প্যারিসের আলো ঝলমলে শহর। আর সেই শহরের ‘Gange sur Seine Indian Film Festival’-এর মঞ্চে বিশেষ সম্মান পেলেন অঞ্জনপুত্র নীল দত্ত।

নীল দত্ত।
শেষ আপডেট: 16 October 2025 12:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্যারিসের আলো ঝলমলে শহর। আর সেই শহরের ‘Gange sur Seine Indian Film Festival’-এর মঞ্চে বিশেষ সম্মান পেলেন অঞ্জনপুত্র নীল দত্ত। প্রথম পরিচালিত ছবি ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’–এর জন্য পেলেন Special Jury Prize। এ যেন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—যেখানে প্রথম ছবিতেই নীল পৌঁছে গেলেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের আসরে, সিনেমার মক্কা প্যারিসে।
বাঙালি জীবনে বিয়ে মানেই যে শুধু সাজসজ্জা, গান, নাচ আর রঙিন আলো নয়—এই বিশ্বাস নিয়েই নিজের সিনেমার জন্ম দিয়েছেন নীল দত্ত।
তাঁর চোখে বিয়ে মানে হাসি যেমন, তেমনই কান্না, টানাপড়েন আর সমাজে লুকিয়ে থাকা নানা ট্যাবু। সেইসব জটিল আবেগ-অনুভূতিকে বড়পর্দায় ধরেছেন তিনি ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’-তে। একঝাঁক নতুন মুখকে নিয়ে তৈরি হয়েছে এই সামাজিক ছবি। অভিনয়ে রয়েছেন শ্রীময়ী ঘোষ, আলকারিয়া হাশমি, অনুষা বিশ্বনাথন, শাওন চক্রবর্তী, অর্ঘ্য রায়, সাশ্রীক গঙ্গোপাধ্যায়, অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনিরুদ্ধ গুপ্ত।
নীল প্যারিস সফরের আগে ‘দ্য ওয়াল’-কে বলেন, “বাঙালি পরিবারে বিয়ের বিষয়টা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে ছয়ের, সাতের বা আটের দশকের বিয়ের সঙ্গে এখনকার প্রজন্মের বিয়ে এক নয়। সময় বদলেছে, চিন্তাভাবনাও বদলেছে। কিছু সামাজিক ট্যাবু আজও আমাদের ঘিরে রয়েছে। তাই এই ছবি যেমন আধুনিক, তেমনই প্রয়োজনীয়।”

ছবির কেন্দ্রে রয়েছে এখনকার তরুণ-তরুণীদের চোখে বিয়ের ধারণা। আজকের প্রজন্ম বিয়ে মানে কী ভাবে, কীভাবে দেখছে এই প্রথাগত প্রতিষ্ঠানটিকে—সেই দৃষ্টিভঙ্গিই ছবির মূল সুর। নীলের কথায়, “রঙচঙে জাঁকজমক আর হইচইয়ের আড়ালে অনেক সমস্যা, অনেক গল্প চাপা পড়ে যায়। ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’ সেই অজানা গল্পগুলোকেই সামনে আনে।”
তবে শুধু বাংলা নয়, নীল চেয়েছেন তাঁর ছবিটিকে একেবারে গ্লোবাল রূপ দিতে। “ছবিতে অনেক ইংরেজি সংলাপ রয়েছে। তাই আমি একে শুধু বাংলা ছবি বলতে চাই না, এটা আসলে এক আন্তর্জাতিক গল্প,” এও বলেন তিনি।
আরও এক মিষ্টি চমক—এই ছবির পেছনে রয়েছেন তাঁর বাবা, কিংবদন্তি অঞ্জন দত্ত। এতদিন নীল ছিলেন অঞ্জনের ছবির সুরকার। কিন্তু এবার যেন উল্টে গেল গল্পের পাতা। ছেলের প্রথম ছবির গানের কথা লিখেছেন বাবা, গেয়েছেনও একটি গান, এমনকি একটি গানের সুরও বেঁধেছেন তিনি। নীল হেসে বললেন, “এটা যেন একেবারে রোল রিভার্স!”
‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’ শুধু নীলের নয়, একদল নতুন শিল্পীরও প্রথম পদক্ষেপ। সিনেমাটোগ্রাফার থেকে চিত্রনাট্যকার—সবার হাতেখড়ি এই ছবিতেই। চিত্রনাট্য লিখেছেন উষ্ণক বসু, নীল দত্ত, শাওন চক্রবর্তী ও অর্ণব ঘোষ। ক্যামেরার পেছনে রয়েছেন অরিত্র চৌধুরী। প্রযোজনায়ও রয়েছে এক অনন্য জুটি—অঞ্জন দত্ত ও নীল দত্ত একসঙ্গে প্রযোজনা করেছেন ছবিটি। সুরের দায়িত্বে নীল, আর গানের কথায় অঞ্জন দত্ত।

প্যারিসে প্রিমিয়ারের সময়ই ছবিটি নিয়ে উচ্ছ্বাস ছিল তুঙ্গে। অক্টোবরের ১০ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত Gange sur Seine Film Festival International Competition-এ দেখানো হয় ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’। আর সেখানেই বিশেষ জুরি পুরস্কার জিতে নেয় নীলের প্রথম ছবি।
শেষমেশ, ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’ শুধু একটি বিয়ের গল্প নয়—এ যেন বাঙালির প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলা অনুভূতির সেতুবন্ধন। হাসির ফাঁকে যে থাকে অজানা দীর্ঘশ্বাস, আলো-ঝলমলে সাজের আড়ালে যে থাকে না-বলা গল্প, সেইসব মুহূর্তগুলোকেই ছুঁয়ে গেছে নীলের সিনেমা। প্যারিসের রূপালি পর্দায় যখন বাজল ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’–র সুর, তখন মনে হল—এক নতুন পরিচালক জন্ম নিলেন। অঞ্জনের সুরের ঘরে বড় হওয়া নীল এবার নিজের সিনেমার ভাষায় জানিয়ে দিলেন, বিয়ে মানে শুধু বন্ধন নয়—এ এক বদলে যাওয়া সময়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভালোবাসার সুর বাজে এক নতুন ছন্দে।