ওঁদের যৌবনের ঝলমলে দিনগুলো যে বড় মায়াবী! পাওয়ার হাউস উত্তম কুমারকে ঘিরেই বসত সব পার্টির আসর।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 13 September 2025 18:28
বৌদি কাবেরী বসুর সঙ্গে সিনেমার শুটিং দেখতে গিয়ে মেয়েটির ম্যাটিনী আইডল উত্তমকুমারকে প্রথম দেখা। একদিন এই মেয়েই হয়ে ওঠেন বাংলা ছবির অপরূপা অভিনেত্রী। প্রথম ছবিতেই সে হয়ে যায় উত্তমকুমারের নায়িকা। আর সেই প্রস্তাব এসেছিল স্বয়ং মহানায়কের কাছ থেকে।
মেয়েটির নাম ললিতা চ্যাটার্জী। ললিতা ছিলেন টালিগঞ্জ পাড়ার মেম। আজ যাঁর জন্মদিন।

প্রথম দেখাতেই উত্তমকুমার মুগ্ধ হন ললিতার রূপে। চিরাচরিত সুন্দরী ললিতা ছিলেন না। যেমন উচ্চতা, তেমন রূপ আর তেমনই বিলেতি ইংরাজি উচ্চারণে রপ্ত। উত্তম ললিতাকে বললেন সিনেমায় তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে! তখনও ললিতা এমন অকল্পনীয় প্রস্তাবে মনস্থির করতে পারছেন না।
ললিতার ডাক নাম ছিল রুনু।
কয়েক বছর পর 'বিভাস' ছবির জন্য উত্তমকুমারের থেকে প্রস্তাব এল " রুনু তোমায় দেখতে এত সুন্দর অভিনয় কর!" একেবারে উত্তমকুমারের থেকে অফার। তাও আবার উত্তমকুমারের নায়িকা। 'বিভাস' ছবি বক্সঅফিসে হিট করলেও, পরে কিন্তু উত্তমকুমারের নায়িকা হিসেবে ললিতার কপাল আর খোলেনি অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, জয় জয়ন্তী ছবিতে উত্তমকুমারের সহনায়িকা প্রথাগত ভ্যাম্প তিনি। অতিসুন্দরী অতিশিক্ষিতা বলেই ললিতা কখনও হিরোইন হতে যেন পারলেন না এই পোড়া টালিগঞ্জ পাড়ায়।
তবে উত্তমকুমারের সঙ্গে ললিতার বন্ধুত্ব শেষদিন অবধি ছিল। উত্তমকুমার ললিতার থেকে বয়সে বড় হলেও যেহেতু বন্ধু তাই ললিতা উত্তম বলেই ডাকতেন। ওঁদের কী প্রেমের সম্পর্ক ছিল? গুঞ্জন উঠেছে বারবার। রাতপার্টিতে বহুবার উত্তমকুমারের বাহুলগ্না হয়েছেন ললিতা কিন্তু সীমারেখা ছাড়াননি। সুপ্রিয়া দেবী যদিও মাঝে চিরদিন রয়েই গিয়েছেন। সুপ্রিয়ার অসম্ভব বন্ধু ছিলেন ললিতা। শেষ দিনেও।
ললিতার হারমোনিয়াম উত্তমকুমার নিয়ে গেছিলেন বহুদিন আগেই গানবাজনা হত ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে তাই। বহুদিন আর সে হারমোনিয়াম লোলিতা চাননি। '
ওঁদের যৌবনের ঝলমলে দিনগুলো যে বড় মায়াবী! পাওয়ার হাউস উত্তম কুমারকে ঘিরেই বসত সব পার্টির আসর। সুপ্রিয়া, অঞ্জনা ভৌমিক, শ্যামল মিত্র, তরুণ কুমার, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়-- সবাই মিলে করতেন পার্টি, সঙ্গে খাওয়াদাওয়া আর গানের ঘরোয়া জলসা। সেই পার্টিতে সুপ্রিয়ার একটা গান ধরা বাঁধা ছিল, 'অশ্রুনদীর সুদূর পারে।' উত্তম আর শ্যামল মিত্র তো গাইতেনই।
ললিতা সে সময় চোখ ঝলসানো ডাকসাইটে সুন্দরী, যাঁর থেকে চোখ ফেরাতে পারতেন না মহানায়কও। আবার ললিতারও উত্তমের প্রতি ভাল লাগা ছিল। কে না প্রেমে পড়বে মহানায়ক পাশে বসে থাকলে! ঝলমলে ললিতাকে দেখে উত্তম তাকালে উত্তমের চোখ চেপে ধরতেন সুপ্রিয়া, 'দেব না দেব না! কিছুতেই রুনুকে দেখতে দেব না!' মজা করেই বলতেন বেণু।
প্রথমদিকে ললিতাকে বেশ সন্দেহের চোখেই দেখতেন সুপ্রিয়া দেবী। কিন্তু ধীরে-ধীরে বন্ধুত্ব সেই সন্দেহকে ঢেকে দেয়। বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে ওঠেন দু'জনে।

ললিতা যখন দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন যাত্রার পাহাড়ি ভট্টাচার্যকে, তখন ললিতা চেয়েছিলেন উত্তমকুমার তাঁদের বিয়েতে সাক্ষী থাকুন। কথা রেখেছিলেন উত্তম। ঘরোয়া রেজিস্ট্রি বিয়ে। উত্তম এসে ধুতি পাঞ্জাবি পরে বেনারসি পরিহিতা ললিতার পাশে বসেছেন। ঠিক তখন সুপ্রিয়া ঢুকে বলল, "এই তো বর-বউ হয়ে গেছে। আর দরকার নেই তো বরের। রুনু তোর আর বরের দরকার কী।"
সুযোগ পেলেই সুপ্রিয়া এমন ঠাট্টা করতেন। কিন্তু এও জানত বেণু, তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ড রুনু তাঁর ঘর ভাঙবে না। কথা তুলবেন পাঠকরা, সুপ্রিয়াও তো একজনের ঘর ভেঙেই সংসার গড়েছিল। আসলে কিন্তু উত্তম কুমারই ভাঙা সংসার থেকে ছুটি নিয়ে সুপ্রিয়ার কাছে আশ্রয় চেয়ে থাকতে এসেছিলেন।
আজ উত্তমকুমার, সুপ্রিয়া দেবী আর ললিতা কেউই নেই। সেসব ঝলমলে দিনের স্মৃতিতে আজও ধুলো পড়েছে। তবু ফিরে দেখলে মনে হয় আজও জীবন্ত সেসব সোনালি দিন।