বিতর্কের সূত্রপাত ১ জুলাই। রাজকুমার রাও অভিনীত অ্যাকশন থ্রিলার ‘মালিকে’র ট্রেলার লঞ্চের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রসেনজিৎ। ছায়াছবিতে তিনিও সহ-অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 10 July 2025 11:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চলতি বিতর্ক বন্ধ করতে আত্মপক্ষ সমর্থন। বলা ভাল ‘খোলা চিঠি’। লিখলেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। কাঁদের উদ্দেশ্যে? এককথায় বললে, বাঙালিদের… আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, সেই সমস্ত বাঙালি, যাঁরা তাঁর ‘প্রশ্নটা বাংলায় করুন’ জবাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছেন, আঘাত পেয়েছেন, তাঁদের কাছে মেলে ধরলেন নিজের বক্তব্য।
বিতর্কের সূত্রপাত ১ জুলাই। রাজকুমার রাও অভিনীত অ্যাকশন থ্রিলার ‘মালিকে’র ট্রেলার লঞ্চের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রসেনজিৎ। ছায়াছবিতে তিনিও সহ-অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন। মুম্বইয়ের জুহু পিভিআরে বসেছিল আসর। যেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন অভিনেতা, অভিনেত্রী ও অন্যান্য কলাকুশলীরা। তখনই এক বাঙালি মহিলা সাংবাদিক অভিনেতা প্রসেনজিৎকে তাঁর প্রশ্নটি বাংলায় করেন। যা শুনে হাসিমুখেই জবাব ফিরিয়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘আপনি বাংলায় কেন আমাকে প্রশ্ন করছেন? এখানে তো বাংলায় বলার দরকার নেই!’ বলামাত্র হেসে ওঠেন প্রসেনজিৎ। পরে স্টেজে বসে থাকা রাজকুমার রাও সওয়াল শুনে তা হিন্দিতে তর্জমা করে সবাইকে বুঝিয়ে দেন। মাতৃভাষা না হয়েও বাংলা ভাষার প্রতি রাজকুমারের অনুরাগ দেখে উপস্থিত অতিথিরা হাততালি দিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান।
গোটা ক্লিপ এরপর সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় সমালোচনা। বয়ে যায় নিন্দার ঝড়। কেন্দ্রে অবশ্যই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। যিনি নিজেই নিজেকে (টলিউড) ‘ইন্ডাস্ট্রি’ বলে পরিচয় দেন, বাংলা ছায়াছবি আর বাঙালির ভালবাসা আজ যাঁকে স্বীকৃতি দিল, যার দৌলতে তিনি সর্বভারতীয় মঞ্চে পৌঁছতে পেরেছেন, সেই তিনিই কিনা বাংলায় প্রশ্ন শুনে এড়িয়ে গেলেন? উত্তর দিলেন না? বিকল্প হিসেবে হিন্দি বা ইংরেজি বেছে নিতে বললেন?
এতদিন এই ইস্যুতে চুপ থাকার পর অবশেষে মুখ খুলেছেন টলিউড অভিনেতা। খোলা চিঠি লিখেছেন। যার শুরু হয়েছে এভাবে, ‘নমস্কার, কিছুদিন হলো আমার একতা কথা, বলা ভালো একটা সেনটেন্স, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা নিয়েই কিছু বলতে চাই। আমি ৪২ বছর মূলত বাংলায় কাজ করেছি। গত কয়েক বছর জাতীয় স্তরে কয়েকটা কাজ করার সুযোগ এসেছে, সেরকমই একটা হিন্দী সিনেমার ট্রেলার মুক্তি উপলক্ষ্যে, ১লা জুলাই বম্বের জুহু পিভি আর-এ সাংবাদিক সম্মেলন হচ্ছিল। ডায়াসে যারা ছিলেন ছবির পরিচালক, শিল্পী ও অন্যান্যরা, সবাই প্রথম থেকেই মূলত ইংরেজিতেই কথা বলছিলেন।’ (বানান অপরিবর্তিত)
এরপর কী হয়? প্রসেনজিতের বক্তব্য, একজন সাংবাদিক, যিনি তাঁর ‘অত্যন্ত স্নেহের পাত্রী’, তিনি বাংলায় প্রশ্ন করেন। কিন্তু তার যেহেতু তার উত্তর বাংলায় দিলে ‘অনেকে সঠিক মানে বুঝতে পারবেন না’, যেহেতু ‘ওখানে বাংলা ভাষা বোঝেন না এমন মানুষের সংখ্যাই অনেকটা বেশি’ তাই প্রসেনজিত ‘খানিক বাধ্য হয়েই’ জবাব দেন ‘বাংলা ভাষায় কেন প্রশ্ন করছেন?’
এই একটি বাক্য, থুড়ি ‘সেনটেন্স’ নিয়ে এমন কাটাছেঁড়া শুরু হবে, বইবে বিতর্কের ঝড়, তা আন্দাজ করতে পারেননি অভিনেতা। অন্তত, চিঠিতে সেই বক্তব্যই ফুটে উঠেছে। সমাজমাধ্যমের ঘাড়ে কিছুটা হলেও দোষ চাপিয়ে বলেছেন, যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই একটি মাত্র বাক্য… থুড়ি ‘সেনটেন্স’ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই ‘অনেকে ওই কথার আক্ষরিক অর্থের সূত্রে আঘাত পেয়েছেন।’
এই আঘাতে সমব্যথী প্রসেনজিৎও। সহমর্মিতার সুরে লিখেছেন, ‘কষ্ট আমিও পেয়েছি, এখনও পাচ্ছি।’ কিন্তু এর জন্য তিনি কি নিজে দোষী? অভিনেতার অনুমান ভুল বোঝাবুঝি থেকেই সমস্যার শুরুয়াত। তাঁর কথায়, ‘হয়তো কয়েকটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে আমার বলা-কথার উদ্দেশ্যটা বোঝাতে পারিনি। আর আমার ধারণা সেখান থেকেই ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।’
যদিও যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের কাছে চিঠির শেষে ক্ষমাও চেয়েছেন প্রসেনজিৎ। লিখেছেন, ‘নিজের মাতৃভাষাকে অপমান করার কথা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না। বাংলা আমার প্রাণের ভাষা, ভালোবাসার ভাষা। তবে চিরকাল আমার কাছে বাংলার মানুষের বিচার শিরোধার্য।’ শেষে ফের জুড়ে দেন, ‘… আমি এইটুকু বুঝেছি আমার বলা কথায় আপনাদের যথেষ্ট আঘাত লেগেছে, তাই আমি দুঃখিত।’ চিঠির শেষে স্বাক্ষর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় লেখা থাকলেও তার তলায় ‘বুম্বাদা’।
এই কৈফিয়ত-ই কি যথেষ্ট? আহত বাঙালি ইন্ডাস্ট্রিপ্রতিম প্রসেনজিতের জবানবন্দিকে কতটা মেনে নেয়, বুম্বাদার আত্মপক্ষ সমর্থনে ডাল কতটা গলে, তার খোঁজ মিলবে সোশ্যাল মিডিয়ায়। একটা ‘সেনটেন্স’ থেকে ভুল বোঝাবুঝির জন্ম--এটা বোঝাতে অভিনেতা অনেক ‘সেনটেন্স’ খরচ করলেন। তা কতটা কাজে দেয়, এখন সেটাই দেখার!