চার হাজার হোক বা দশ হাজার—টিকিটের দামে ফারাক ছিল, কিন্তু প্রত্যাশার ওজন ছিল একদম সমান। মাসের পর মাস ধরে বুকের ভিতর গচ্ছিত রাখা একটি স্বপ্নই সবার—চোখের সামনে, মাত্র এক মুহূর্তের জন্য হলেও, দেখা যাবে লিয়োনেল মেসিকে।

AI-তে তৈরি ছবি।
শেষ আপডেট: 15 December 2025 18:41
চার হাজার হোক বা দশ হাজার—টিকিটের দামে ফারাক ছিল, কিন্তু প্রত্যাশার ওজন ছিল একদম সমান। মাসের পর মাস ধরে বুকের ভিতর গচ্ছিত রাখা একটি স্বপ্নই সবার—চোখের সামনে, মাত্র এক মুহূর্তের জন্য হলেও, দেখা যাবে লিয়োনেল মেসিকে (lionel messi, messi in kolkata)। সেই আবেগ নিয়েই হাজার-হাজার মানুষ ঢুকেছিলেন যুবভারতীর গ্যালারিতে। যেদিনটা হওয়ার কথা ছিল উৎসবের, স্মৃতির, আনন্দের—সেদিনই শহরের হৃদপিণ্ডে নেমে এল বিশৃঙ্খলার অস্বস্তিকর ছায়া। মুহূর্তের মধ্যে উল্টে গেল সব হিসেব। মাঠে ছিলেন মেসি, কিন্তু গ্যালারির মানুষগুলো রইলেন বঞ্চিত—এক ঝলক দেখার সৌভাগ্যও হল না।
ধীরে-ধীরে হতাশা জমাট বাঁধল ক্ষোভে, ক্ষোভ ভেঙে পড়ল আর্তনাদে এবং তারপর ভাঙচুর। গ্যালারির এক দিক থেকে অন্য দিকে ছড়িয়ে পড়ল অসহায় চিৎকার, রাগে লাল চোখ, ভাঙা স্বপ্নের দীর্ঘ নিঃশ্বাস। সেই দৃশ্য শুধু কলকাতা বা বাংলা নয়, স্তব্ধ করে দিল গোটা দেশকে, এমনকি বিশ্বের তাকানো চোখও থমকে গেল এই অভিজ্ঞতার সামনে। যে দিনটা ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে দিন যুবভারতী পরিণত হল অপূর্ণ প্রত্যাশার এক করুণ প্রতীকে।

মেসিকে ঘিরে আবেগের ঢেউ নতুন নয়। কিন্তু এই ঘটনার পর আরেকটি ঢেউ উঠল—আরও দ্রুত, আরও অদ্ভুত—সোশ্যাল মিডিয়ার অলিগলিতে। সেখানে ঢোকার আগে একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। ষাট-সত্তরের দশকে, পাড়ার ছোট স্টুডিয়োতে মানুষ নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে ছবি তুলত—কার্ডবোর্ডের কাটআউট, ম্যাগাজিনের পাতায় ছাপা মুখের সঙ্গে নিজেকে দেখা। সেই ছবিতে সুপারইম্পোজ করা মুখ দেখিয়ে গর্বের হাসি থাকত—‘অমিতাভের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি’, ‘সুচিত্রার কাঁধে মাথা রেখেছি’ কিংবা ‘গব্বর সিংকে জড়িয়ে ধরেছি’। কিছুরা সেই ছবি বিশ্বাস করতেন, কিছুরা নয়। তবে, যিনি ওই ছবিতে রয়েছেন তিনি জানতেন ছবিটা সত্যি নয়, তবু সেই মিথ্যের মধ্যেও ছিল এক ধরনের রোমান্টিক আনন্দ, সামাজিক স্বীকৃতির সুখ।

