কিছু গল্প থাকে, যাদের কাঠামো আগে থেকেই চেনা। দর্শক জানেন, পরিণতি কী হতে পারে। তবু সেই গল্পই নতুন করে টানে।

‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’
শেষ আপডেট: 10 January 2026 14:12
কিছু গল্প থাকে, যাদের কাঠামো আগে থেকেই চেনা। দর্শক জানেন, পরিণতি কী হতে পারে। তবু সেই গল্পই নতুন করে টানে। ২০০০ সালের হলিউড ছবি What Women Want ঠিক তেমনই এক চেনা কাঠামোর সিনেমা—ন্যান্সি মায়ার্সের পরিচালনায়, রোমান্টিক কমেডির আবরণে, যেখানে নিক মার্শাল এক দুর্ঘটনার পর নারীদের মনের কথা শুনতে পারে। প্রথমে ক্ষমতাটাকে সে ব্যবহার করে নিজের সুবিধের জন্য, ঠকাতে, জিততে, নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝে ফেলে—শোনা আর বোঝার মধ্যে বিস্তর তফাত। আর সেখান থেকেই বদলে যাওয়ার গল্প শুরু হয়।
যাই হোক, এই কাঠামোর উপরই বাংলার মাটি লাগিয়ে হয়েছে ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’। গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ঝন্টু—একেবারে স্ট্রিট-স্মার্ট। জীবন তাকে চালাক বানিয়েছে, কিন্তু নারীদের মন? সেই অঙ্ক সে আজও কষে উঠতে পারেনি। মা, বোন আর ঠাকুমার সঙ্গে এক ছাদের নিচে থেকেও নারীসত্তার সূক্ষ্মতা, আবেগের স্তর, আচরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো তার কাছে ধাঁধার মতোই রয়ে গেছে। ঝন্টুর চোখে নারী মানেই বেজায় জটিল সাবস্টেন্স।

আর ঠিক তখনই ঘটে যায় অদ্ভুত ঘটনা। মা কালীর হাতে সাঁটিয়ে, অতিলৌকিক এক চড় এসে পড়ে তার গালে! যা খানিকটা বিশ্বাসের বাইরেও—আর সেখান থেকেই ঝন্টুর জীবনে নেমে আসে এমন এক ক্ষমতা, সে শুনতে পায় নারীদের মনের ভেতরের কথা। বাইরে মুখে যা বলা হচ্ছে, ভেতরে যা ভাবা হচ্ছে—এই দুইয়ের ফারাক তার কানে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। ফল? ঝন্টুর জীবন একেবারে ওলটপালট। গল্পের প্লট এটুকুই থাক...
এই ক্ষমতা যেমন ভয়ানক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তেমনই জন্ম দেয় একের পর এক কমেডি পরিস্থিতি। প্রেমের জট, সম্পর্কের টানাপড়েন, রাগ-অভিমান, আক্ষেপ—সবকিছুকে ঝন্টু নতুন চোখে দেখতে শুরু করে। কিন্তু ধীরে-ধীরে, বেঢক হাসির আড়াল পেরিয়ে সে বুঝে যায়, নারীর মন পড়ে ফেলাই শেষ কথা নয়। আসল লড়াইটা সম্মানের, বোঝার চেষ্টা করার, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার।
গল্পের সরলতা ছবির প্লাস পয়েন্ট। ঝন্টুর চরিত্রে অঙ্কুশ হাজরা একেবারে নিজের জায়গায়। একসময় যাঁকে শুধু দুর্দান্ত ডান্সার বলে দাগিয়ে দেওয়া হতো, এই ছবি সেখানে এক ধাপ এগিয়ে অঙ্কুশকে অভিনেতা হিসেবে এগিয়ে রাখতেই পারে। অভিনয়ে তাঁর ‘কমেডি’ কখনও ‘খেউর’ হয়ে ওঠে না। প্রতিটি দৃশ্যে সংলাপের টাইমিং মেপে, ঝন্টুকে দেখে হাসি বেরিয়ে আসে। ছো- ছোট সংলাপে ভর করেই অঙ্কুশ দৃশ্যের ছাপ রেখে যান।
অঙ্কুশের বিপরীতে ‘আঁখি’ চরিত্রে তাঁর বাস্তব জীবনসঙ্গিনীর উপস্থিতি ছবিকে বাড়তি বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে। তিনি শুধুমাত্র ‘সুন্দরী’ নায়িকা হয়ে থাকেননি; অভিনয়ে নিজস্ব জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন, নায়কের সমান্তরালেই। দেবরাজ ভট্টাচার্য ঝন্টুর বন্ধু (রাজ) হিসেবে সাবলীল, মসৃণ। যদিও দর্শক হিসেবে ইচ্ছে জাগে—এই বন্ধুত্বটা আরও একটু গভীরে গেলে ভালো লাগত, দেবরাজের অভিনয়ের আরও খানিকটা জায়গা থাকত। নবনিতা ও ইপ্সিতা—ঝন্টুর বোন আর আঁখির বোন—দু’জনেই পারফেক্ট কাস্টিং। কোথাও অভিনয়ের ফাঁক চোখে পড়ে না।

