এহেন টুকরো-টুকরো অঙ্গহানিতেই মূর্তিনাশ। চালচিত্র মোটামুটি টেকসই হলেও কাঠামো ধসে পড়ে। যা না নির্মাতার কাছে অভিপ্রেত, না দর্শকদের কাছে কাম্য! ‘হেমা মালিনী', দিনের শেষে, ঠিকঠাক চিত্রনাট্যের বিপর্যস্ত রূপায়ণ৷

ফিল্ম পোস্টার
শেষ আপডেট: 5 November 2025 14:03
‘আমি যখন হেমা মালিনী’। এই নামেই ফিল্ম বানিয়েছেন পরিচালক পারমিতা মুন্সী। বলিউডের ড্রিম গার্ল হেমা মালিনীর বায়োপিক নয়। পারমিতা তাঁর গ্ল্যামারটুকু সামনে রেখে দেখাতে চেয়েছেন আধুনিক প্রেম। সেই সঙ্গে সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে: কাহিনি, চিত্রনাট্য এক জিনিস। সেটা খাতায়-কলমের। তাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সম্পূর্ণ অন্য ধাঁচের কাজ। দুটো শিল্পমাধ্যম পুরোপুরি আলাদা। কবিতার ইমেজারি যতই গূঢ় হোক না কেন, একজন কবি যদি ক্যামেরা হাতে সেই বিমূর্ত চিত্রকল্পকে মূর্ত করতে চান, সফল নাও হতে পারেন। তখন আমরা নিশ্চয় বলব, তিনি লেখক হিসেবে দশে দশ। কিন্তু চিত্রনির্মাণে অসফল৷ এতে লুকোছাপা নেই৷ তাঁর কবিসত্তা এতটুকু মলিন হয় না। স্রেফ ছায়াছবি পরিচালনায় ব্যর্থতাটা সামনে আসে মাত্র।
কথাগুলো বললাম, কারণ, লেখক ও পরিচালকের সাধ আর সাধ্যের একটা ব্যবধান, কারও চোখে অদূর, কারও নজরে সুদূর, ‘হেমা মালিনী'-তে প্রকট।
তবু মোদ্দা থিমের প্রশংসা জানাতে হয়৷ এক ট্যারো কার্ড রিডার (রোশনী দত্ত) আর চলচ্চিত্র পরিচালকের (রাহুল অরুণোদয় দত্ত) কথোপকথন, বেশ দীর্ঘ, তাই দিয়ে ছবি শুরু৷ সমান্তরালভাবে বয়ে চলে দ্বিতীয় গল্প। যার কেন্দ্রে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ধর্মেন্দ্র (চিরঞ্জিৎ) এবং ‘হেমা’-র সিনড্রোমে আক্রান্ত ‘মালিনী’। মধ্যবয়সী। সমাজের চোখে ঠিক সুরূপা, পটিয়সী নন। তবু লাইফস্টাইল থেকে জীবনের স্বপ্ন—সবেতেই ড্রিম গার্লের অবসেসড ছায়ানুসরণ। বেশভূষা থেকে চলনবলন—সর্বত্র বলিউড অভিনেত্রীর আদবকায়দার সুতীব্র অনুকরণ। এক অন্য স্বপ্নে বুঁদ হেমা। যে খুঁজে চলে ধর্মেন্দ্রকে।
এই সূত্রেই চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ। তারপর আলাদা আলাদা গল্পে জুড়ে যায় একের পর এক চরিত্র। এফএম রেডিও চ্যানেলের মালিক (ভাস্বর) থেকে শুরু করে ডাক্তারখানার মহিলা কম্পাউন্ডার (কাঞ্চনা মৈত্র), মর্নিং ওয়াকে আলাপচারী তরুণী থেকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে স্ট্রাগল করতে প্রস্তুত যুবতী—একাধিক সাবপ্লট দুই গল্পে মিশ খায়। ঠিক এভাবেই কাহিনি বুনতে চেয়েছেন পারমিতা৷
