মানুষ কি সত্যিই কাউকে ছেড়ে যেতে পারে? নাকি কিছু সম্পর্ক এমনই, যেখান থেকে যত দূরেই পালানো হোক, ফিরে আসাই নিয়তি? নিঃশব্দ প্রকৃতির বুকের ভেতর, জনপদ থেকে বহু দূরে এক নির্জন সংসারে—এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে রক্ত-মাংস পায় মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রইদ’-এ।

‘রইদ’।
শেষ আপডেট: 17 December 2025 12:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মানুষ কি সত্যিই কাউকে ছেড়ে যেতে পারে? নাকি কিছু সম্পর্ক এমনই, যেখান থেকে যত দূরেই পালানো হোক, ফিরে আসাই নিয়তি? নিঃশব্দ প্রকৃতির বুকের ভেতর, জনপদ থেকে বহু দূরে এক নির্জন সংসারে—এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে রক্ত-মাংস পায় মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রইদ’-এ।
এক লাজুক স্বামী, এক অস্থির ও অনিয়ন্ত্রিত স্ত্রী, আর বাড়ির পাশের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক তালগাছ—এই তিনের আবর্তনে জন্ম নেয় এক এমন গল্প, যা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাড়িয়ে ছুঁয়ে যায় হাজার বছরের পুরোনো মানবিক আখ্যানকে।
‘রইদ’-এর কেন্দ্রে রয়েছে এক দম্পতির জীবন, যারা প্রায় বিচ্ছিন্ন এক জগতে বাস করে। স্ত্রীর আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বারবার; তার উন্মত্ততা কখনও কখনও স্বামীর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে। নীরব, ভীত মানুষটি তখন পরিকল্পনা করে মুক্তির—স্ত্রীকে এমন জায়গায় ফেলে আসার, যেখানে সে আগে কখনও যায়নি। কিন্তু অদ্ভুত এক নিয়মে, প্রতিবারই বাড়ির পাশের তালগাছ থেকে একটি ফল ঝরে পড়ে, আর ঠিক তার পরেই সেই নারী ফিরে আসে। বারবার এই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে—প্রস্থান, পতন, প্রত্যাবর্তন। সম্পর্ক যেন ছিন্ন হয়েও ছিন্ন হয় না।

এই আপাত সরল অথচ গভীরভাবে প্রতীকী কাঠামোর ভেতর দিয়ে পরিচালক খুঁজে ফেরেন আদম-হাওয়ার আদিম উপাখ্যানকে। তবে সময়ের ধারাবাহিক বর্তমান নয়, বরং অনুভূতির বর্তমানেই এই পুনর্নির্মাণ। এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও শারীরিক টান, যেখানে আকাঙ্ক্ষা, ভয়, নির্ভরতা আর প্রতিরোধ একাকার হয়ে যায়। গ্রামীণ সমাজের চিরাচরিত কাঠামোর মধ্যে একটি বিয়ে এখানে পরিণত হয় পরীক্ষার আগুনে—যেখানে সহনশীলতা, বিদ্রোহ আর আকর্ষণ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত।
চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষা নির্মম সৌন্দর্যে ভরা—প্রায় প্রাচীন এক আবহ, যেখানে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, নিজেই এক চরিত্র। এই জগতের কেন্দ্রে থাকা নারী চরিত্রটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে অনিবার্য, দুর্বার, নিয়ম ভাঙা এক সত্তা—যার পথ কোনও পূর্বনির্ধারিত গন্তব্য মানে না। সংযত ছন্দে এগোনো ছবিটি আবেগে ভরপুর, এবং বারবার ফিরিয়ে আনে যাওয়া-আসার চক্রে আবদ্ধ এক সম্পর্কের মোহময় অথচ দগ্ধ বাস্তবতা।
এই গল্পই এবার আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শকদের সামনে আনলেন মেজবাউর রহমান সুমন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বেইলি রোডের পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুক্তি পেল ‘রইদ’-এর ট্রেলার এবং জানানো হলো ছবিটির আন্তর্জাতিক উৎসবযাত্রার খবর। সেখানে পরিচালক নিজেই কথা বললেন ছবির দর্শন ও নেপথ্য ভাবনা নিয়ে। তিনি জানালেন, সাদু, তার তথাকথিত পাগল স্ত্রী এবং তালগাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আখ্যানের প্রতিটি স্তরে মিশে আছে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের দেখা গ্রামবাংলার রূপ—মাটির কাছাকাছি, অথচ গভীরভাবে প্রতীকী।
এই সন্ধ্যায় আনন্দের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। ‘রইদ’ নির্বাচিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব, নেদারল্যান্ডসের ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম’-এর ৫৫তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘টাইগার কম্পিটিশন’-এ। বাংলাদেশের কোনও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য এই বিভাগে নির্বাচিত হওয়া এই প্রথম—যা দেশের সিনেমার আন্তর্জাতিক অভিযাত্রায় এক স্মরণীয় মাইলফলক। উল্লেখযোগ্য যে, একসময় এই উৎসবেই ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নিজেদের কাজ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ক্রিস্টোফার নোলান ও বং জুন-হোর মতো নির্মাতারা।
ছবিটির প্রযোজনা করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বঙ্গ, সহ-প্রযোজক হিসেবে রয়েছে ফেসকার্ড প্রোডাকশন। অনুষ্ঠানে প্রযোজক মুশফিকুর রহমান বলেন, চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে সংকটাপন্ন সময়ে যাঁরা নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছেন, সুমন তাঁদের অন্যতম। হাওয়া-র পর রইদ প্রযোজনা করতে পারা বঙ্গের জন্য গর্বের, এবং তিনি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেন—এই ছবি শুধু দেশের নয়, বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সিনেমা হল ও প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর এমন সাহসী প্রযোজনায় এগিয়ে আসা জরুরি।
‘রইদ’-এর চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদসহ আরও অনেকে। যৌথভাবে গল্প লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন ও সেলিনা বানু মনি। সেই গল্পকে চিত্রনাট্যের রূপ দিয়েছেন সুমন নিজে, জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ এবং সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছবির শিল্পী ও কলাকুশলীদের অনেকেই, আর আবহে ভেসে বেড়ায় বাউল গানের সুর—যেন ছবির মাটির গন্ধ বাস্তবেই ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
দীর্ঘদিন টেলিভিশন নাটকে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার পর, ‘হাওয়া’ দিয়ে বড় পর্দায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিলেন সুমন। সেই সাফল্যের পর তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে প্রত্যাশা তাই স্বাভাবিকভাবেই তুঙ্গে। ট্রেলার দেখে একটাই ইঙ্গিত স্পষ্ট—দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই রোদ আরও প্রখর হবে। আগামী বছর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা রইদ যেন আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যতই পালাতে চাইুক, কিছু সম্পর্ক, কিছু মিথ, আর কিছু অনুভূতি বারবার ফিরে আসে—তালগাছ থেকে ঝরে পড়া ফলের মতোই অনিবার্য হয়ে।