উত্তম কুমারের সঙ্গে আমার জীবনে উল্লেখযোগ্য সময় 'শ্যামলী' নাটক। 'শ্যামলী' আমার জীবনের একদিকে যেমন সব স্বপ্নপূরণ করেছে, তেমনি একদিকে আমার সব স্বপ্ন কেড়েও নিয়েছে।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 3 September 2025 14:18
রাজা সাজার ভিড় টলিপাড়ায় বরাবরই ছিল। এখনও আছে। কিন্তু উত্তমকুমারের মতো রাজা আজও কেউ এল না রুপোলি জগতে। আজ ৩ সেপ্টেম্বর শততম জন্মবার্ষিকীতে পা রাখলেন উত্তমকুমার। ১০০ বছরেও তাঁকে নিয়ে উন্মাদনা এতটুকু ফিকে হয়নি। আজ ম্যাটিনী আইডলের জন্মদিনে দ্য ওয়ালে তাঁর গল্প বললেন মরুতীর্থ হিংলাজের কুন্তী কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এমন নায়িকা যাঁর চোখের দিকে চেয়ে উত্তমকুমার অভিনয় করতে ভয় পেতেন। সাবিত্রী-উত্তমের প্রেমও ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু সাবিত্রী কখনও উত্তমকে নিজের করে পেতে চাননি। নিজের সাতমহলা বাড়িতে একলা ঘরেই একার জন্য প্রদীপ জ্বেলেছেন।

উত্তম-সুচিত্রা যতখানি, উত্তম-সাবিত্রীও ততখানি প্রিয় জুটি সে সময়ের। উত্তম কুমারের প্রতি সাবিত্রীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা যেন এক সমর্পণও। তাই আজও সাবিত্রীর গলা ধরে আসে তাঁর উত্তমদাকে নিয়ে বলতে গেলে। আর শ্রদ্ধামিশ্রিত সে ভালবাসায় কোথাও যেন রয়ে গেছে অভিমানের সুরও।
দ্য ওয়াল উত্তম আড্ডায় সাবিত্রী বললেন ' "উত্তম কুমারের সঙ্গে আমার জীবনে উল্লেখযোগ্য সময় 'শ্যামলী' নাটক। শ্যামলী আমার জীবনের একদিকে যেমন সব স্বপ্নপূরণ করেছে, তেমনি একদিকে আমার সব স্বপ্ন কেড়েও নিয়েছে। জীবন আমাকে বৈপরীত্য দেখিয়েছে 'শ্যামলী' চলাকালীন। তবে একটা কথা বলার, উত্তমকুমার যখন 'শ্যামলী' নাটক করতে আসেন, তখন অনেকেই বলেছিল সিনেমার অভিনেতা নাটকে ততটা সাফল্য পাবেন কিনা! কিন্তু উত্তমকুমার মঞ্চেও যে কতটা সফল, 'শ্যামলী' তারই প্রমাণ।"

উত্তম কুমার সম্পর্কে সাবিত্রীর কথায় আজও যেন অভিমানের সুর। উত্তমের পরোপকারের স্বভাব নিয়ে বললেন "উত্তম কুমার খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তাঁর গুণ সম্পর্কে আপামর জনগণ জানেন। হয়তো সবাইকে সাহায্য করতেন তিনি। এসব বিশদে আমি জানি না। তবে আমি তাঁর থেকে সাহায্য কিছু পাইনি, না আমি কিছুই পাইনি তাঁর থেকে। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে আমার ভাল লাগত, এটুকুই। তিনি তো মহানায়ক এমনিই হয়ে যাননি। আমরা সকলেই তো ছিলাম সে হয়ে ওঠায়। তবে উত্তম কুমার তাঁর জীবদ্দশায় মহানায়ক উপাধিটা দেখে যেতে পেরেছিলেন কিনা মনে নেই আমার।" উত্তম-সাবিত্রী জুটির প্রচুর ছবি দর্শকদের প্রিয়।
কিন্তু সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের নিজের কোন ছবিগুলো প্রিয় উত্তম কুমারের সঙ্গে? সাবিত্রী জানালেন "কোন চরিত্র আমার সেরা, সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু কিছু ছবি খুব মনের কাছের। 'নিশিপদ্ম', 'মঞ্জরী অপেরা', উত্তরায়ণ'-- আরও অনেক ছবি আছে, এখন নামগুলো মনেও নেই অত।"
তবে 'উত্তরায়ণ'-এর কথা বলতে গিয়ে সাবিত্রী আবেগপ্রবন হয়ে পড়লেন। সে ছবির সতী চরিত্রে সাবিত্রী চোখের জল ধরে রেখে বলেছিলেন উত্তম কুমারকে, 'সতী সতী, সতী রতি নয়। আমাদের কায়ার কোনও সম্পর্ক থাকবে না আর সব থাকবে। তুমি হলে আমার ভগবান, পুরুষোত্তমের প্রতিনিধি।'
এ সংলাপ ঠিক যেন মিলে যায় সাবিত্রীর একাকী জীবন-যৌবনের সঙ্গে। সে ছবিতে ছোট চরিত্র ছিল সাবিত্রীর, কিন্তু সে অভিনয় উত্তম-সুপ্রিয়া জুটির আবেদনকেও ছাড়িয়ে যায়।
সাবিত্রী নিজেই এই বয়সে এসে বললেন, "আমি একাত্ম হয়ে গেছিলাম সতী চরিত্রে। চরিত্রটা ছোট হলেও অভিনয় করার ছিল। সেই অভিনয় আমি ফোটাতে পেরেছি। সেটা আমি আমার অভিনয় দিয়ে করতে পেরেছিলাম। যদি ওই অভিনয় করতে না পারতাম সকলের মন ছুঁত না। কী করে করলাম, তা বলতে পারি না। একজন শিল্পী নিজেই জানে না সে কী ভাবে কী করে ফেলে।"
২৪ জুলাই ১৯৮০, আজ থেকে ৪৫ বছর আগে উত্তমকুমারের মহাপ্রয়াণ দিবস। সেদিন মধ্যরাত্রে সুচিত্রা সেন গিয়ে উত্তম কুমারের মরদেহতে শেষ মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন। সেটাই ছিল পরের দিন সংবাদপত্রের সবথেকে বড় ব্রেকিং নিউজ। কিন্তু উত্তম-সুচিত্রার চেয়ে উত্তম-সাবিত্রী জুটি কোন অংশে কম! সাবিত্রী কি গিয়েছিলেন তাঁর নায়ককে শেষ বিদায় জানাতে?

সাবিত্রী বললেন বিষাদমাখা কণ্ঠে, "উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবর কি পড়ে থাকে, চলেই আসে। সবার মতোই পেয়েছিলাম। সবাই যেমন দুঃখপ্রকাশ করেছেন আমিও তাই মনে করেছি তখন। আমি গিয়েছিলাম উত্তমদাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে, ওঁর গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে। "
সাবিত্রী ৪৫ বছর পরে কী ভাবে দেখছেন উত্তম কুমারের মূল্যায়ণ? সাবিত্রী জানালেন, "আমাদের দেশে বেঁচে থাকতে শিল্পীরা স্বীকৃতি পায় না। উত্তম কুমার নিজে জন্মদিন উদযাপন করতেন বাড়িতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে মহানায়ক বলে জন্মদিন উত্তম কুমার বেঁচে থাকতে কোনও দিনও হয়নি। আমি তো দেখিনি।"