‘অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন দুলাল দে। তারও আগে দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার ‘গোলন্দাজ’-এর মতো পিরিওডিক্যাল ড্রামার স্ক্রিপ্ট তাঁরই লেখা। সেই সময়েই ‘ফাঁদ’-এর গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল।

শেষ আপডেট: 8 February 2026 15:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজনীতি মানে স্লোগান, মিছিল আর বক্তৃতা—দুলাল দে (Dulal Dey) সেই ধারণাকেই ভেঙে দিতে চলেছেন তাঁর দ্বিতীয় পরিচালিত ছবি ‘ফাঁদ’ (Faand)-এ। রাজনীতি নিছক ক্ষমতার খেলা নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়া এক অবস্থান, ধীরে-ধীরে গড়ে ওঠা সংঘর্ষ। যে সংঘর্ষ কখনও বন্ধুত্বে ফাটল ধরায়, কখনও প্রেমকে বিপন্ন করে, আবার কখনও বিশ্বাসের ভিতটাই টলিয়ে দেয়।
‘অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন দুলাল দে। তারও আগে দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার ‘গোলন্দাজ’-এর মতো পিরিওডিক্যাল ড্রামার স্ক্রিপ্ট তাঁরই লেখা। সেই সময়েই ‘ফাঁদ’-এর গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল।
পরিচালক বললেন, ‘বছর পাঁচেক আগে এই স্ক্রিপ্ট প্রথম শোনেন ইশা সাহা, আড়াই বছর আগে ঋত্বিক চক্রবর্তী, অনির্বাণ চক্রবর্তী যুক্ত হন দেড় বছর আগে। আমার যাঁরা কাছের মানুষজন, তাঁরাই বারবার বলেছেন, এই গল্পটাই যেন আমার দ্বিতীয় ছবি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই কথাই সত্যি হল।’
ছবির নাম ‘ফাঁদ’, কেন এমন নাম? কেই বা পড়তে চলেছে তাতে?
এমন এক প্রশ্নে দুলাল বললেন, ‘রাজনৈতিক থ্রিলারও বলা যেতে পারে সোশ্যাল ড্রামা, গল্প ছড়িয়ে আছে তিন প্রজন্ম জুড়ে। এটা কিন্তু শুধু রাজ্যের রাজনীতির গল্প নয়, এ গল্প ওয়ার্ডের, পাড়ার, গলির—আজকের সামাজিক বাস্তবতার গল্প।’
ছবিটা পুরোটা ফিকশন হলেও, তার শরীরে লেগে আছে চেনা সময়ের ধুলো। কাহিনি ও চিত্রনাট্য—দুটোই দুলাল দে-র, আর সেই লেখার মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা।
তিনি বলছিলেন, শৈশবে নিজের পাড়ায় বারবার দেখেছেন—যে ছেলেরা আবৃত্তিতে ভাল, নাটকে সক্রিয় বা খেলাধুলায় পরিচিত মুখ, তাদের সঙ্গে এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের এক ধরনের নীরব সখ্য গড়ে ওঠে। কখনও হরলিক্স কিনে দেওয়া, কখনও কোনও অনুষ্ঠানের মঞ্চে আলাদা করে তুলে ধরা, আবার কখনও নিঃশব্দে খোঁজখবর রাখা—এই সব যত্নের আড়ালেই কাজ করে এক অদৃশ্য রাজনীতি। কারণ এই ‘ভাল ছেলেরা’ যদি কারও সম্পর্কে বলে দেয়, “ওই দাদাটা সত্যিই ভাল মানুষ”, তাহলে তার প্রভাব পড়ে গোটা পাড়ায়। তবু মজার বিষয়, এই ছেলেরা নিজেরা রাজনীতিতে নামে না, আবার সেই নেতারাও তাদের সরাসরি রাজনীতির ময়দানে টানতে চান না। এই বোঝাপড়া, এই সূক্ষ্মতা অথচ গভীর টানাপড়েনই ‘ফাঁদ’-এর আসল রাজনৈতিক সুর।
এই ছবির গল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঋত্বিক চক্রবর্তী, অনির্বাণ চক্রবর্তী, ইশা সাহা, সুহত্রো মুখোপাধ্যায় ও সায়ন ঘোষকে কেন্দ্র করে। কাহিনির বুকে অর্জুন, ইশা আর সুহত্রো—তিন বন্ধুর জীবন জড়িয়ে আছে প্রেমের উষ্ণতা, রাজনীতির চাপ, প্রতিহিংসার বিষ, ষড়যন্ত্রের অন্ধকার আর প্রতিশোধের জ্বালা নিয়ে। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওঠানামার মধ্যেই ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া। এই জটিল আবহে ঋত্বিক ও অনির্বাণ আবারও প্রমাণ করেন, কেন তাঁরা সমসাময়িক বাংলা সিনেমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অভিনয়শিল্পীদের অন্যতম।
ছবিতে রয়েছেন রাজনীতিবিদ কুণাল ঘোষের বিশেষ উপস্থিতি। তিনি এখানে সরাসরি রাজনৈতিক চরিত্রে নন, কিন্তু এই রাজনীতির জগতেরই অংশ। তাঁর চরিত্রের নিজস্ব এক অবস্থান, নিজস্ব এক রাজনীতি আছে, যা গল্পকে আরও বহুস্তরীয় করে তোলে।
মার্চ মাসে কলকাতাতেই শুরু হবে ‘ফাঁদ’-এর শুটিং। কিন্তু তার আগেই ছবির ভাবনা দর্শকের মনে প্রশ্ন তুলে দেয়—আমরা যে সমাজে বাঁচি, সেখানে কে কাকে ব্যবহার করছে, কে কার ফাঁদে পা দিচ্ছে? এমন গল্প শেষ হয়, প্রশ্নগুলো থেকে যায়। পরিচালকের কথায়— ‘ফাঁদ’ রাজনৈতিক ছবি নয়; সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের এক গভীর, আত্মকথা’।