সারেগামাপা-তে অডিশন দিতে এসে কালিকাদা আমাকে বলেছিল 'লাল মাটির দেশের লোক একটা লোকসঙ্গীত জানিস না?'

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 September 2025 16:37
এই প্রজন্মের কাছে লোকগানকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন যে প্রাণপুরুষ তিনি কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। আকস্মিক দুর্ঘটনা তাঁকে বাংলা সঙ্গীত জগৎ থেকে কেড়ে নিলেও তাঁর অবদান মুছে যাওয়ার নয়। শুধুমাত্র সঙ্গীত সাধক রূপেই নয়, সঙ্গীতের গুরু হিসেবেও তিনি প্রণম্য হয়ে থাকবেন।
আজ কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যর জন্মদিনে স্মৃতিতর্পণ করলেন তাঁর স্নেহধন্যা ছাত্রী জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়।

পৌষালী এই সময়ের নামী লোকসঙ্গীত শিল্পী হলেও তিনি ছিলেন আদতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। শান্তিনিকেতনের পৌষালী রবি ঠাকুরকেই অবলম্বন করে গান শিখেছিলেন। কিন্তু জি বাংলা সারেগামাপা-র অডিশন দিতে এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় কালিকাপ্রসাদের। কালিকার হাত ধরেই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী থেকে লোকগানের শিল্পী হয়ে উঠলেন পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়। যে অভাবনীয় ঘটনা শোনালেন দ্য ওয়ালে পৌষালী নিজেই।
কালিকাপ্রসাদ শিষ্যা পৌষালীর কতখানি জুড়ে? পৌষালী বললেন ' কালিকাদা আমার মেন্টর, গুরু। ওঁর জন্যই লোকসঙ্গীত গাইতে পারা। সারেগামাপা-তে কালিকাদার সান্নিধ্যে এসেই লোকসঙ্গীত শেখা আমার। আমি আগে কখনও লোকসঙ্গীত গাইনি। শান্তিনিকেতনে পড়েছি তাই রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়েই আমার পড়াশোনা।
কালিকাপ্রসাদদার সঙ্গে আমার 'তুমি' সম্বোধনেই কথা হত। সারেগামাপা-তে অডিশন দিতে এসে কালিকাদা আমাকে বলেছিল 'লাল মাটির দেশের লোক একটা লোকসঙ্গীত জানিস না?' এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখনও দিয়ে যাচ্ছি লোককে। আমাকে বাকি গ্রুমারাও বলেছিলেন লাল মাটির দেশের মেয়ে একটা বাউল গান জানিস না?'
সেই উত্তরটা হচ্ছে আজ আমি লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। তবে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়িনি আজও।
কালিকাদা মারা যাওয়ার আগের দিন আমাকে একটা গাজনের গান শিখিয়েছিল। গাজনের গান সাধারণত ছেলেরা গায়। মেয়েরা গায় না। এই নিয়মটা ব্রেক করেছিল কালিকাদা। দাদা সবসময় চিরাচরিত নিয়মকে ব্রেক করত। আমাকে গাজনের গানটা গাইতে দিয়ে সেই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল দাদা। 'দোহার'-এর সমগ্র টিম নিয়ে আমরা সারেগামাপা-র চৈত্র সংক্রান্ত এপিসোডে গাইব। আগের দিন রাতে গাজনের গানটা আমাকে রিহার্সাল করিয়ে গেল আর পরের দিন মারা গেল কালিকাদা। ভাবতে পারি না আজও! দাদা আমাকে বলেছিল 'গানে সুর,লয় সব থাকলেও ঠিক নুন নেই।' তখন নুন নেই ব্যাপারটা বুঝতাম না। এখন বুঝি আসলে গানে প্রাণটা না থাকলে কিছুই থাকে না। '
আরও বলেন পৌষালী 'আমাকে রাতের পর রাত জেগে লোকগানের শব্দ উচ্চারণ দাদা আমাকে শিখিয়েছিল। সারেগামাপা-র মঞ্চে আমার লোকসঙ্গীত ছিল একটা চা বাগানের গান। কালিকাদা সেদিন দাঁড়িয়ে বলেছিল 'উচ্চারণটা ভুল! শিখে নাও।' আজ আমাকে লোকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বলে চেনে না, লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে চেনে। যার জন্য আমি গর্বিত। রবীন্দ্রনাথের গান বাউল অঙ্গ থেকে টপ্পা অঙ্গের সবই গাই। দুঃখ হয় কালিকাদা নেই। কিন্তু কালিকাদা আমাকে যে দায়িত্বটা দিয়ে গিয়েছে, আমার যতদিন প্রাণ থাকবে ততদিন লোকগানকে আমি শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিয়ে যাব।

দাদার সঙ্গে আমার সেভাবে কোনও ছবি নেই। একদম ছবি তোলা পছন্দ করত না। খুব রাগারাগি করত। সবসময় বলত ক্যামেরায় নয়, মনে রাখো।
কালিকাদা যেদিন দুর্ঘটনায় মারা গেল সেদিন 'দোহার' গানের দলের সঙ্গে আমার 'বৃন্দাবনবিলাসিনী' পারফর্ম করার ছিল। মানুষ তো সহজে সুইচ অফ, সুইচ অন করতে পারি না। তখন নরম মাটি ছিলাম। দোহারের পুরো টিম, বিশেষ করে মৃগনাভীদা এসে আমার পিঠে ঠাঁটিয়ে চড় মেরে বলল 'আমরা যদি ঠিক থাকতে পারি, তুইও পারবি। শো মাস্ট গো অন। কালিকাদা বলতেন দুঃখ করা হল বিলাসিতা করা। জীবনটাই দুর্ঘটনা, মৃত্যুটা নয়। মৃত্যুটাই চিরন্তন সত্য। '