একটি সময় ছিল, যখন আলোয় দাঁড়ানো মানেই ছিল প্রশ্নের মুখে পড়া। সেই সময়ে সাহস মানে ছিল চোখে চোখ রেখে নিজের পরিচয় ঘোষণা করা। ঠিক সেই যুগের বুক চিরেই উঠে এসেছিলেন মেহের ক্যাস্তেলিনো।

প্রয়াত মেহের ক্যাস্তেলিনো।
শেষ আপডেট: 18 December 2025 12:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটি সময় ছিল, যখন আলোয় দাঁড়ানো মানেই ছিল প্রশ্নের মুখে পড়া। সেই সময়ে সাহস মানে ছিল চোখে চোখ রেখে নিজের পরিচয় ঘোষণা করা। ঠিক সেই যুগের বুক চিরেই উঠে এসেছিলেন মেহের ক্যাস্তেলিনো (Meher Castelino)।
৮১ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন—নীরবে, প্রায় শব্দহীনভাবে। কিন্তু রেখে গেলেন এমন এক আলো, যা নিভে যাওয়ার নয়। ভারতীয় পেজেন্ট এবং ফ্যাশন দুনিয়া আজ শোকস্তব্ধ, কারণ বিদায় নিয়েছেন দেশের প্রথম ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া, এক অগ্রদূত, এক স্বপ্নদ্রষ্টা নারী।
১৯৬৪ সালে ফেমিনা মিস ইন্ডিয়ার মুকুট জয় ছিল শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল নয়। সেটি ছিল সমাজের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মুম্বইয়ে জন্ম নেওয়া মেহের এমন এক সময়ে র্যাম্পে পা রেখেছিলেন, যখন ফ্যাশনকে সন্দেহের চোখে দেখা হত, নারীর প্রকাশকে ঘিরে ছিল অদৃশ্য অথচ কঠিন দেওয়াল। সেই দেওয়ালে তিনিই প্রথম আঘাত করেছিলেন—নীরব, দৃঢ়, আত্মমর্যাদায় ভর করে।
তাঁর জয় যেন খুলে দিয়েছিল এক অদেখা দরজা। সেই দরজা দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম হেঁটে গিয়েছে মাথা উঁচু করে, বুক ভরে স্বপ্ন নিয়ে। ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন মিস ইউনিভার্স ও মিস ইউনাইটেড নেশনসের মঞ্চে। বিশ্বের নানা প্রান্তে দুই হাজারেরও বেশি শো-তে অংশ নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় নারীর আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি—শব্দের বাইরে গিয়েও যিনি কথা বলতে জানতেন।
র্যাম্প ছিল তাঁর প্রথম ভাষা, কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি মেহের। ফ্যাশনের ঝলমলে আলোর পাশাপাশিই তিনি হেঁটেছেন নিউজ়রুমের অলিগলিতে। ১৯৭৩ সালে Eve’s Weekly-তে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম লেখা। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রথম সারির ফ্যাশন সাংবাদিক হিসেবে। স্টাইল, সংস্কৃতি, সময়ের রুচি—সবকিছুকে ছুঁয়ে যাওয়া তাঁর প্রবন্ধ আজও আলোচনার কেন্দ্রে। কলমেও তিনি ছিলেন ঠিক ততটাই দৃঢ়, যতটা র্যাম্পে।
তাঁর প্রয়াণের খবর জানিয়ে ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া সংগঠন সামাজিক মাধ্যমে এক আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছে। সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে পথিকৃৎ—যিনি দরজা খুলেছেন, মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, আর প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছেন। তাঁদের কথায়, মেহের ক্যাস্তেলিনোর উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে সেই সব যাত্রার মধ্য দিয়ে, যেগুলো তিনি সম্ভব করে তুলেছিলেন, আর সেই স্বপ্নগুলোর মধ্যে, যেগুলো তিনি গড়ে দিয়েছিলেন।
ফেমিনা মিস ইন্ডিয়ার অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল থেকে শেয়ার করা হয়েছে মেহেরের র্যাম্প ওয়াকের একটি ভিডিও। সেখানে কোনও উচ্চস্বরে ঘোষণা নেই, নেই নাটকীয়তা। আছে কেবল অবিচল পদচারণা—যেন প্রতিটি ধাপে ধাপে লেখা হচ্ছে আত্মমর্যাদার কবিতা। সেই হাঁটা আজও বলে যায়, কীভাবে নিঃশব্দে ইতিহাস গড়া যায়।
মেহের ক্যাস্তেলিনো চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পথ রয়ে গেছে। ভারতীয় নারীদের স্বপ্নে, আত্মবিশ্বাসী পদচারণায়, আলোয় দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনে নেওয়ার সাহসে—সেখানেই তিনি বেঁচে থাকবেন। র্যাম্পের আলো নিভলেও, তাঁর উত্তরাধিকার চিরকালই আলো জ্বালিয়ে রাখবে বহু প্রজন্মের হৃদয়ে।