সময় কখনও শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। কিছু বছর মানুষের বুকের ভেতর স্থায়ী ক্ষতের মতো থেকে যায়।

‘পরবাসী’
শেষ আপডেট: 10 January 2026 15:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সময় কখনও শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। কিছু বছর মানুষের বুকের ভেতর স্থায়ী ক্ষতের মতো থেকে যায়। ঠিক তেমনই এক অস্থির, আতঙ্কিত দশক—১৯৬০—কে কেন্দ্র করে বড়পর্দায় আসতে চলেছে নতুন বাংলা ছবি ‘পরবাসী’। ইতিহাসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, শিকড় হারানোর যন্ত্রণা আর পরিচয়ের দ্বন্দ্বকে গভীর মানবিক ভাষায় তুলে ধরেছেন পরিচালক মনেট রায় সাহা।
এক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে নিয়ে এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন লোকনাথ দে, কিঞ্জল নন্দ, দেবপ্রতিম দাসগুপ্ত, স্বাতী মুখোপাধ্যায়, সবুজ বর্ধন। তাঁদের সঙ্গে দেখা যাবে আরও বহু পরিচিত মুখকে। সম্পূর্ণ হয়েছে ছবির শুটিং, রয়েছে মুক্তির অপেক্ষায়।
![]() | ![]() |
‘পরবাসী’-র আখ্যানের সূচনা পূর্ব পাকিস্তানের (আজকের বাংলাদেশ) এক ভয়াল সময় থেকে—যখন ধর্মীয় নিপীড়ন মানুষের ঘরবাড়ি, বিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ একসঙ্গে ভেঙে দিচ্ছিল। সেই অশান্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা নীমাই তাঁর পরিবারকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভারতের পথে পা বাড়ান। কিন্তু এই যাত্রা শুধুই ভৌগোলিক নয়—এই পথে হারিয়ে যায় তাঁর কন্যা অসীমা। এক মুহূর্তের বিচ্ছেদ, যা নীমাইয়ের সংসারকে চিরতরে অন্য পথে ঠেলে দেয়।
ভাগ্যের টানে তাঁরা এসে পৌঁছন উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরায়। সেখানে পুনীরাম নামের এক আদিবাসী নেতার গ্রামে আশ্রয় মেলে নীমাইয়ের পরিবারের। ধীরে ধীরে নতুন মাটিতে শিকড় গাঁথার চেষ্টা শুরু হয়। নীমাই গ্রামের শিশুদের পড়াতে শুরু করেন, যেন শিক্ষা দিয়েই নতুন জীবনের ভিত্তি গড়া যায়। পরিবারও সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। সেই আবহেই নীমাইয়ের ছেলে অতুল ও পুনীরামের মেয়ে ফুলমতির ভালোবাসা জন্ম নেয়, আর বিয়ের মাধ্যমে দুই ভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্পর্ক এক জটিল মোড়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু সময় শান্ত থাকে না। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ক্রমাগত শরণার্থী আসতে থাকায় স্থানীয় আদিবাসী সমাজে জন্ম নেয় গভীর উদ্বেগ—জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ভয়। এই আশঙ্কাকে পুঁজি করে কিছু বিপথগামী যুবকের হিংসা ধীরে ধীরে বিষ ছড়াতে থাকে। অবিশ্বাস, বিভাজন আর সংঘাত গ্রাস করে নেয় মানুষের সম্পর্ক।
![]() | ![]() |
ঠিক তখনই ঘটে আরেকটি অপ্রত্যাশিত মোড়। বহু বছর পর নীমাইয়ের পরিবারের সঙ্গে আবার দেখা হয় হারিয়ে যাওয়া অসীমার—যে এখন বাংলাদেশে পরিচিত ‘অসীমা বেগম’ নামে। এই পুনর্মিলন কোনও রূপকথার শেষ নয়; বরং আত্মপরিচয়, স্মৃতি আর বর্তমানের সংঘাতে জন্ম নেয় এক তীব্র মানসিক ট্র্যাজেডি। যে মেয়ে একদিন হারিয়ে গিয়েছিল, সে ফিরে এলেও আর আগের মতো নেই—এই সত্যই ভেঙে দেয় সবাইকে।
এদিকে অভিবাসী ও আদিবাসীদের মধ্যে সংঘাত ক্রমশ রক্তাক্ত রূপ নেয়। একের পর এক শোকের ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় নীমাইয়ের সংসার। শেষমেশ, ইতিহাস যেন আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে—নীমাইকে আবারও পা বাড়াতে হয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে, নতুন আশ্রয়ের খোঁজে, নতুন করে ‘পরবাসী’ হয়ে।
এই শক্তিশালী গল্পের প্রযোজনায় রয়েছে পূর্ব দিগন্ত ফিল্ম প্রোডাকশন, প্রযোজক অনিল দেবনাথ। ছবির সুরে আবেগের রং এনেছেন সঙ্গীত পরিচালক অমিত চ্যাটার্জি, আর ক্যামেরার ফ্রেমে সময় ও অনুভূতির নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন চিত্রগ্রাহক জায়েস নায়ার। গানগুলিতে কণ্ঠ দিয়েছেন শান, ইমন চক্রবর্তী, মেখলা দাসগুপ্ত, ইকশিতা-সহ একাধিক শিল্পী, যা ছবির আবহকে আরও গভীর ও স্মরণীয় করে তুলেছে।
‘পরবাসী’ ইতিমধ্যেই সম্মানের মুকুট পেয়েছে—৩১তম কলকাতা চলচিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে মনোনীত হয়ে দর্শকমহলে পেয়েছে উষ্ণ প্রশংসা। এবার সেই গল্পই পৌঁছতে চলেছে বৃহত্তর দর্শকের কাছে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি ছবিটি মুক্তি পাবে বড়পর্দায়, আর ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ত্রিপুরার প্রেক্ষাগৃহেও দেখা যাবে এই মানবিক ইতিহাস।
‘পরবাসী’ শুধু একটি ছবি নয়—এ এক স্মৃতির ভার, এক প্রজন্মের আর্তনাদ, আর মানুষের চিরন্তন আশ্রয়-অন্বেষণের কবিতা। ইতিহাস বদলে যায়, দেশ বদলায়, নাম বদলায়—কিন্তু ঘর খোঁজার যন্ত্রণা থেকে যায়। ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে দর্শকের হৃদয়ে ঢুকে পড়ে ‘পরবাসী’।