হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে কয়েক দিন আগেই বাড়ি ফিরেছেন নচিকেতা চক্রবর্তী। কিন্তু তাঁর ফিরে আসা যেন শুধুই শারীরিক সুস্থতার খবর নয়—এ এক দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর নিত্য লুকোচুরির আর-এক অধ্যায়।

নচিকেতা চক্রবর্তী।
শেষ আপডেট: 17 December 2025 15:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে কয়েক দিন আগেই বাড়ি ফিরেছেন নচিকেতা চক্রবর্তী (Nachiketa Chakraborty )। কিন্তু তাঁর ফিরে আসা যেন শুধুই শারীরিক সুস্থতার খবর নয়—এ এক দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর নিত্য লুকোচুরির আর-এক অধ্যায়।
হার্টের জটিল সমস্যা নিয়ে শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন শিল্পী। চিকিৎসার মাঝেই, সাদা হাসপাতালের বিছানায় বসে, হাতে কাগজ-কলম তুলে নিয়েছিলেন তিনি। শব্দে শব্দে বন্দি করেছিলেন নিজের মনে জমে থাকা প্রশ্ন, বিস্ময় আর অভিমান—যেন গান না হলেও জীবন নিজেই লিখে নিচ্ছে তাঁকে।
এই ক’দিনে সমাজমাধ্যমে চোখে পড়েছে নানা ছবি। কোথাও অনুরাগীদের প্রার্থনার ভিড়, কোথাও আবার তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে অদ্ভুত সব গুজব। সেই সব দেখেই কি না কি শিল্পীর মনে জন্ম নিয়েছে কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। সম্প্রতি ভাগ করে নেওয়া এক ভিডিয়োবার্তায় নচিকেতা নিজেই সে সব প্রশ্নের দিকে ইশারা করেছেন—চেনা ব্যঙ্গ, চেনা তির্যক হাসি আর গভীর এক জীবনবোধে মোড়া কথায়।
ভিডিয়োর শুরুতেই তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে এক আশ্চর্য দার্শনিক স্বীকারোক্তি—“মৃত্যুর মুখ থেকে বার বার ফিরে আসতে আমার মন্দ লাগে না।” অথচ সেই বার্তার শেষদিকে হঠাৎই সুর বদলায়। তিনি বলেন, “এ বার আপনারা যদি আবার আমার মৃত্যুঘোষণা করেন, কথা দিচ্ছি—মরে যাওয়ার চেষ্টা করব।” জীবনের গান গেয়ে যাওয়া শিল্পীর মুখে এমন মরণের উচ্চারণ এই প্রথম। সদ্য হাসপাতাল থেকে ফেরা মানুষটির হৃদয়ে বসানো হয়েছে দু’টি স্টেন্ট।
স্টেন্ট বসানোর খবর প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে একদল নেটাগরিক তাঁর মৃত্যুকামনা পর্যন্ত করেছে। এই নির্মমতা নাকি গভীরভাবে আঘাত করেছে একষট্টি বছরের ‘আগুনপাখি’কে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক—যিনি এই অসুস্থতার সময় নচিকেতার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন—এই প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন। তাঁর কথাতেও ধরা পড়ে বেদনাবোধ। তিনি বলেন, “যে মানুষটা বাংলা গানের জগৎকে দু’হাত ভরে দিলেন, বদলে কী পেলেন? তাঁর অসুস্থতার খবরে খুশি হওয়া কিছু মানুষ! একজন বিখ্যাত শিল্পী হলেও তিনি তো রক্তমাংসের মানুষ। তাঁরও অভিমান হয়।”
তবে একই সঙ্গে সেই চিকিৎসকই জানালেন, নচিকেতা এসব গায়ে মাখেন না। তিনি হাসি দিয়ে সবকিছু উড়িয়ে দিতে জানেন। ঠিক যেমনটা করেছেন তাঁর সাম্প্রতিক বার্তাতেও। সাত বছর বয়স থেকে ভাগ্যের খেয়ালে বারবার মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়েছেন তিনি—কখনও বিপ্লবী শহিদ ক্ষুদিরাম বসুকে অনুকরণ করতে গিয়ে, কখনও আন্দোলনের পথে, কখনও আবার গুরুতর অসুস্থতার মুখে। এ বারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একসময় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হৃদস্পন্দন আবার ছন্দ খুঁজে পেয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে।
এই অভিজ্ঞতার পরেই নচিকেতা লিখেছেন তাঁর স্পষ্ট বার্তা—এ লেখা তিনি লিখছেন মানুষের পড়ার জন্য। ভাল লাগলে ভালটা নিজের কাছে রাখার অনুরোধ। ভাল না লাগলে ভুলে যাওয়ার আবেদন। কমেন্ট না করার আহ্বান। কারণ, তাঁর লেখা কারও প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় নয়। সমাজমাধ্যমে তাঁকে যত বার ‘মারা’ হয়েছে, তার সংখ্যা নাকি তাঁর প্রকৃত আয়ুর থেকেও বেশি—এই তিক্ত সত্যও অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত ৬ ডিসেম্বর। নিয়মমাফিক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন পরামর্শ নিতে। সেখানেই ধরা পড়ে হৃদ্যন্ত্রের ব্লকেজ এবং অনিয়মিত স্পন্দন। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা—স্টেন্ট বসানো হবে। পরিবারের সম্মতি নিয়ে শুরু হয় চিকিৎসা। এই তথ্য আগেই আনন্দবাজার ডট কম-কে জানিয়েছিলেন তাঁর কন্যা ধানসিড়ি। ছ’দিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় থাকার পর বাড়ি ফেরেন নচিকেতা। তখনই চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন—পরিমিত আহার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া বিশেষ কোনও কড়াকড়ি নেই।
মৃত্যুর গুজব, নির্মম মন্তব্য, আর জীবনের প্রতি অদম্য টান—এই সবের মাঝেই দাঁড়িয়ে নচিকেতা চক্রবর্তী আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু গান লেখেন না, নিজেও এক চলমান গান। যে গানে মৃত্যুর ছায়া থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় জীবনই।