বছরের পর বছর পেরিয়ে কাগজের সেই ভেলকি এখন বদলে গেছে ডিজিটাল পর্দায়। যুবভারতীর ঘটনার পর ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে একের পর এক ছবি—কোথাও মেসি বিয়েবাড়ির অতিথি, কোথাও দার্জিলিঙের পাহাড়ি রাস্তায় হাসিমুখে দাঁড়ানো, কোথাও আবার সল্টলেক স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সেলফি। ক্যাপশনও কম নাটকীয় নয়—‘স্টেডিয়ামে না গিয়েও মেসির সঙ্গে ছবি’, ‘আজ আমার ডাইনিং রুমে মেসি’, এমনকি ‘চুমুর মুহূর্ত’। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল শত-শত পোস্ট। কিন্তু বাস্তব একটাও নয়। সবই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বানানো মিথ্যে বাস্তবতা।
এখানেই প্রশ্নটা আরও ধারালো হয়ে ওঠে। এমন চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার পর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারত প্রতিবাদ, ক্ষোভ, প্রশ্ন। তার বদলে কেন এই AI-র আশ্রয়? কেন মিথ্যে ছবির ভিড়ে নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ? এটা কি নিছক প্রযুক্তির খেলা, নাকি আরও গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মানসিক শূন্যতা? ‘আমি ছিলাম’, ‘আমিও দেখেছি’—এই সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কি এতটাই প্রবল যে বাস্তব না হলেও চলবে, শুধু বিশ্বাসযোগ্য দেখালেই যথেষ্ট?
রিহ্যাবিলিটেশন সাইকোলজিস্ট ডঃ সুচরিতা দত্ত বলছেন, এটা এক ধরনের শূন্যতা ভরানোর আসক্তি। যা পাওয়া যায়নি, সেটাকে তুচ্ছ দেখানোর চেষ্টা—‘আঙুর ফল টক’। মেসিকে দেখা হয়নি, যারা গিয়েও দেখেনি, তাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের আত্মতুষ্টি। সত্যিকারের সুখ না পেয়ে কৃত্রিম সুখে নিজেকে ভোলানোর প্রবণতা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ রিমা ভট্টাচার্যের মতে, সোশ্যাল ভ্যালিডেশন আজকের দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে বড় কিছু অর্জনের অভাব থাকলেও, একজন জনপ্রিয় মানুষের সঙ্গে ছবিতে নিজেকে দেখাতে পারলে সামাজিক সম্মান যেন হঠাৎ বেড়ে যায়। এটা মানসিক রোগ নয়, কিন্তু লো সেলফ এস্টিমের এক স্পষ্ট লক্ষণ। আর সাইকোলজিস্ট ডঃ সৌরভ কান্তি বিষ্ণুর ব্যাখ্যায়, মানুষের সম্মান আর গুরুত্ব পাওয়ার তাগিদ, দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও একঘেয়েমি, এবং সর্বোপরি FOMO (Fear Of Missing Out)—সব মিলিয়েই এই ধরনের আচরণকে উসকে দিচ্ছে।

হয়তো এই AI-ছবিগুলো আসলে আনন্দের প্রতীক নয়। বরং একটি ব্যর্থ দিনের পর নিজের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা। গ্যালারিতে বসে মেসিকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে পালানোর অস্থায়ী পথ। কিংবা আরও গভীর ও ভয়ংকর কিছু—সোশ্যাল ভ্যালিডেশনের নেশা, যেখানে লাইক আর শেয়ারের দৌড়ে সত্য আর মিথ্যের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
যুবভারতীর সেই সকাল শুধু একটি আয়োজনের ব্যর্থতার গল্প নয়; তা সময়ের মানসিক মানচিত্রও খুলে দেয়। বাস্তব ভেঙে গেলে আমরা কৃত্রিম সুখ বানানোয় মন দিলাম। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—এই ভুয়ো ছবির ভিড়ে কি আসল ক্ষোভ, প্রশ্ন আর দায়বদ্ধতা হারিয়ে যাচ্ছে? আর যদি তা-ই হয়, তবে আমরা আসলে কী ঢাকছি—মেসিকে না দেখতে পাওয়ার বেদনা, না কি নিজেদের ভিতরের শূন্যতাই?