শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে ফিরে দেখা বাংলা ছবির সে যুগ থেকে এ যুগের নায়িকাদের। সাদা কালো থেকে রঙিন যুগের বাংলা ছবিতে তাঁর কাহিনির কদর এতটুকু কমেনি। বহু অভিনেত্রীর কেরিয়ার ফিরেছিল শরৎচন্দ্রের চরিত্র করেই।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 15 September 2025 15:55
তাঁকে বলা হত কথাশিল্পী। তাঁর কলমের লেখা হত একেবারে সংলাপের মতো। তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Sarat Chandra Chattopadhyay)। অতীতের পরিচালকরা বলতেন শরৎচন্দ্রের নিজের লেখাই একেবারে চিত্রনাট্যর মতো। যে কারণে তাঁর কাহিনি নিয়ে যুগে যুগে চলচ্চিত্র (Bengali Film) হয়েছে এতবার। প্রতিটি অভিনেত্রীর কাছেই শরৎচন্দ্রের চরিত্র হতে পারা স্বপ্ন। তাই যে কোনও অভিনেত্রী (Actress) কথাশিল্পীর উপন্যাসের চরিত্র করবার সুযোগ পেলে কখনও হাতছাড়া করেননি।
আজ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে ফিরে দেখা বাংলা ছবির সে যুগ থেকে এ যুগের নায়িকাদের। সাদা কালো থেকে রঙিন যুগের বাংলা ছবিতে তাঁর কাহিনির কদর এতটুকু কমেনি। বহু অভিনেত্রীর কেরিয়ার ফিরেছিল শরৎচন্দ্রের চরিত্র করেই।

মেজ দিদি (১৯৫০)
নামভূমিকায় কাননবালা। তখন কাননবালা নিজের প্রযোজনা সংস্থা 'শ্রীমতী পিকচার্স' খুলে দুটি ছবি করেছেন। কিন্তু হিটের মুখ দেখেননি। ভাবছেন প্রোডাকশন হাউজ বন্ধ করে দেবেন। তৃতীয় ছবি করবেন ভাবলেন শেষবারের মতো। শুরু করলেন শরৎচন্দ্রের 'মেজদিদি'। পরিচালক কাননের বর হরিদাস ভট্টাচার্য। নামভূমিকায় কানন নিজেই। স্নেহ, মায়া আর মমতায় কানন যেন সারা বাংলার মেজদিদি হয়ে উঠলেন। এই ছবি দিয়েই বিশাল সাফল্য পেল শ্রীমতী পিকচার্সের। কানন দেবী বিশাল লাভের মুখ দেখলেন। আরও ছবি করার সাহসও পেলেন। মেজদিদি কাননকে দেখে ঘরে ঘরে ভাইদের কাছে তাঁদের মেজদিরা কাননের মতো মেজদিদি হয়ে উঠেছিলেন। কানন দেবী বললেই আজও মানুষ বলে মেজদিদি।

কমললতা (১৯৬৯): নিস্কাম প্রেমের উপাখ্যান শরৎচন্দ্রের কমললতা। বিলেত ফেরত পরিচালক হরিসাধন দাশগুপ্তর হাতে পড়ে শরৎচন্দ্রের কাহিনি যেন সাহসী রূপ পেল পর্দায়। শ্বেতশুভ্র শাড়িতে সুচিত্রা সেন অনন্যা। উত্তমের বিপরীতে সুচিত্রা সেন সাদা থান পরে ছবি করতে ভয় পেতেন। কারণ 'অন্নপূর্ণার মন্দির' ও 'সাঁঝের প্রদীপ' দুটি ছবি সেভাবে চলেনি। কারণ সেখানে ছিল না উত্তম-সুচিত্রার রোম্যান্স। উত্তমও ধরে নিয়েছিলেন বিধবা বেশে সুচিত্রা তাঁর বিপরীতে থাকলেই ছবি ফ্লপ হবে। কিন্তু শরৎচন্দ্রের 'কমললতা' যখন ১৯৬৯ র পুজোয় রিলিজ করল ছবি সুপার ডুপার হিট। হরিসাধন দাশগুপ্ত বৈষ্ণব প্রেমের যে স্বর্গীয় রূপ পর্দায় তুলে ধরেন তা অনির্বচনীয়। রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানগুলি ছবিকে কাল্ট করে দেয়। হরিসাধন সুচিত্রাকে কমললতা রূপে এমন ভাবে গড়ে তুললেন যে গাছের পাতা নড়বে কিন্তু ডাল ভাঙবে না।
বিন্দুর ছেলে (১৯৭৩): নিজের সন্তান না হলেও যে পরের সন্তানকে মাতৃস্নেহে আপন করে নেওয়া যায় তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বিন্দুর ছেলে। বিন্দুবাসিনীর চরিত্র করে মাধবী মুখোপাধ্যায় আজও আইকনিক হয়ে আছেন মূলধারার ছবিতে। গুরু বাগচীর পরিচালনায় এই ছবি আজও সবার প্রিয়।

