যে মানুষটির কণ্ঠে এক সময় প্রেমের সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছিল গোটা দেশ, যাঁর গান শুনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভালোবেসেছে, কেঁদেছে, হেসেছে— সেই সুরসম্রাট কুমার শানু এবার লড়লেন এক অন্য লড়াই।

কুমার শানু।
শেষ আপডেট: 21 October 2025 14:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যে মানুষটির কণ্ঠে এক সময় প্রেমের সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছিল গোটা দেশ, যাঁর গান শুনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভালোবেসেছে, কেঁদেছে, হেসেছে— সেই সুরসম্রাট কুমার শানু এবার লড়লেন এক অন্য লড়াই। গান নয়, আদালতের মঞ্চে। কারণ, তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর— এমনকি তাঁর পুরো ব্যক্তিত্বই নকল করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল অনলাইন দুনিয়ায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং-এর অপব্যবহার করে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেই মামলা করেন বলিউডের ‘মেলোডি কিং’।
১৫ অক্টোবর দিল্লি হাইকোর্টে সেই মামলায় বিচারপতি মনমিত প্রীতম সিং অরোরা জারি করেন একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ। তাতে স্পষ্ট বলা হয়— কুমার শানুর নাম, ছবি, কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব বা তাঁর কোনও দিক— অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কোনও ভিডিও, ফটোগ্রাফ, জিআইএফ বা মর্ফ করা ছবি— যাই হোক না কেন— তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে কাজে লাগিয়ে কেউ বাণিজ্যিক লাভ তুলতে পারবে না।
গায়কের দাবি ছিল, এই অপব্যবহার তাঁর personality rights ও publicity rights-এর সরাসরি লঙ্ঘন। এমনকি তিনি ‘Kumar Sanu’ নামটিকেও একটি ট্রেডমার্ক হিসেবে সুরক্ষার দাবি জানান।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ—কুমার শানু দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতের জগতে নিজের সুনাম ও খ্যাতি তৈরি করেছেন। তাই তিনি একজন সেলিব্রিটি, এবং একজন সেলিব্রিটি হিসেবে তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠ বা চেহারার মতো ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করার অধিকার তাঁর আছে। আদালতের মতে, শানুর এই গুণাবলি বা ব্যক্তিত্বের উপাদানগুলি protectable elements। এই ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা না দিলে তাঁর সুনাম ও মর্যাদায় অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। তাই আদালতের স্পষ্ট মত— একজন শিল্পী নিজের বিকৃত বা অপমানজনক উপস্থাপনের বিরুদ্ধে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার পূর্ণ অধিকার রাখেন।
গায়কের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট সানা রইস খান যুক্তি দেন— গায়কের নাম ও চেহারার অননুমোদিত ব্যবহার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এতে ভুলভাবে মনে হতে পারে, ওই ভুয়ো কনটেন্ট বা বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কুমার শানুর কোনও সম্পর্ক বা অনুমোদন আছে। অথচ এসব ভিডিও, পোস্ট ও অডিও কনটেন্টে AI-এর সাহায্যে কুমার শানুর কণ্ঠ ও মুখ বিকৃত করে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে অশ্লীল ভাষা বা অপমানজনক মন্তব্যও থাকছে। এতে গায়কের সুনাম নষ্ট হচ্ছে, তাঁর মর্যাদা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে এই অভিযোগ কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুযায়ী সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য।
প্রতিপক্ষ হিসেবে আদালতে হাজির হয়েছিল গুগল, মেটা, ফ্লিপকার্ট ও অ্যামাজনের মতো সংস্থাগুলি। মেটার পক্ষ থেকে জানানো হয়— ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে থাকা অভিযোগিত কয়েকটি অ্যাকাউন্ট ইতিমধ্যেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুগল জানায়— শানুর দেওয়া বেশ কয়েকটি ভুয়ো ইউআরএল ইতিমধ্যেই সরানো হয়েছে, বাকি ইউআরএল-ও আদালতের নির্দেশ অনুসারে মুছে ফেলা হবে। ফ্লিপকার্ট ও অ্যামাজনও আদালতের সমস্ত নির্দেশ মানার প্রতিশ্রুতি দেয়।
কুমার শানু—বলিউডের মেলোডি কিং। ৪২ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগীত জগতে এক অনন্য উপস্থিতি। ‘আশিকি’ (১৯৯০)-র গানেই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন কোটি হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। টানা পাঁচ বছর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জয়ী এই শিল্পীর কণ্ঠ এক সময় ছিল ভালোবাসার অন্য নাম। সেই কণ্ঠই আদালতের রায়ে ফিরে পেল নতুন মর্যাদা— নিজের অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার। প্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে কৃত্রিমতা দিন দিন গ্রাস করছে বাস্তবকে, সেখানে এক সুরকারের সততার জয় যেন হয়ে উঠল সময়ের এক নিঃশব্দ সুর।