একটি সিনেমা বা সিরিয়াল পর্দায় ওঠার আগেই তার জন্ম হয় অসংখ্য অদৃশ্য হাতের স্পর্শে। ক্যামেরার সামনে যাঁদের মুখ দর্শক চেনেন, ভালোবাসেন, ঠিক তাঁদেরই পিছনে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিঃশব্দে কাজ করে যান আরও কয়েকশো মানুষ।

‘ফেডারেশন উৎকর্ষ সম্মান ২০২৪’।
শেষ আপডেট: 15 December 2025 12:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটি সিনেমা বা সিরিয়াল পর্দায় ওঠার আগেই তার জন্ম হয় অসংখ্য অদৃশ্য হাতের স্পর্শে। ক্যামেরার সামনে যাঁদের মুখ দর্শক চেনেন, ভালোবাসেন, ঠিক তাঁদেরই পিছনে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিঃশব্দে কাজ করে যান আরও কয়েকশো মানুষ। আলো, শব্দ, ক্যামেরা, সেট, মেকআপ, পোশাক, শিল্প নির্দেশনা— প্রতিটি ফ্রেমের ভিতরে লুকিয়ে থাকে তাঁদের ঘাম, ধৈর্য আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। কিন্তু তারকা জন্ম নিলেও, এই মানুষগুলো থাকেন লাইমলাইটের বাইরে। সেই অবহেলিত আলোছায়ার মানুষগুলোকেই প্রথমবার সামনে এনে সম্মানের আসনে বসাল ফেডারেশন।
রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, স্টুডিও পাড়ার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় যেন অন্যরকম এক আবেগের সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত হল ‘ফেডারেশন উৎকর্ষ সম্মান ২০২৪’। সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের ভাবনায় ও নেতৃত্বে এই প্রথম এমন এক আয়োজন, যেখানে ক্যামেরার পেছনে থাকা প্রতিটি কলাকুশলী হয়ে উঠলেন সন্ধ্যার নায়ক। শুধু বাংলা বিনোদন জগতে নয়, গোটা ভারতের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সম্মাননা এই প্রথম— যেখানে সম্মান পেলেন সিনেমা, টেলিভিশন ও ওটিটি দুনিয়ার নেপথ্য শিল্পীরা।
অনুষ্ঠান শুরুর মুহূর্তেই আবহ বদলে দেয় গণেশ বন্দনা। উদীয়মান শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনায় ছড়িয়ে পড়ে শ্রদ্ধা ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন। নাচের ছন্দে স্মরণ করা হয় সলিল চৌধুরী ও ধর্মেন্দ্রকে— যাঁদের সৃষ্টি আজও ভারতীয় বিনোদনের মেরুদণ্ড। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গানের তালে তালে মঞ্চ মাতায় নৃত্যশিল্পীরা— প্রসেনজিৎ, দেব, জিৎ, অঙ্কুশদের নানা সময়ের হিট গান যেন মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে দর্শকদের স্মৃতির অ্যালবাম।

এই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় ২৭টি গিল্ডের প্রতিনিধিত্বে বিভিন্ন বিভাগের কলাকুশলীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিশিষ্ট অতিথিরা। চলচ্চিত্র বিভাগে ২৬টি পুরস্কার দেওয়া হয় ২৬ জন কলাকুশলীর হাতে। একইভাবে টেলিভিশন ও ওটিটি বিভাগেও ২৬ জন করে সম্মানিত হন। শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, বর্ষীয়ান টেকনিশিয়ানদেরও বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়— যাঁদের হাত ধরে এক সময় তৈরি হয়েছে অগণিত জনপ্রিয় সিনেমা ও সিরিয়াল, যাঁদের কারিকুরিতেই গড়ে উঠেছে আজকের টলিপাড়া।
এই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাংলা বিনোদন জগতের এক ঝাঁক তারকা ও স্রষ্টা— প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেব, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল, নীলাঞ্জনা শর্মা, অর্ঘ্য কমল মিত্র, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, টোটা রায়চৌধুরী, জুন মালিয়া, শুভ্রজিৎ মিত্র, সোমনাথ কুণ্ডু, আনন্দ আঢ্য, অঙ্কুশ হাজরা, ঐন্দ্রিলা সেন, নিসপাল সিং, জয়চন্দ্র (কার্যকারী সভাপতি, ফেডারেশন), সুজিত হাজরা (যুগ্ম সম্পাদক, ফেডারেশন)— তালিকা যেন শেষই হয় না। টলিপাড়ার প্রায় সব পরিচিত মুখই সেদিন এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক ছাদের নীচে, একটাই উদ্দেশ্যে— নেপথ্যের মানুষদের কুর্নিশ জানাতে।

