গুরু দত্তকে একবার বাংলা ছবির নায়ক ভাবলেন কানন দেবী ও তাঁর স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য। কাননের 'শ্রীমতী প্রোডাকশন'-এর ব্যানারে তৈরি হবে শরৎচন্দ্রের 'অভয়া ও শ্রীকান্ত'।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 July 2025 20:24
সাদা-কালো বলিউড ছবিতে এক প্রথম সারির নাম গুরু দত্ত। নায়ক ও পরিচালক, দুই রূপেই তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছন। আজ সেই চলচ্চিত্র মহীরুহের শততম জন্মদিন। আজ যখন ভারতীয় চলচ্চিত্র তাঁর শতবর্ষ উদযাপন করছে তখন আমার মতে পাঁচের দশকে চলচ্চিত্র ইতিহাসে শীর্ষবিন্দু তিনিই।
ফ্যাশন, কমেডি, চটুলপনার বাইরে গিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রকে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন এক স্বর্গীয় মুগ্ধতায়। সাদা-কালোতে তিনি এক মায়া তৈরি করতেন পর্দায়। আর সেই মায়া আরও ফুটে উঠত যখন গুরুর ছবিতে পর্দায় আসত গীতা দত্তের গান। গীতার গলায় মাদকতা আর শূন্যতা একই সঙ্গে খেলা করত। দত্ত দম্পতি বলিউড ছবির ইতিহাসে এক সোনার যুগ রচনা করে দিয়েছিলেন।

বাংলা ছবিতেও কিন্তু গুরু দত্ত অভিনয় করবেন কথা হয়েছিল। ধুতি-পাঞ্জাবিতে তাঁর মতো সুপুরুষ খুব কম অভিনেতাকেই লাগত। যে খবর সে অর্থে কখনও সামনে আসেনি।
গুরু দত্তকে একবার বাংলা ছবির নায়ক ভাবলেন কানন দেবী ও তাঁর স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য। কাননের 'শ্রীমতী প্রোডাকশন'-এর ব্যানারে তৈরি হবে শরৎচন্দ্রের 'অভয়া ও শ্রীকান্ত'। এরআগে কানন দেবীর প্রযোজনায় হরিদাস ভট্টাচার্য বানিয়েছিলেন 'রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত'। শ্রীকান্ত উত্তমকুমার আর রাজলক্ষ্মী সুচিত্রা সেন। সেই জুটির পরিপূরক কী অন্য কেউ হতে পারে? তাই বড় চমক দিতেই পরের ছবিতে শ্রীকান্ত চরিত্রে বম্বের গুরু দত্তকে ভাবলেন হরিদাস। কিন্তু টলিউডের ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমারকে ছেড়ে গুরু দত্ত কেন?
আসলে উত্তমকুমারের সঙ্গে তখন হরিদাসের সম্পর্ক তিক্ততায় ভরে উঠেছে। তাই উত্তমকুমার না করায় ঐ সময়ে বম্বের এক নম্বর হিরো গুরু দত্তকে শ্রীকান্তর চরিত্রে ভাবা হল। কিন্তু তখন গুরুর নারীসঙ্গ আর নেশায় অতিষ্ঠ হয়ে গীতা সন্তানদের নিয়ে ঘর ছেড়েছেন। গুরু তখন যেনতেনপ্রকারেণ তাঁর জীবনে গীতাকে ফেরাতে চান।
তাই গুরু হরিদাস ভট্টাচার্যকে বললেন "আমি শ্রীকান্ত করলে অভয়ার রোলে গীতা দত্তকে নিতে হবে"।
গীতা গান করেন ভাল, কিন্তু অভিনয় করেন কেমন? তা তো কেউ জানেনা। গীতার সঙ্গে সম্পর্ক ফেরাতে গুরু গীতাকে নায়িকা করে অনেক আগেই 'গৌরী' বাংলা ছবি করতে চলেছিলেন। 'গৌরী' তিনটি ভাষার ছবি চর্চিত থাকলেও গৌরী ছিল বাংলা ছবি। গীতা দত্ত বলে গেছিলেন "আমার হিন্দি সংলাপ অত দর ছিলনা,তাই 'গৌরী' বাংলা ছবি করছিলেন নির্মাতা গুরু দত্ত'। সেই ছবির কয়েকটা গানের দৃশ্য শ্যুট হলেও ছবি আর এগোয়নি পরে। 'গৌরী'র সুরকার ছিলেন শচীন দেব বর্মণ। গীতার গান শচীন দেব পরবর্তী কালে নিজের গলায় বেসিক রেকর্ড করলেন 'বাঁশি শুনে আর কাজ নাই,সে যে ডাকাতিয়া বাঁশী'।

গীতার অভিনয় ক্ষমতা দেখাতে গুরু হরিদাসকে সেই 'গৌরী' ছবির কিছু রিল দেখালেন। কিন্তু সেগুলো শুধু গানের দৃশ্য যা পছন্দ হল না হরিদাসের। তাই হরিদাস ভট্টাচার্য আর কানন দেবী গীতাকে অভয়ার চরিত্রে নিতে পারবেন না জানিয়ে দেন। ফলতঃ গুরু দত্তও বাংলা ছবি করা থেকে সরে দাঁড়ান।

শেষ অবধি, শ্রীকান্তর ভূমিকায় বসন্ত চৌধুরীকে নেন হরিদাস। কিন্তু প্রযোজক কানন দেবী অভয়ার চরিত্র করতে নায়িকা আনলেন সেই বম্বে থেকেই। গুরুর 'পিয়াসা' ছবির নায়িকা মালা সিনহা। বসন্ত ও মালার শ্রেষ্ঠ অভিনয় হয়ে থাকল 'অভয়া ও শ্রীকান্ত' ছবি। কানন দেবীর শ্রীমতী প্রোডাকশনের শেষ ছবি ছিল এটি। গুরু দত্তর আর বাংলা ছবি করা হল না। গীতা দত্ত পরবর্তী কালে 'বধূবরণ' বাংলা ছবিতে নায়িকা হয়েছিলেন। কিন্তু নায়িকা হবার বরণ ভাগ্য গীতার ছিল না। ছবি হয় সুপারফ্লপ। কানন আর হরিদাসের জহুরির চোখ ছিল তা প্রমাণ হয়েই গেল।