ভারতের ইতিহাসের পাতা উল্টোলেই যে ক’জন সুফি সাধকের নাম প্রেম আর আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হয়ে ভেসে ওঠে, তাঁদের মধ্যে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার নাম উচ্চারণ করলেই মনের গভীরে এক আশ্চর্য সুর ভেসে ওঠে।

শেষ আপডেট: 22 December 2025 12:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের ইতিহাসের পাতা উল্টোলেই যে ক’জন সুফি সাধকের নাম প্রেম আর আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হয়ে ভেসে ওঠে, তাঁদের মধ্যে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার নাম উচ্চারণ করলেই মনের গভীরে এক আশ্চর্য সুর ভেসে ওঠে।
হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া—যাঁর কাছে ইশক ছিল ঈশ্বরের দিকে যাওয়ার একমাত্র সেতু, যাঁর দর্শনে ভালোবাসা মানে আত্মসমর্পণ, আর মানবপ্রেম মানেই সৃষ্টিকর্তার ছোঁয়া। সেই মহামানবের নামই সম্প্রতি জড়িয়ে পড়ল এক অপ্রত্যাশিত বিতর্কে, আর তার কেন্দ্রে এসে দাঁড়ালেন বাংলার জনপ্রিয় লোকশিল্পী পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায় (Pousali banerjee, Pousali banerjee singer)।
পৌষালী মানেই মাটির গন্ধ, লোকসুরের গভীরতা আর কণ্ঠে মিশে থাকা আবেগ। ‘সারেগামাপা’ মঞ্চ থেকে উঠে এসে তিনি আজ বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ, যাঁর গানে মুগ্ধ আট থেকে আশি। কিন্তু জনপ্রিয়তার আলো যত উজ্জ্বল হয়, ছায়াও তত তীক্ষ্ণ হয়—সে কথাই যেন বারবার প্রমাণ হয়ে চলেছে। কিছুদিন আগেই সিনিয়র শিল্পী জোজোর সঙ্গে বাদানুবাদে নাম জড়িয়েছিল তাঁর। আর এবার, একেবারে অন্য প্রেক্ষাপটে, নেটদুনিয়ার তির্যক হাসির মুখে পড়লেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটে এক মঞ্চানুষ্ঠানে। সুফি আবহে ভাসতে ভাসতে পৌষালী গাইছিলেন সেই চিরচেনা গান—‘ধন্য ধন্য মেরা, ধন্য ধন্য মেরা, সিলসিলা… এলো দিল্লীতে নিজামউদ্দিন আউলিয়া’। গান শুরুর আগে শিল্পীর কণ্ঠে ধরা পড়ে শ্রদ্ধা আর দায়িত্ববোধের সুর। তিনি দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন সুফি সাধকের কিছু কথা, কিছু স্মৃতি, কিছু ইতিহাস। বলেছিলেন, দিল্লিতে তাঁর নামে দরগা রয়েছে। বলেছিলেন, আজকের দিনে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন নয়— গুগল আছে। তবু গান গাওয়ার আগে দু’চার কথা না বললে যেন গানের প্রতিই অবমাননা হয়।
সেই আবেগের মধ্যেই পৌষালী বলে ফেলেন একটি তথ্য, যা মুহূর্তেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালে। তিনি জানান, পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মায়ের হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দিল্লিতে এসেছিলেন হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া। এখানেই তৈরি হয় গণ্ডগোল। কারণ ইতিহাসের নিরিখে প্রথম অংশটি সত্য—ছোট বয়সেই বাবাকে হারান তিনি, এবং মায়ের সঙ্গেই দিল্লিতে আসেন। কিন্তু জন্মভূমির প্রসঙ্গে ঘটে যায় মারাত্মক ভুল। সুফি সাধকের জন্ম হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের বদায়ুনে, পূর্ব পাকিস্তানে নয়। আর এই একটি ভুল বাক্যই ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ার অলিগলিতে।
নেটপাড়ায় শুরু হয় কটাক্ষ। কেউ লিখলেন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ ভুল—উত্তরপ্রদেশ থেকেই তিনি দিল্লিতে গিয়েছিলেন। আবার কেউ আরও স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দিলেন, ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া এই সুফি সাধকের সময়ে ‘পাকিস্তান’ নামে কোনও দেশই ছিল না। গুগলে সহজেই পাওয়া যায় এমন তথ্য নিয়েই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভুল বলার জন্য বিদ্রুপের স্রোত নামল পৌষালীর দিকে—বিশেষ করে যখন তিনি নিজেই গুগল সার্চের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
তবে ছবির অন্য দিকও আছে। এই ট্রোলের মাঝেই একদল ভক্ত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন গায়িকার পাশে। তাঁদের বক্তব্য, একটি অনিচ্ছাকৃত তথ্যভ্রান্তির জন্য শিল্পীর কণ্ঠ, সাধনা আর সুরের প্রতি ভালোবাসাকে অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের চোখে পৌষালী প্রথমে একজন শিল্পী—যাঁর গান মানুষকে ছুঁয়ে যায়, যাঁর কণ্ঠে সুফির ইশক আজও জীবন্ত।