ঋতুপর্ণ ঘোষ একবার বলেছিলেন 'বাংলা ছবির নায়িকা ছিলেন কানন দেবী' এটা বলা ভুল। বলা উচিত 'বাংলা ছবির নায়িকা কাননবালা'। আসলে বালা থেকে দেবীতে কাননের উত্তরণ সোজা ছিল না। সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণ।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 17 July 2025 14:05
সজনীকান্ত দাস ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন "কানন দাস থেকে হল কাননবালা এখন কানন দেবী"। তাতে কিছুই এসে যাইনি কাননের। তিনি সবার কানন মা। দেবী কেউ উপাধি নিয়ে হন, কেউ সম্পত্তির জোরে হন, কেউ খ্যাতির জোরে হন। কাননের এই সবকটি ছিল। কিন্তু কাননের দেবীতে উত্তরণ ঘটে আন্তরিকতা আর মমত্ববোধের জোরে।তারকা খ্যাতি কখনও কাননকে অহংকারে গ্রাস করেনি। আজ সেই কানন বালার প্রয়াণ দিবস।
ঋতুপর্ণ ঘোষ একবার বলেছিলেন 'বাংলা ছবির নায়িকা ছিলেন কানন দেবী' এটা বলা ভুল। বলা উচিত 'বাংলা ছবির নায়িকা কাননবালা' বলা উচিত। আসলে বালা থেকে দেবীতে কাননের উত্তরণ সোজা ছিল না। সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণ।

এমন সময় বিখ্যাত পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখে পড়েন কানন। জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ম্যাডান থিয়েটারের ব্যানারে কাননের প্রথম ছবি 'জয়দেব'। রাধার ভূমিকায় শিল্পী জীবন শুরু। তারপর এল সবাক ছবির যুগ। জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জোর বরাত'।

কাননবালা নামটা সবার কাছে হয়ে ওঠে বাসনার রূপবতী। 'রূপবাণী' সিনেমাহলে এক যুবক মোহগ্রস্ত হয়ে কাননের 'মানময়ী গার্লস স্কুল' ছবির রোমান্টিক দৃশ্যের সময় পর্দার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন।
প্রমথেশ বড়ুয়া 'দেবদাস' ছবিতে পার্বতীর ভূমিকায় কাননকে চেয়েছিলেন। কিন্তু কানন তখন রাধা ফিল্মসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন বলে স্বপ্নের চরিত্র হারান। তবে আবার সুযোগ হল বড়ুয়া সাহেবের ছবি 'মুক্তি' তে নায়িকা হবার। 'মুক্তি'তে কাজ করেই কাননবালা পেলেন তারকা মর্যাদা।
কাননবালা নায়িকা-গায়িকা দুই রূপেই শীর্ষস্থানিয়া। ওস্তাদ আল্লারাখা, রাইচাঁদ বড়াল,কৃষ্ণচন্দ্র দে,পঙ্কজ কুমার মল্লিক, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়,কাজী নজরুল ইসলাম সকলকে গুরু পেয়েছেন। হিন্দি বাংলা গান দুই ক্ষেত্রেই কাননের কন্ঠ সুপারহিট। 'আমি বনফুল গো' থেকে 'তুফান মেল'।
প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কাননবালার আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘এ হল কানন, তারকা নায়িকা।’’ কানন প্রণাম করতে রবীন্দ্রনাথ ওঁর ঠোঁট ছুয়ে বলেছিলেন, ‘‘কী সুন্দর মুখ তোমার! গান করো? শুনিও’’
কাননের জীবনে ল্যান্ডমার্ক চরিত্র দেবকী বসুর 'বিদ্যাপতি'তে অনুরাধা। ওস্তাদ আল্লারাখা, রাইচাঁদ বড়াল,কৃষ্ণচন্দ্র দে,পঙ্কজ কুমার মল্লিক, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়,কাজী নজরুল ইসলাম সকলকে গুরু পেয়েছেন। হিন্দি বাংলা গান দুই ক্ষেত্রেই কাননের কন্ঠ সুপারহিট। 'আমি বনফুল গো' থেকে 'তুফান মেল'।
প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কাননবালার আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘এ হল কানন, তারকা নায়িকা।’’ কানন প্রণাম করতে রবীন্দ্রনাথ ওঁর ঠোঁট ছুয়ে বলেছিলেন, ‘‘কী সুন্দর মুখ তোমার! গান করো? শুনিও’’
