Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
সরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কাস্কি, ক্যান্ডেললাইট ডিনার আর পরিবার, বিয়ের জন্মদিনে কোন স্মৃতিতে ভাসলেন আলিয়া? পরপর দু’বার ছাঁটাই! চাকরি হারিয়ে 'বিহারি রোল' বানানো শুরু, এখন মাসে আয় ১.৩ কোটিনববর্ষে সস্তায় পেটপুরে খাওয়া! দুই বাংলার মহাভোজ একই থালিতে, হলিডে ইন-এ শুরু হচ্ছে ‘বৈশাখী মিলনমেলা’কষা মাংস থেকে কাটলেট! নববর্ষে তাজের সমস্ত হোটেলে জিভে জল আনা ভোজ, রইল সুলুকসন্ধানপিএসএল ছেড়ে আইপিএলে আসার কড়া মাশুল! ২ বছরের জন্য সাসপেন্ড কেকেআরের এই পেসার রণবীর-দীপিকার ৮ বছরের দাম্পত্যে বিচ্ছেদ! স্বামীর সঙ্গে বাড়তে থাকা দূরত্বই কি ডিভোর্সের কারণ?'বিজেপির কথায় চললে আমাদের কাছেও তালিকা থাকবে', পুলিশ কর্তাদের চরম হুঁশিয়ারি ব্রাত্য বসুর!একসময় নীতীশকেই কুর্সি থেকে সরানোর শপথ নিয়েছিলেন! তাঁর ছেড়ে যাওয়া পদেই বসলেন শকুনি-পুত্র

মিঠুন ও মস্কো! মেহনতি মানুষের হিরো হয়ে উঠেছিলেন জিম্মি দ্য ডিস্কো কিং

‘ডিস্কো ড্যান্সার’-এর মুক্তির পর বহু দেশের মতো রাশিয়াতেও ছবিটি মুক্তি পায়। কিন্তু যা ঘটেছিল, সেটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অভূতপূর্ব।

মিঠুন ও মস্কো! মেহনতি মানুষের হিরো হয়ে উঠেছিলেন জিম্মি দ্য ডিস্কো কিং

মিঠুন চক্রবর্তী

নিশান্ত চৌধুরী

শেষ আপডেট: 23 November 2025 11:39

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৮৪ সালের মাঝামাঝি কোনও একটা দিন হবে। বিকেল নাগাদ মস্কোর মাটি ছোঁয়ার কথা এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটির। সে বছরই মস্কোতে মুক্তি পেয়েছে ‘ডিস্কো ডান্সার’ ছবিটি (ভারতে মুক্তি পেয়েছিল ২ বছর আগেই)। বিমান মস্কোর মাটি ছুঁতেই দেখা গেল বাইরে হাজার হাজার মানুষ। তারা সমস্বরে চিৎকার করছে আর তালে তালে হাততালি দিচ্ছে ‘জিম্মি জিম্মি জিম্মি..।’ কারও বা হাতে উচিয়ে ধরে রাখা পোস্টার—'উই লাভ ইউ মিঠুন!’ তার আগে শেষ কবে কোনও বিদেশির জন্ম মস্কো এত উন্মত্ত হয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলোও মনে করে বলতে পারছিল না।

আজকের পরিভাষায় বললে ততদিনে রাশিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে উত্তর কলকাতার শীর্ণ গলি থেকে উঠে আসা এই তরুণের ছবি। মিঠুন চক্রবর্তীর নাচ, তাঁর কথা বলার আদব কায়দা, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসার গল্প সোভিয়েত যুবকদের কাছে রূপকথার গল্পের মতই হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সেই গল্প।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই, পরিবারের প্রতি টান, অগণিত বাধা পেরিয়ে উঠে দাঁড়ানো—রাশিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে মিঠুন যেন হয়ে উঠেছিলেন ওয়ার্কিং ক্লাস হিরো (Working-Class Hero).

