বলিউডের ঝলমলে জগতে যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন রুপোলি পর্দায় বাস্তব হয়ে ওঠে, সেখানে একজন পরিচালক তাঁর সমস্ত কিছু হারিয়েছিলেন একটি ভেঙে পড়া স্বপ্নের কারণে। এ গল্প শুধু এক পরিচালকের নয়, এ গল্প তাঁর দুই সন্তানের — ফারাহ খান ও সাজিদ খানের, যাঁরা শৈশবে খিদে আর হতাশার সঙ্গে লড়াই করে একদিন নিজেরাই হয়ে উঠেছিলেন বলিউডের বড় নাম।

কামরান খান।
শেষ আপডেট: 10 July 2025 13:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলিউডের ঝলমলে জগতে যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন রুপোলি পর্দায় বাস্তব হয়ে ওঠে, সেখানে একজন পরিচালক তাঁর সমস্ত কিছু হারিয়েছিলেন একটি ভেঙে পড়া স্বপ্নের কারণে। এ গল্প শুধু এক পরিচালকের নয়, এ গল্প তাঁর দুই সন্তানের — ফারাহ খান ও সাজিদ খানের, যাঁরা শৈশবে খিদে আর হতাশার সঙ্গে লড়াই করে একদিন নিজেরাই হয়ে উঠেছিলেন বলিউডের বড় নাম।
১৯৬০-৭০এর সময়ে অভিনেতা ও স্টান্টম্যান কামরান খান 'বি-গ্রেড' অ্যাকশন ছবির পরিচালক হিসেবে বলিউডে পরিচিত ছিলেন। দারা সিং অভিনীত তাঁর পরিচালিত ‘বেকসুর’, ‘পাঁচ রতন’, ‘ওয়াতন সে দূর’ বিভিন্ন ছবি সে সময়ে দর্শকদের পছন্দও হয়েছিল। কিন্তু নিজের দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর কামরান সিদ্ধান্ত নেন, এবার বড় বাজেটের ‘এ-গ্রেড’ ছবি বানাবেন। সেই স্বপ্নের নায়ক হিসেবে তিনি চুক্তিবদ্ধ করেন অভিনেতা সঞ্জীব কুমারকে। বাড়ি বন্ধক রাখা থেকে শুরু করে সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছিলেন ছবিটিতে।
কিন্তু মাঝপথেই সব স্বপ্ন ভেঙে যায়। সঞ্জীব কুমার ছবিটি ছেড়ে চলে যান। কামরান খান পড়ে যান ভয়ংকর আর্থিক সংকটে। লক্ষ লাখ টাকা ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। দ্রুত মদে আসক্তি, এক দশকেরও বেশি সময় কাজ করতে পারেননি। পরিবার ভেঙে যায়, স্ত্রী ছেড়ে চলে যান, আর কামরান মারা যান একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। মৃত্যুকালে তাঁর পকেটে ছিল মাত্র ৩০ টাকা। এমনকি তাঁর শেষকৃত্যের খরচটাও এসেছিল বন্ধু সেলিম খানের (সলমন খানের বাবা) কাছ থেকে ধার নিয়ে।
তখন ফারাহ খান ছিলেন মাত্র ১৭ বছরের, আর ছোট ভাই সাজিদ বয়স ১৪। দু’জনের উপর ভেঙে পড়ে বাবার ৩ লক্ষ টাকার ঋণ শোধ করার দায়িত্ব। শুরু হয় এক করুণ সংগ্রামের অধ্যায়।

দারা সিংকে নিয়ে বি-গ্রেড সিনেমা বানাতেন কামরান খান কিন্তু তারপর তিনি সঞ্জীব কুমারকে নিয়ে একটি মূলধারার ছবি বানাতে রাজি হন।
ফারাহ সেই সময় নাচ শেখানো শুরু করেন, তৈরি করেন নিজস্ব ডান্স ট্রুপ। ছোট ভাই সাজিদ বার্থডে পার্টি, সমুদ্র সৈকত, রাস্তায় দাঁড়িয়ে মিমিক্রি করে আয় করতেন। সেই টাকাই চলত জীবন। কখনও তাঁরা ড্রয়িংরুম ভাড়া দিতেন কিট্টি পার্টির জন্য, কেউ এসে কয়েক ঘণ্টা তাস খেলত, আর চলে যেত— আর তার বিনিময়ে কিছু টাকা পাওয়া যেত।
ফারাহ বলেন, “আমার ছোটবেলায় যখন মা-বাবার মধ্যে লড়াই চলত, আলাদা হয়ে যেতেন, তখন একমাত্র শান্তি পেতাম সিনেমাহলে গিয়ে। মনমোহন দেশাই বা নাসির হুসেনের ছবি দেখতাম আর কিছু সময়ের জন্য ভুলে যেতাম নিজেদের দুর্দশার কথা।”
সাজিদের স্মৃতিতে এখনও ভেসে আসে সেই কঠিন সময়গুলো। “বাবা আমাকে একবার বলেছিলেন— ‘তোর ধর্ম কী জানিস? ওই সিনেমাহলটাই তোর ধর্ম। ওখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে হাসে-কাঁদে, সিনেমাই একমাত্র তোর ধর্ম।”
এমন দর্শনই শিখেছিলেন সাত বছর বয়সে। বাবার মৃত্যু দিনে, একটা ছবি দেখার টিকিট কিনে রাখা ছিল সাজিদের হাতে— ‘নয়া কদম’। টিকিট কাটা হয়েছিল শুক্রবারের শোয়ের জন্য, কিন্তু মঙ্গলবারই বাবা মারা যান। এই দোটানায় আজও তিনি ভোগেন— “আমি কি ভুল করছিলাম তখন সিনেমা দেখতে চাইতে?”
আজ ফারাহ খান বলিউডের নামজাদা পরিচালক। ‘ম্যায় হুঁ না‘, ‘ওম শান্তি ওম’ তাঁর পরিচালিত ব্লকবাস্টার ছবি। সাজিদ খানও সফল পরিচালক ছিলেন, যদিও #MeToo আন্দোলনের পর থেকে তিনি বড়পর্দা থেকে সরে গিয়েছেন।
কিন্তু তাঁদের উত্থানের পেছনে রয়েছে পরিবারের সংগ্রাম, নিঃস্বতার হাহাকার, আর এক সময়কার পরিচালক কামরান খানের স্বপ্নভঙ্গ। সিনেমা তাঁদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছিল একসময়, কিন্তু শেষমেশ সেই সিনেমাই তাঁদের জীবনকে আবার গড়ে দিয়েছিল। কারণ সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, কারও কারও জীবনে সেটাই হয়ে ওঠে একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র ধর্ম।