কাননের জীবনে ল্যান্ডমার্ক চরিত্র দেবকী বসুর 'বিদ্যাপতি'তে অনুরাধা।
কানন দেবী পশ্চিম বাংলার প্রথম স্টার, যাকে নিয়ে ছবি করতে বম্বের প্রযোজক কলকাতায় এসেছিলেন। বম্বের লক্ষ্মীদাস আনন্দ কলকাতায় এসে দেবকী বসুর হিন্দি ছবি 'কৃষ্ণলীলা'তে কাননকে রাধার চরিত্রে দেন। কৃষ্ণলীলা এবং 'চন্দ্রশেখর' করার সময় মুম্বাইয়ের প্রযোজকরা কাননকে যা পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন সেই অঙ্ককে সমসাময়িক কোন শিল্পী ছাপিয়ে উঠতে পারেননি।
কানন নির্মিত শ্রীমতী পিকচার্সের প্রযোজনায় মুক্তি পেল দুটি ছবি 'অনন্যা' আর 'বামুনের মেয়ে'। প্রশংসিত হলেও ছবি দুটি দর্শক আনুকল্য পাইনি। তবুও চ্যালেঞ্জ নিলেন কানন। তিন নম্বর ছবি হিট না হলে তিনি আর ছবি করবেননা। তৃতীয় ছবি 'মেজদিদি'। সুপারহিট। 'মেজদিদি' ই কাননের প্রথম চরিত্রাভিনয়।
ব্রাহ্মসমাজের প্রথম সারির নেতা এবং সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের পুত্র ছিলেন অশোক মৈত্র। কিন্তু শ্বশুর হেরম্বচন্দ্র মৈত্র সিনেমা লাইনের মেয়ে কাননকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেননি। তাই তাঁর প্রয়াণের পর কানন-অশোকের বিয়ে হয়। শাশুড়ি ভালবাসতেন কাননকে। কিন্তু অশোক চাননি বংশপরিচয়হীনা কাননের গর্ভে তাঁর সন্তান আসুক। কাননকে সিনেমা জগত ছেড়ে দিতেও তিনি বলেন। পুরুষের বশ্যতা স্বীকার করেননি কানন। ভেঙে যায় বিয়ে।
কাননের দ্বিতীয় স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য ছিলেন রাজ্যপালের এডিসি। সুদর্শন হরিদাসের প্রেমে পড়েছিলেন কানন। হরিদাসকে পরিচালক রূপে গড়ে তোলেন কাননই। কিন্তু শেষদিকে কাননের সংসার থেকে বেরিয়ে যান হরিদাস। যদিও স্বামীর জন্য টাকা পাঠিয়ে দিতেন কানন। একবার তো স্বামী অসুস্থ হলে কানন সেবা করেও এসেছিলেন দিনের পর দিন। এই হলেন কানন দেবী।
কানন দেবীর মাথার মোঘটা ছিল তাঁর আভিজাত্য,লজ্জা নয়। কানন দেবীর জীবন থেকে স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য সরে যাবার পর নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন কানন।
১৭ জুলাই ১৯৯২ রাত দশটা নাগাদ কাননের মৃত্যু হয় বেলভিউ নার্সিংহোমে।
স্ত্রীর সাফল্য স্বামীরা মেনে নিতে পারেন না। কানন দেবীর দুই স্বামীও পারেননি। কিন্তু কাননের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁরা চোখের জল ফেলেছিলেন।
সেবাব্রত গুপ্তর সৌজন্যে পরদিন ১৮জুলাই একমাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় কানন দেবী আর নেই। এ খবর আর কোন সংবাদপত্র জানতে পারেনি। ১৯ জুলাই সমস্ত সংবাদপত্রে খবর বেরোয়।
ইন্ডাস্ট্রির মায়ের মরদেহ স্টুডিও পাড়ায় এলে শেষশ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন হাতে গোনা কজন। মাধবী মুখার্জী,অনুপ কুমার,সংঘমিত্রা ব্যানার্জী,শকুন্তলা বড়ুয়া।
'শ্রীমতী পিকচার্স' এর শিক্ষানবীশ থেকে পরিচালক হয়ে ওঠা তরুণ মজুমদার এসে বলেছিলেন "আজ বাংলা ছবি মাতৃহারা হল।"
কানন দেবীর শেষকৃত্যে এত কমজন উপস্থিত দেখে অনুপকুমার বলেছিলেন তাঁর মরদেহ যেন স্টুডিওপাড়ায় না আনা হয়। অথচ
কাননের অবদান ভোলার মতো নয়। সমস্ত স্তরে আজও তিনি জনপ্রিয়। কানন দেবীকে মহানায়িকা বললেও অত্যুক্তি হয়না।