জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতার জীবনের মোড় ঘুরে যায় 'সালাম বম্বে!'র পর। আজ তিনি পেশায় অটোচালক।

শেষ আপডেট: 1 August 2025 12:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিনেমার শহর মুম্বইয়ে রোজ হাজার হাজার মানুষ আসেন ভাগ্য বদলের আশায়। কেউ সফল হন, কেউ হারিয়ে যান। কিন্তু শফিক সৈয়দের কাহিনি ঠিক এদের কোনওটার মধ্যেই সম্পূর্ণ মেলে না। তিনি একদিকে যেমন স্বপ্নপূরণের বিরল উদাহরণ, তেমনই আবার স্বপ্নভঙ্গের করুণ চিহ্নও।
মাত্র কয়েক বছর বয়সে বেঙ্গালুরু থেকে পালিয়ে আসেন মুম্বইতে। থাকতেন রাস্তার ধারে, স্টেশন চত্বরে। সেখানেই এক কাস্টিং এজেন্টের চোখে পড়েন তিনি। এরপরই মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’-তে মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। সিনেমাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি পায়, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এও মনোনীত হয়। শফিক পায় জাতীয় পুরস্কার, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছবি তোলার সম্মান। অথচ তার পরেই যেন বন্ধ হয়ে যায় জীবনের সব দরজা।
শফিকের কথায়, “আমাকে কোনও অভিনয়ই করতে হয়নি। ক্যামেরার সামনে শুধু আমি ছিলাম। সিনেমার দৃশ্যগুলোর সঙ্গে আমার বাস্তব জীবনের পার্থক্য ছিল না বললেই চলে।” এ সিনেমার গল্প ছিল ভারতের রাস্তাঘাটে বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়ে—আর সেটাই ছিল শফিকের জীবন।
‘সালাম বম্বে!’-র সাফল্যের পর শফিক কিছুদিন মুম্বইয়ের রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, ছবি দেখেছেন, স্ট্রিট ফুড খেয়েছেন। আশা করেছিলেন, নতুন কাজ আসবে। কিন্তু বাস্তব ছিল নির্মম। আট মাস ধরে বিভিন্ন প্রযোজকের দরজায় কড়া নেড়েও কোনও কাজ পাননি। হাতে থাকত কেবল পুরনো খবরের কাগজে ছাপা নিজের ছবি।
মুম্বইয়ে একবার চৌপাট্টি বিচে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, আরেকবার বেঙ্গালুরুতে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বেঁচে যান, ফিরে আসেন বেঙ্গালুরুতেই। ১৯৯৬ সাল থেকে রোজগারের জন্য চালাতে শুরু করেন ভাড়ার অটো রিকশা। প্রতিদিন গড়ে আয় হত ১৫০ টাকা, আর পরিবারে তখন পাঁচ জনের খরচ চলত তাতে।
একসময় চার সন্তানের বাবা হন শফিক। তাঁদের জন্যই চেয়েছিলেন অন্যরকম একটা ভবিষ্যৎ। বলেছিলেন, “আমি যদি পড়াশোনা করতাম, হয়তো আরও বড় সুযোগ পেতাম। স্ক্রিপ্ট পড়ে বুঝতে পারতাম। অভিনয় আমার কেরিয়ার হতেই পারত।” পরে অটো চালানো ছেড়ে দেন। কাজ নেন কন্নড় টিভি সিরিয়ালের টেকনিশিয়ান হিসেবে। কিন্তু নিজের অভিনয় জীবন নিয়ে তিনি খুব একটা কথা বলেন না, বলেননি কখনও।
‘সালাম বম্বে!’-র পর আর একটি মাত্র সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, গৌতম ঘোষের 'পতঙ্গ'-তে। তারপরই চিরতরে বিদায় নেন মুম্বই থেকে। ২০১০ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এই ছবি একটা দুঃস্বপ্নের মতো। যেটা বাস্তব। ১৫ মিনিটের খ্যাতি পাওয়ার পর আর কিছু না পাওয়া—এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।” ‘সালাম বম্বে!’-র সঙ্গে যুক্ত একজন, বিশ্বদীপ চট্টোপাধ্যায়, স্মৃতিচারণায় লেখেন, “শফিক ছিল ছবির প্রধান শিশু শিল্পী। র্যাপ পার্টির দিন সবচেয়ে বেশি মনখারাপ ছিল ওর—কারণ তখন ও বুঝতে পেরেছিল, এর পর কী?”
শেষমেশ কী হল শফিকের? আজ তিনি নিজের প্রাক্তন পরিচয় লুকিয়ে রাখেন, খুব কম কথা বলেন অভিনয় নিয়ে। মাঝে মধ্যে সিনেমার ইউনিটের সঙ্গে বেঙ্গালুরু থেকে অন্য শহরে যান কাজের সূত্রে, কিন্তু আর কোনওদিন আলোচনায় আসেননি। সালাম বম্বে! ছবির প্রযোজকরা পরবর্তীতে রাস্তার ছেলেমেয়েদের জন্য তৈরি করেছিলেন ‘সালাম বালক ট্রাস্ট’।