ছবির অন্যতম বড় সম্পদ দুই প্রবাদপ্রতিম অভিনেত্রী—সোহিনী সেনগুপ্ত এবং সোহাগ সেন। মঞ্চে যাঁরা দাপিয়ে বেড়ান, তাঁরা জানেন ক্যামেরার ফ্রেমে কতটুকু অভিনয়ই যথেষ্ট। সোহাগ সেনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অভিব্যক্তি নজরকাড়া—রাগ দেখানো অভিনয় এখানে ম্যানারিজমে রূপ নিেয়ছে, বয়স আর অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে। অন্যদিকে সোহিনী সেনগুপ্তর দেড় মিনিটের সেই মোনোলগ—একজন মায়ের ভেতরের না-বলা কথাগুলো যেভাবে তিনি উজাড় করে দেন, সেখানে দর্শকের চোখ-মনের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রতিটি শব্দ আলাদা করে থেকে যায়।
এই সিনেমা থ্রিলের জন্য নয়। চলতে চলতেই বোঝা যায়, কী হতে চলেছে। কিন্তু তাতে কোনও আক্ষেপ নেই। কারণ বুঝে গিয়েও ভালো লাগে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমেডিই এখানে মেজর ভূমিকা নেয়। আরও একটি দিক বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। ঝন্টুর ক্ষমতা মেয়েদের মনের ভেতরের কথা শুনতে পারা—এটাই গল্পের মূল চমক। কিন্তু তার চেয়েও গভীর এবং অর্থবহ হয়ে ওঠে ঝন্টুর মায়ের সেই ‘অলৌকিক শক্তি’, যেখানে কোনও দৈব ক্ষমতা ছাড়াই তিনি ছেলের মনের কথা বুঝে ফেলেন। ওই মুহূর্তে সোহিনীর মুখের অভিব্যক্তি, আর তার পরপরই অঙ্কুশের প্রতিক্রিয়া—দুটো মিলিয়ে দৃশ্যটি সত্যিই অনবদ্য হয়ে ওঠে।
তবে সব ভালো জিনিসের মতোই কিছু খটকা আছে। যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা পকাই পান্ডের চরিত্রে কৌশিক চক্রবর্তী হঠাৎ কেন উৎপল দত্তের ধাঁচে সংলাপ বলছেন—তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ছবিটিতে মহিলা মনের কথা বলা হয়েছে, খুঁটিনাটিগুলো বেরিয়ে এসেছে,তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু কিছু মুহূর্তে পুরুষদের মনকে ছোট করে দেখানোর প্রবণতাও চোখে পড়ে—আঁখির এক্স বয়ফ্রেন্ডের তন্ময়ের বাজি ধরে ‘মেয়ে তোলা’ হোক বা ক্লাইম্যাক্সে ঝন্টুর মুখে ‘দেখি তোর কোন বাপ তোকে বাঁচায়’ গোছের কিছু, যা শুনলে একটু পিছিয়ে আসতে হয়। ‘অসম্মান’ কিন্তু লিঙ্গভেদ মানে না। নারীর মন যেমন সম্মানের দাবিদার, পুরুষের মনেরও সম্মান ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, জানলার কাঁচে যদি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ কোনও মানুষ এসে ধাক্কা দেন, তা কখনওই মৃত্যুদূতের উপস্থিতি নির্দেশ করে না। চামড়ার রংকে ভয় বা অশুভতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা সমাজের জন্য কোনওভাবেই সুস্থ, ইতিবাচক কিংবা দায়িত্বশীল বার্তা বহন করে না। গোটা সিনেমা যেখানে ভবিষ্যতের প্রতি এক সুন্দর আশাবাদ তৈরি করে, সেখানে এই ধরনের একটি দৃশ্য বরং সেই অগ্রগতিকে খানিকটা পিছিয়ে দেয়।

গান-নাচ ছবির আরেক শক্তি। শিলাজিৎ একাই নিজের জায়গা তৈরি করেন, ‘ডান্ডা ২.০’ দুলিয়ে দিয়েছে। আরেকটি গান কানে ‘ কাঁটা গেঁথে’ দিয়েছে। তবে সোমলতা-দূর্নিবারের কণ্ঠে ‘শোনো গো দখিনও হাওয়া’ যদি ছবির মাঝপথে আসত, শেষ নয়—তাহলে দেখনদারি আর সুর মিলিয়ে আবেগ আরও গভীর হতো। শেষের চুমু, ‘কিস কিস খেলা’—সব মিলিয়ে মনে হয়, আরও একটু দেখার ইচ্ছে রয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’ কোনও বড়সড় চমক দেওয়ার সিনেমা নয়। এটি হাসাতে হাসাতেই বুঝিয়ে দেয়—নারী মন কোনও জটিল-কুটিল ফ্যাক্টর নয় (শিলাজিৎকে মাথায় রেখে) কোনও ধাঁধাও নয়। শোনার ক্ষমতা থাকলেই হবে না, দরকার বোঝার ইচ্ছা। আর সেই সহজ অথচ জরুরি কথাটাই, হাসির মোড়কে, মনের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পেরেছে ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’।