বাংলা ছবির অচেনা অন্ধকারে আবার আলো ফেলতে চলেছেন পরিচালক অভিরূপ ঘোষ। অতিপ্রাকৃতিক আবহ, রহস্যের গা ছমছমে নীরবতা আর মানবমনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়—সব মিলিয়ে নতুন একটি ছবির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল কলকাতায়।

শেষ আপডেট: 23 January 2026 11:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা ছবির অচেনা অন্ধকারে আবার আলো ফেলতে চলেছেন পরিচালক অভিরূপ ঘোষ। অতিপ্রাকৃতিক আবহ, রহস্যের গা ছমছমে নীরবতা আর মানবমনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়—সব মিলিয়ে নতুন একটি ছবির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল কলকাতায়। বহুদিন পর ফের এক ফ্রেমে দেখা যাবে ঋত্বিক চক্রবর্তী ও অনির্বাণ চক্রবর্তীকে (ritwick chakraborty, Anirban Chakraborty)। মনোজ সেনের বিখ্যাত গল্প ‘কালরাত্রি’ ( kalratri, manoj sen) অবলম্বনে নির্মিত এই ছবির অস্থায়ী নাম রাখা হয়েছে ‘মনোজ সেনের কালরাত্রি’, যেখানে সময়, মানুষ আর অদৃশ্য শক্তির সংঘাতই হয়ে উঠবে মূল চালিকাশক্তি।
এই ছবির গল্পের শিকড় গেঁথে আছে পঞ্চাশের দশকে—একটি প্রত্যন্ত গ্রাম, নাম বকুলপুর। শান্ত-নিস্তব্ধ সেই গ্রামে হঠাৎ করেই শুরু হয় একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা। প্রতি শনিবার যেন মৃত্যুর দিনক্ষণ বাঁধা—কেউ না কেউ খুন হয়, আর পাওয়া যায় রক্তশূন্য দেহ। আতঙ্ক ধীরে ধীরে গ্রাস করে গোটা গ্রামকে। এই অশুভ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের আশায় গ্রামের জমিদার চন্দ্র ডেকে পাঠান তাঁর পুরনো কলেজ সিনিয়র চিত্তকে।
চিত্ত একজন যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, বিপ্লবী। অজানা বা অলৌকিক কোনও কিছুকেই সে সহজে মানতে চায় না। কিন্তু সে একা আসে না—তার সঙ্গে আসে বন্ধু বসন্ত। বসন্তের শক্তি অন্য জায়গায়; তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় প্রবল, সে অতিপ্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, অতীত-ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, অনুভব করতে পারে অদৃশ্যের উপস্থিতি। যুক্তি আর অনুভূতির এই দুই বিপরীত স্রোত কী ভাবে একসঙ্গে বকুলপুরের অন্ধকার ভেদ করে এগোবে, আর কী ভাবে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে প্রতি শনিবারের রক্তমাখা রহস্য—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এগোবে ছবির কাহিনি।
চিত্তর চরিত্রে দেখা যাবে ঋত্বিক চক্রবর্তীকে, আর বসন্তের ভূমিকায় অনির্বাণ চক্রবর্তী। গ্রামের জমিদারের চরিত্রে অভিনয় করছেন গৌরব রায়চৌধুরী। তাঁর স্ত্রীরূপে রয়েছেন দেবলীনা কুমার, যিনি সুমিত্রা চরিত্রে গল্পের আবেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরবেন। জমিদারের বোন ভ্রমরের ভূমিকায় দেখা যাবে বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়কে। ছবিতে একটি বিশেষ, রহস্যময় চরিত্রে উপস্থিত থাকবেন মীর, যার উপস্থিতি গল্পের গতিপথে আলাদা মাত্রা যোগ করবে।
এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন অভিরূপ ঘোষ নিজে, সঙ্গে অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংলাপ লিখেছেন সৌমিত দেব। প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছেন পার্থসারথি মজুমদার, পল্লবী প্রসাদ এবং স্টারমার্ক সিনেমাজ এন্টারটেনমেন্ট। এই বুধবার থেকেই কলকাতায় শুরু হয়ে গেছে শুটিং। শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামবাংলার মাটি ও আলো ধরতে ইউনিট পাড়ি দেবে সিউড়ি ও বোলপুরে, যেখানে ধরা পড়বে বকুলপুরের ভৌতিক নিঃশ্বাস।
পরিচালক অভিরূপ ঘোষের (Abhirup Ghosh)কথায় ধরা পড়ে এই ছবির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগের টান। তিনি জানান, মনোজ সেনের লেখা ‘কালরাত্রি’ বাংলা হরর সাহিত্যে একেবারেই আলাদা জায়গা করে নেওয়া একটি গল্প—যাকে অনেকেই আইকনিক বলে মানেন। সেই কারণেই এই গল্প তাঁর এত প্রিয়। অভিরূপের মতে, ‘কালরাত্রি’ শুধুই ভয় দেখানোর গল্প নয়, এটি একেবারে গ্রামবাংলার মাটিতে গাঁথা একটি পিরিয়ড হরর। এমন গল্প শুনেই তিনি বড় হয়েছেন—পিসি, দিদিদের মুখে শোনা সেই রাতের গল্প, শুকতারার পাতায় পড়া গা-ছমছম করা কাহিনি আজও তাঁর স্মৃতিতে রয়ে গেছে। সেই ভয় এমন ছিল যে, ছোটবেলায় মাঝরাতে বাথরুমে যেতে গেলেও বুক ধড়ফড় করত।
এই স্মৃতির ভাণ্ডার থেকেই ছবির ভাবনা। অভিরূপ মনে করেন, বাংলায় এই ধরনের গ্রামকেন্দ্রিক, পিরিয়ড অতিপ্রাকৃতিক ছবি খুব কমই তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতাই তিনি পূরণ করতে চাইছেন। তাঁর কথায় স্পষ্ট, এই ছবি তাঁর আগের সব কাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা—সময়, আবহ এবং নির্মাণভঙ্গি সব দিক থেকেই। শুটিং সেটে পা রাখলেই যেন ফিরে যেতে হচ্ছে বহু বছর আগের এক সময়ে। দর্শকদের তিনি এমন এক যাত্রায় নিয়ে যেতে চান, যেখানে ভয় শুধু চোখে দেখা নয়, অনুভবের গভীরে পৌঁছবে—এক এমন অভিজ্ঞতা, যা তাঁরা আগে কখনও এই ভাবে পাননি।
অতীতের সময়কে আশ্রয় করে, মানুষের ভয় আর বিশ্বাসের সীমারেখা ছুঁয়ে, ‘মনোজ সেনের কালরাত্রি’ যেন শুধু একটি রহস্যকাহিনি নয়—এ এক অন্ধকারের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার প্রতিশ্রুতি। যেখানে যুক্তি আর অতিপ্রাকৃতের দ্বন্দ্বে ধীরে ধীরে খুলে যাবে মৃত্যুর রহস্য, আর দর্শক বুঝতে পারবেন—সব প্রশ্নের উত্তর আলোয় নয়, অনেক সময় লুকিয়ে থাকে কালরাত্রির কালো ছায়ায়।