দত্তা (২০২৩): দত্তা তিনবার হয় বাংলা ছবিতে। সুনন্দা দেবী, সুচিত্রা সেন ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত করলেন দত্তার বিজয়া চরিত্রটি। নির্মল চক্রবর্তীর পরিচালনায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এই ছবির প্রাণপ্রতিমা। সারা ছবি জুড়ে ঋতুপর্ণাকে সাবেকি সাজে দেখতে ভীষণ সুন্দর লেগেছে। ব্রাহ্ম মহিলার সেই স্নিগ্ধতা উঠে এসছে ঋতুপর্ণার সাজ ও বডি ল্যাঙ্গোয়েজে। এরজন্য পোশাক পরিকল্পনায় সাবর্ণী দাস অসাধারণ। অনেকেই বলবেন মূল সাহিত্যে বিজয়ার বয়স কুড়ির কোঠায় সেখানে ঋতুপর্ণা কী মানানসই? সে তো সুচিত্রা সেন তাঁর বিজয়া বেলাতেই বিজয়া করেন এবং সে ছবি ব্লকব্লাস্টার হিট করে। ঋতুপর্ণা সুচিত্রা সেনের কোন ম্যানারিজম এ ছবিতে আনেননি। বরং নিজ স্বতন্ত্রায় মন ভরিয়েছেন তিনি।

ও অভাগী (২০২৪): বাংলাদেশের নায়িকা রাফিয়াদ রশিদ মিথিলার কলকাতার সেরা ছবি 'ও অভাগী'। অনির্বাণ চক্রবর্তীর পরিচালনায় ভীষণ সাহসী রূপ পেল শরৎচন্দ্রের 'অভাগীর স্বর্গ'। 'অভাগীর স্বর্গ' গল্প নতুন করে বলার কিছু নেই। স্কুলের পাঠ্যবইতে প্রায় আমাদের সকলেরই পড়া। কিন্তু সাহিত্যের বাঁধা ফ্রেমে পরিচালক ছবির চিত্রনাট্যকে গড়েননি। 'ও অভাগী' অনেক বেশি সাহসী, অনেক বেশি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। শরৎচন্দ্রের গল্পে অভাগীর স্বপ্ন ছিল স্বামীর হাতের সিঁদুর আর ছেলের হাতের আগুন নিয়ে চন্দন কাঠে পুড়ে স্বর্গে যাওয়ার। কিন্তু 'ও অভাগী' ছবিতে পরিচালক নিয়ে এলেন যমরাজের চরিত্র।এখানে যমরাজের সঙ্গে অভাগীর এক প্রেমের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। যে যমরাজকে ভালবেসে অভাগী নিজের স্বামীর বিছানায় কামশীতল রয়ে যায়। এমনকী অভাগীর সঙ্গে যমরাজের সঙ্গম পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের কাহিনিতে আনলেন পরিচালক।

পর্দা কেঁপে উঠল। যা অনেকেই বলবেন অশ্লীল শরৎসাহিত্যকে বিকৃত করার চেষ্টা কিন্তু যে ভাবনা থেকে পরিচালক এমন সব দৃশ্যের প্রয়োগ করেছেন তার প্রেক্ষাপট অনেক বড়। শরৎচন্দ্রের গল্পের শেষে বিষাদের সুর আছে কিন্তু 'ও অভাগী'র শেষে প্রতিবাদের আগুন আছে, যা দাবানল হয়ে জ্বলতে থাকে মা হারা কাঙালির চোখে। রাফিয়াদ রশিদ মিথিলার শ্রেষ্ঠ অভিনয় অভাগী। একলা মেয়ে নিজের সতীত্ব রক্ষা করতে শত পুরুষের প্রলোভন কী ভাবে এড়িয়ে চলে তা মিথিলার অভিনয়ে দুর্দান্ত ফুটে উঠেছে।