লক্ষ্য একটা টানটান কৌতূহল ধরে রাখা। সেই আত্মসংশয়ী ফিল্ম পরিচালক কি ছবি বানাতে পারলেন? তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংকট আদৌ দূর হল? চিকিৎসক ধর্মেন্দ্র সত্যি একাকী? নাকি হেমা, যে কিনা তাঁর সঙ্গে সংসার করার স্বপ্ন দেখছিল, তাকে শেষমেশ রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়? আর সেই এফএম চ্যানেলের মালিকেরই বা কী হল? সত্যি কি তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় রিচ আর পকেটভরাটের স্বার্থে ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধকে পিষে দিতে চান? এতটাই একপেশে মলিন তাঁর চরিত্র? নাকি রয়েছে তারিফযোগ্য কোনও অদেখা স্তর? এই সমস্ত সওয়াল পর্বে-পর্বান্তরে পর্দায় ধরা পড়েছে।
কিন্তু সমস্যা যতটা না চিত্রনাট্যের, তার চেয়ে অনেক বেশি রূপায়ণের। একটাও ফ্রেম স্মরণযোগ্য নয়। ক্যামেরার কাজ পীড়াদায়ক, শিক্ষানবিশসুলভ৷ এডিটিং, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গ্রাম্য। এমনিতে কাস্টিং খারাপ নয়৷ কিন্তু অভিনয়ে সেই জেদ, সেই দীপ্তিটাই উধাও! অদ্ভুত গা-ছাড়া-ভাব। সেটা পরিচালকের অক্ষমতা না অভিনেতাদের অনাগ্রহ—বোঝা দুষ্কর৷ দর্শকের মনে করাটা স্বাভাবিক: যেন একদল ফুটবলার মাঠে নেমেছে ঠিকই, কিন্তু কেউই জানে না, কাকে কোন পজিশনে খেলতে হবে, কোন ফর্মেশনে কোচ ঘুঁটি সাজিয়েছেন! একেকটা সিকোয়েন্স সিরিয়ালসুলভ… একটানা, বিরামহীন। যেন ‘কাট’ বলে কোনও বস্তু নেই৷ সংলাপও, কখনও কখনও হাস্যকর! বিরক্তির সঞ্চার করে।
ধরা যাক, চিকিৎসক ধর্মেন্দ্র। যিনি ফি-রোজ পার্কে এসে পায়রাদের গম খাওয়ান। কিছুদিন বাদেই তাঁর হার্ট অপারেশন৷ বাঁচামরা নিয়ে রীতিমতো টেনশনে। সেই সময় মর্নিং ওয়াকে আসা এক পরিচিত যুবতীকে তিনি সবকিছুই আকারে-ইঙ্গিতে অল্পবিস্তর জানালেন। বেশ ক্লিষ্ট কণ্ঠেই বললেন, ‘আমি গেলে তুমি পারবে না পায়রাদের গম দিতে?’
এই পরিস্থিতিতে, যখন দর্শকদের হৃদয়ে করুণ রস বেশ সান্দ্র, সমস্ত বিভাব-অনুভাব আসব আসব করছে, ঠিক তক্ষুনি, ওই বিশেষ মুহূর্তে তরুণীর জিজ্ঞাসু মুখে প্রত্যুত্তর: ‘কিন্তু আমি গম কোথায় পাব?’ এক শব্দে বলতে গেলে ‘ব্যাভিচার’! সহজ বাংলায় ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’! এটা ওই পরিস্থিতিতে উপযুক্ত জবাব হতে পারে? এমনতরো খেলো সংলাপ করুণ রসকে হাস্যরসে বদলে দেয়। যা যে কোনও ছবির রসভঙ্গের সামিল।
এহেন টুকরো-টুকরো অঙ্গহানিতেই মূর্তিনাশ। চালচিত্র মোটামুটি টেকসই হলেও কাঠামো ধসে পড়ে। যা না নির্মাতার কাছে অভিপ্রেত, না দর্শকদের কাছে কাম্য! ‘হেমা মালিনী', দিনের শেষে, ঠিকঠাক চিত্রনাট্যের বিপর্যস্ত রূপায়ণ৷ কবীর সুমনের খেয়াল কিংবা রূপম ইসলামের রবীন্দ্র সঙ্গীতও তাকে ঘাড় ধরে দাঁড় করাতে পারেনি।