প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আবেগে ভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, এমন উদ্যোগের জন্য ফেডারেশনকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই। প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করা এই অভিনেতার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি— এই মানুষগুলো না থাকলে তিনি অভিনেতা হয়ে উঠতে পারতেন না।
শুধু তিনি নন, কেউই এই টেকনিশিয়ানদের ছাড়া কাজ করতে পারেন না। তাঁর কথায় উঠে আসে দীর্ঘ ৪৫ বছরের কেরিয়ারের স্মৃতি— লাইটম্যান থেকে শুরু করে সেটে জল বা খাবার দেওয়া মানুষগুলোর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের কথা। কেউ তাঁকে আজও ‘বুম্বা‘, কেউ ‘বাবু’ বলে ডাকেন, সেই স্নেহেই বাঁধা পড়ে আছে তাঁর শিল্পীজীবনের পথচলা। ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ থেকে আজ পর্যন্ত যাঁরা তাঁর সঙ্গে আছেন, তাঁদের অনেকের সন্তানরাও আজ টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন— সেই ধারাবাহিকতাই যেন টলিউডের আসল উত্তরাধিকার।
দেব তাঁর বক্তব্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, কোনও সিনেমাই টেকনিশিয়ান ছাড়া সম্ভব নয়। একজন হিরো কখনও একা নায়ক হতে পারে না। ক্যামেরার পেছনে যাঁরা থাকেন, তাঁরাই আসল মানুষ— অথচ তাঁদের নাম কেউ জানে না। এই উদ্যোগকে তিনি শুধু সাধুবাদই জানাননি, গর্বের সঙ্গেও বলেছেন— ভারতবর্ষে এই পথ দেখাচ্ছে বাংলা। মঞ্চে ওঠার সময় নানা ডাক— খোকা, প্রধান— ভেসে এল দর্শকাসন থেকে। প্রশ্ন করা হলে কোন নামটা তাঁর বেশি পছন্দ, দেবের উত্তর ছিল সরল ও আন্তরিক— “আমি ওঁদের ভাই। ভাই ডাকলেই আমি খুশি।”
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিদেশে সিনেমা হলে দর্শক শেষ নাম দেখানো পর্যন্ত বসে থাকেন, সব কলাকুশলীর নাম শেষ হলে তবেই উঠে যান। আমাদের দেশে ছবিটা আলাদা। আজকাল তো মেগা সিরিয়ালেও নাম দেখানো হয় না। তাঁর আশা, ফেডারেশন এই বিষয়েও নজর দেবে— যাতে পর্দার পেছনের মানুষগুলোর পরিচয় অন্তত নামের মধ্য দিয়ে হলেও দর্শকের কাছে পৌঁছয়।
ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের কণ্ঠেও ছিল গর্ব আর আবেগের মিশেল। তিনি বলেন, শুধু টেকনিশিয়ান নয়, তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও এদিন উপস্থিত ছিলেন। যাঁদের ছাড়া সিনেমা, সিরিয়াল, সিরিজ কিছুই তৈরি হতে পারে না— আজ তাঁদের হাতেই ‘উৎকর্ষ সম্মান’ তুলে দিতে পেরে তাঁরা নিজেদের ধন্য মনে করছেন। তাঁর কৌতুকমাখা মন্তব্যে হাসির রোল— আজ তো শুধু ট্রেলার দেখলেন সবাই, আসল সিনেমা দেখা যাবে পরের বার।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একযোগে কণ্ঠ মেলান পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত রূপটান শিল্পী সোমনাথ কুণ্ডু, টোটা রায়চৌধুরী, শুভ্রজিৎ মিত্ররা। সকলেরই একটাই কামনা— এই সম্মাননা যেন থেমে না যায়, যেন প্রতি বছর ফিরে আসে আরও বড় পরিসরে।

৫৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম টলিপাড়ায় এমন এক সন্ধ্যা এল, যেখানে তারকাদের আলো একটু নরম হয়ে পড়ল, আর সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন নেপথ্যের মানুষগুলো। যাঁদের কর্মদক্ষতা, পরিশ্রম আর অনিন্দ্য চিন্তাভাবনায় প্রতিদিন জন্ম নেয় নতুন সৃষ্টি, সেই কলাকুশলীদের জন্য এ যেন বহুদিনের প্রাপ্য স্বীকৃতি। ‘ফেডারেশন উৎকর্ষ সম্মান ২০২৪’ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়— এটি এক প্রতিশ্রুতি, এক নতুন পথচলার সূচনা। কারণ সিনেমা আসলে একক কোনও মানুষের শিল্প নয়; এটি সমবেত স্বপ্নের ফসল। আর সেই স্বপ্নের ভিত যাঁরা গড়ে দেন, তাঁদের সম্মান জানানো মানেই ভবিষ্যতের শিল্পকে আরও মানবিক, আরও আলোকিত করে তোলা।