সেদিন সারা শহর জুড়ে 'গোওওওওল গোওওওওওওল' চিৎকার। এই চিৎকারের মধ্যেই সেদিন জন্মেছিল মহুয়ার নবজাতক পুত্র।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 September 2025 16:43
মহুয়া ছিলেন ইস্টবেঙ্গল ভক্ত। মহুয়ার দাদা পিনাকী রায়চৌধুরী ফুটবল খেলতে গেলে মহুয়াও যেতেন মাঠে। কখনও খেলোয়াড় কম পড়লে নিজেই মহুয়া মাঠে নেমে গোল আগলেও দাঁড়িয়েছেন রীতিমতো। অন্য দলের এগিয়ে আসা প্লেয়ারদের রীতিমত শির-ফোলানো গলায় শাসাতেন। —‘‘খবরদার! যদি আমাকে গোল দিয়েছিস। দেখে নেব, পরে।’’ ইস্টবেঙ্গল হেরে গেলে সেই মেয়ে মাথা কুটে কাঁদতেন। তখন অবশ্য মহুয়ার নাম শিপ্রা। 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' ছবি করতে এসে তরুণ মজুমদার নাম দিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী (Mahua Roychowdhury)। মহুয়া আর তাঁর একমাত্র ছেলের জন্ম একই তারিখে। ২৪ সেপ্টেম্বর।

মহুয়ার বিয়ে হয়েছিল তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিলক প্রথম জীবনে শিশুশিল্পীর অভিনয় করতেন ছবিতে। যৌবনে কিশোরকণ্ঠী গায়ক হন। ফাংশন সূত্রেই মহুয়ার সঙ্গে পরিচয়। তিলক ব্যাঙ্কে চাকরিও করতেন।
তখন মহুয়া সন্তান সম্ভবা। সদ্য জন্ম নেবে তাঁর সন্তান। ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭। সেদিন কলকাতা জুড়ে তুমুল বৃষ্টি। তারই মধ্যে কলকাতায় এক ঐতিহাসিক ফুটবল ম্যাচ। সেইদিন মোহনবাগানের সামনে ছিল পেলের কসমস। ব্রাজিলের পেলে আসছেন কলকাতায় (Pele was in Kolkata)। সাজো সাজো রব সারা শহরে।
মহুয়া ইস্টবেঙ্গল ভক্ত হলেও মোট কথা ছিলেন ফুটবলের ভক্ত। তাই পেলের আগমন তাঁর কাছে বড় উন্মাদনা। কিন্তু মহুয়া সেদিন সন্তান প্রসবের কারণে হাসপাতালে ভর্তি। রেডিওতেই শুনছিলেন গোল গোল আওয়াজ। প্রসব যন্ত্রণা যেন লাঘব হচ্ছিল চারদিকের গোল গোল কলরবে।
দুর্দান্ত লড়াইয়ে সেদিন পেলের দলের বিরুদ্ধে ২-২ এ ড্র করেছিল মোহনবাগান। যা বাঙালিদের জয়ই বলা যায়। মুখের কথা নয়! কার্লোস আলবোর্তো, ফ্র্যাঙ্ক বেকেনবাওয়ার, জুয়ান কান্তিলিয়া, জর্জিয়ো চিনাগলিয়া এবং সর্বোপরি পেলে । ১৯৭৭-এর কসমসে তখন আক্ষরিক অর্থেই চাঁদের হাট। ইডেনের বৃষ্টিভেজা দিনে মাঠের মধ্যে দৌড়াচ্ছেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যাম থাপা, সুব্রত ভট্টাচার্য, মহম্মদ হাবিবরা। আর গোল আগলে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায়। বাইরে থেকে ফুটবলারদের সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়।
সেদিন সারা শহর জুড়ে 'গোওওওওল গোওওওওওওল' চিৎকার। এই চিৎকারের মধ্যেই সেদিন জন্মেছিল মহুয়ার নবজাতক পুত্র।
২৪ সেপ্টেম্বর পেলে যেমন এসছিলেন কলকাতায়, তেমন এ দিন ছিল মহুয়া রায়চৌধুরীর জন্মদিনও। তখন মহুয়া বাংলা ছবির প্রথম সারির নায়িকা। মহুয়া হসপিটালে, মা হওয়ার তোড়জোড় চলছে। আর সেই দিনেই চতুর্দিকের ‘গোল গোল’ আওয়াজের মধ্যেই মায়ের জন্মদিনের দিনই ভূমিষ্ঠ হল মহুয়ার একমাত্র সন্তান। গোল গোল শব্দের মাঝে যে সন্তানের জন্ম, সেই সন্তানের নাম রাখলেন মা নিজেই, 'গোলা'! (Mahua named her newborn Gola) মহুয়ার গোলা। এক কিংবদন্তি প্লেয়ারের কলকাতা আগমনের দিন এক শিশুর নামকরণ হল, যা সত্যি অভাবনীয়।
মা ও ছেলের একদিনেই জন্ম, ২৪ সেপ্টেম্বর। গোলা অর্থাৎ আজকের তমাল মাকে বেশিদিন পাননি। কৈশোরেই মাতৃহারা হন গোলা। বাংলা ছবির সুপারস্টার নায়িকার অকালমৃত্যু হয় চোখের জলে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে চলে যান মহুয়া। তাও দিয়ে গেছেন ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘সাহেব’, ‘আদমি অর অউরাত’, ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’, ‘তিল থেকে তাল’, ‘অভিমান’, ‘পারাবত প্রিয়া', ‘আশীর্বাদ’-এর মতো বহু বাংলা সিনেমা। শেষ বিদায়ের আগে মহুয়া বলেছিলেন শেষ কথা, "গোলাকে রেখে গেলাম,তোমরা দেখো।"

তবে গোলাকে ইন্ডাস্ট্রির কেউই দেখেনি। দেখেছেন একমাত্র তাঁর বাবা তিলক। তিলক পরে আর বিয়েও করেননি। ছেলেকে নিয়েই সামনে পথ হেঁটেছেন। আজ তিলক চক্রবর্তীও প্রয়াত। তমাল আজ মিউজিক অ্যারেঞ্জার। দাপিয়ে কলকাতা-সহ কাজ করছেন বম্বেতে। এক মেয়ের বাবা সেই তমাল কিন্তু আজও মহুয়ার 'গোলা'।