‘ডিস্কো ড্যান্সার’-এর মুক্তির পর বহু দেশের মতো রাশিয়াতেও ছবিটি মুক্তি পায়। কিন্তু যা ঘটেছিল, সেটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অভূতপূর্ব। তুষারঝরা শীতের দুপুরে মস্কোর ‘ওকতাবর’ সিনেমাহলের সামনে হাজার হাজার মানুষের লাইন—শুধু একজন মানুষকে দেখতে: মিঠুন চক্রবর্তী।

<strong>ডিস্কো কিং</strong>

সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই সময়ে সিনেমা শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল রাজনৈতিক সফট পাওয়ারের হাতিয়ার। কিন্তু কেউ কল্পনা করেনি যে ভারত থেকে আসা এক তরুণ অভিনেতা সাংস্কৃতিক আইকনের তালিকায় সোজা গিয়ে বসবেন লেনিন বা গাগারিনের পাশে।

মস্কোর এক পুরনো সিনে-ক্রিটিক আনাতোলি বারিসভ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—“আমরা ব্রুস লি দেখেছি, আমরা আল পাসিনো দেখেছি, কিন্তু ডান্স ফ্লোরে যে আগুন মিঠুন জ্বেলেছিলেন, তা আগে কখনও দেখিনি। আমাদের কাছে তিনি শুধু অভিনেতা নয়, তিনি ছিলেন এক বিপ্লব।”

<strong>মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে মিঠুন চক্রবর্তী, মমতা শঙ্কর ও মৃণাল সেন</strong>

তার পর সম্ভবত ১৯৮৯ সালের ঘটনা। আগেই থেকেই ঘোষণা করা হয়েছিল, মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখা যাবে মিঠুনকে। আয়োজকরা আন্দাজ করেছিল কয়েক হাজার মানুষ হয়তো আসবে। রাশিয়ায় সে ছিল প্রথম বলিউড রকস্টার স্টেজ শো। কিন্তু পৌঁছে গেছিলেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।

সেদিন রাতে রাশিয়ার ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে যখন হালকা আলো ঝলমল করে উঠছিল, হঠাৎ স্পটলাইটের মধ্যে উঠে এলেন মিঠুন—কালো চামড়ার জ্যাকেট, মাথায় হালকা লম্বা চুল, আর মুখে সেই পরিচিত রহস্যময় হাসি। 
তারপর বাজল সেই চেনা সুর— আই অ্যাম আ ডিস্কো ডান্সার (I am a Disco Dancer)। পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গান গাইতে লাগল। এমন উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল যে পরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লিখেছিল—বিটলসের পর এমন উন্মাদনা আমরা আগে দেখিনি (“We haven’t seen such madness since The Beatles.”)

সেই দৃশ্য আজও ইউটিউবে খোঁজ করলে হয়তো পাওয়া যাবে—একজন ভারতীয় অভিনেতা কীভাবে সোভিয়েত তরুণদের হৃদয় জয় করেছিল, সে ইতিহাস।

আবার একবার মস্কো সফরে মিঠুন হঠাৎ একদিন বেরিয়ে পড়েছিলেন শহর ঘুরতে। কোনও নিরাপত্তা ছিল না, কোনও ঘোষণা ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন, একটু নিরিবিলিতে শহর দেখবেন। একটি ছোট ক্যাফের সামনে কিছু ছেলেমেয়ে গিটার বাজিয়ে ‘জিমি জিমি’ গানটি গাইছিল। মিঠুন দাঁড়িয়ে শুনছিলেন চুপচাপ। কেউ চিনতে পারছিল না তাঁকে। হঠাৎ ক্যাফের মালিক তাঁকে দেখেই চিৎকার করে ওঠেন— মিঠুন! দ্য ডিস্কো কিং! 
ব্যস—আনন্দ, উত্তেজনা, উন্মাদনা একসাথে ছড়িয়ে পড়ল। ছোট সেই গলিতে রীতিমতো বন্ধ হয়ে গেল ট্রাফিক। সেখানে দাঁড়িয়ে মিঠুন কয়েক মিনিটের জন্য নেচে উঠেছিলেন। কোনও ক্যামেরা ছিল না, কোনও প্রচার ছিল না। তবুও সেখানে উপস্থিত কয়েক ডজন মানুষ আজও গর্ব করে বলেন— উই স মিঠুন ডান্স আন্ডার মস্কো স্ট্রিটলাইটস।

কিন্তু কেন রাশিয়া এত ভালোবেসেছিল মিঠুনকে? 

