর জলে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, আমি দৌড়ে গিয়ে জলে ঝাঁপ দিই। প্রথমে অভিনেত্রীকে (শ্বেতা) উদ্ধার করি। তাঁকে একটি স্থানীয় বোটের মাধ্যমে দড়ি দিয়ে তুলে দেওয়া হয়। এরপর রাহুলদাকে তুলি। তাঁকে কাঁধে করে ডাঙায় এনে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়।”
আবার ঘটনার পরেই নায়িকা শ্বেতার ভিডিও সামনে এসেছে, যেখানে শ্বেতাকে উত্তেজিত হয়ে বলতে শোনা গেছে “আধঘণ্টা আগেও আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আমিও পড়ে গেছিলাম। রাহুলদা ঠিক আছে তো?”
গোটা ঘটনা সামনে থেকে দেখা, রাহুলের গাড়িচালক বাবলু জানান, রাহুল জলে নামার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁর কথায়, 'জলের গভীরতা ভালই ছিল। আমরা যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে বেশি ছিল। আমরা বুঝতে পারিনি। জোয়ার এসেছিল, ভাল স্রোতও ছিল জলের।'
তবে তারপরেই আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বাবলু বলেন, 'ইউনিটের টেকনিশিয়ান ছেলেদের মধ্যে ৬-৭ জন নিজেদের জীবন বাজি রেখে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল দাদাকে তুলতে। কিন্তু কিছু করতে পারেনি। সহ-অভিনেত্রীও রাহুলদার সঙ্গে ছিলেন, উনি কোনও রকমে পাড়ে ফিরে আসেন। বিধ্বস্ত হয়ে যান, কিন্তু ঠিক ছিলেন। তবে দাদাকে তুলতে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়, ততক্ষণে অনেকটাই জল খেয়ে নিয়েছিলেন দাদা। সাঁতার জানতেন, হয়তো সেই সময়ে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন। সাঁতার কোনও কাজে লাগেনি।'
এই ‘দেরি’-ই এখন তদন্তের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টও তেমনটাই বলছে। রাহুলের ফুসফুসে যে পরিমাণ নোনাজল ও বালি ঢুকে গিয়েছে, তা অনেকক্ষণ জলে না থাকলে হওয়া সম্ভব নয়। বাবলুও স্পষ্ট করে বলেছেন, সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লেও, রাহুলকে তুলতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে তিনি অনেকটাই জল খেয়ে ফেলেছিলেন।
এই দেরির সময়টুকু আবার সংশয়ের মুখে পড়ে, যদি নুলিয়ার কথা সত্য বলে ধরা হয়। তাঁর বয়ানে কিন্তু এক ঘণ্টা ধরে রাহুলকে খুঁজে না পাওয়ার কথা উঠে আসেনি। তিনি পরপরই নায়িকা এবং নায়ককে উদ্ধার করার কথা বলেন।
আবার পরিচালক ও প্রযোজকের কথামতো, সিরিয়ালে গভীর জলে যাওয়ার কোনও শটই যদি না থাকে, তাহলে কেনই বা গভীর জলের দিকে নেমে যাচ্ছিলেন রাহুল, যে ঘটনার কথা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নিশ্চিত করেছেন তাঁর ড্রাইভার!
আরও একটি বড় অসঙ্গতি সামনে এসেছে। একদল বলছেন, শ্যুটিং প্যাকআপের পর রাহুল নিজেই সমুদ্রে নেমেছিলেন। অন্যদিকে, আরেকটি সূত্রের দাবি—ঘটনাটি ঘটেছে শ্যুটিং চলাকালীনই, এমনকি পরিচালকের বক্তব্যও সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। এই পরস্পরবিরোধী বয়ান গোটা ঘটনাকে আরও ধোঁয়াশায় ঢেকে দিচ্ছে।
উদ্ধার ও চিকিৎসা নিয়েও উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, জল থেকে তোলার সময় রাহুলের জ্ঞান ছিল, এমনকি তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসও চলছিল। তা হলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর অবস্থার এমন দ্রুত অবনতি হল কেন? প্রাথমিক চিকিৎসা কি যথাসময়ে এবং সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো এখন আরও জোরাল হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই মৃত্যু আর নিছক দুর্ঘটনার গণ্ডিতে আটকে নেই। বরং একের পর এক অস্পষ্টতা, ফাঁকফোকর আর অমিলের জটিল ছবিই সামনে আসছে। শ্যুটিং স্পটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল কিনা, লাইফগার্ড বা জরুরি পরিষেবার উপস্থিতি কেন দেখা যায়নি, এবং কেন ইউনিটের সদস্যদের বক্তব্যে এত অমিল— এসবই এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
ইতিমধ্যেই পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করেছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, ময়নাতদন্তের বিস্তারিত রিপোর্টই এই রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে তার আগে পর্যন্ত তালসারির ঢেউ যেন একটাই প্রশ্ন ফিরিয়ে দিচ্ছে—ঠিক কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে থেমে গেল রাহুলের জীবন?