শুধু মিঠুনের নাচকে নয়, রাশিয়া ভালবেসেছিল তাঁর গল্পকে। মিঠুন স্টার-কিড ছিলেন না। বলিউডে তাঁর কোনও গডফাদার ছিল না—ছিল শুধু লড়াই। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ তাঁর মধ্যে নিজেদের লড়াই দেখেছিলেন। তাঁর চরিত্রগুলোয় সাধারণত গরিব, অত্যাচারিত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের যুবকের সংগ্রাম দেখা যেত। রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষদের কাছে তিনি তাই হয়ে উঠেছিলেন এক বাস্তব প্রতীক।

এক রাশিয়ান সাংবাদিক একবার লিখেছিলেন, মিঠুনের মতো হিরো রাশিয়ান ছবিতে আমরা দেখতে চাই, কিন্তু পাই নাষ (“Mithun is the hero we wished to see in our own films but never did.”)

অনেকেই জানেন না, ২০২২ সালে রাশিয়ায় গ্যাস সংকটের সময় সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একটি গান—জিম্মি জিম্মি জিম্মি আজা আজা আজা। তারা গানের কথা বদলে গাইতে শুরু করেছিল— “Gimme Gimme”। অর্থাৎ তাঁদের রান্নাবান্না, জল গরমের জন্য ‘গ্যাস’ চাই। BBC-র রিপোর্ট অনুযায়ী, বহু রাশিয়ান নাগরিক সরকারি নীতির প্রতি ব্যঙ্গ প্রকাশ করতে গানটি ব্যবহার করেছিলেন। অদ্ভুতভাবে একটি সামাজিক প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল মিঠুনের গান।

সে সময়ে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান অনেক সুষ্ঠু ও ধারাবাহিক ছিল। সিনেমার গল্পেও তার প্রভাব থাকত। বাংলায় যেমন ভোস্তক প্রকাশনার বই জনপ্রিয়, তেমনই রাশিয়ায় জনপ্রিয় ছিল হিন্দি সিনেমা।    

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়ার পরও রাশিয়ায় মিঠুনের জনপ্রিয়তা কমেনি। নতুন রাশিয়ার তরুণরা ভিডিও ক্যাসেট দেখে বড় হয়েছে—আর সেই ক্যাসেটগুলির বেশিরভাগ ছবিতেই নায়ক ছিলেন মিঠুন।

২০১০ সালেও মস্কোর এক কনস্যুলেট ইভেন্টে দেখা যায়, এক রাশিয়ান যুবতী কাঁদতে কাঁদতে বলছেন— “আমার মা মিঠুনের মতো নাচতেন, বাবা মিঠুনের মতো জামা প্যান্ট পরতেন, আজ তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে যেন আমার শৈশব ফিরে পেলাম।” (“My mother danced to Mithun, my father dressed like Mithun. Today, meeting him feels like meeting our childhood.”)

মিঠুন নিজেও পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “রাশিয়া আমার দ্বিতীয় বাড়ি। ওরা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তা ভাষায় বোঝানো যায় না।”

মস্কো এখনও জানে, মিঠুন কোনও সাধারণ স্টার নন। তিনি হলেন সোভিয়েত যুবসমাজের প্রথম আন্তর্জাতিক আইকন। একজন ভারতীয় অভিনেতা যিনি ভাষা, দেশ, মতাদর্শ—সব ছাপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন রাশিয়ার মানুষের নিজস্ব নায়ক। এটি এক জাতির অনুভূতি, একটা যুগের প্রতীক, একটি মানুষের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা। এবং সেই কিংবদন্তির নাম—মিঠুন চক্রবর্তী।


```