‘স্বার্থপর’ দর্শকদের মনে তর্কের জন্ম দেয়। রাখে একটাই প্রশ্ন: কুলুঙ্গির ‘অধিকার’ আর তা সারাইয়ের ‘দায়িত্বে’র মধ্যে জমে থাকে যৌথ স্মৃতির ধুলো! তার স্বত্ব নিয়ে বাঁটোয়ারা চলে কি?

স্বার্থপর: ফিল্ম পোস্টার
শেষ আপডেট: 22 October 2025 16:26
ঘর ছেড়ে আসা যায়। কিন্তু স্মৃতি?
কুলুঙ্গিতে রাখা টিনের কৌটো, রাংতামোড়া বাক্সগুলো না হয় পড়ে থাকল। কিন্তু ফাঁকেফাঁকে জমে থাকা ধুলো?
আলনা গুছিয়ে রাখার দিন ফুরতে পারে। কিন্তু আঁচলের দাগ? শাড়ির ঘ্রাণ?
রান্নাঘরের বঁটি-কড়াই, হাতাখুন্তি ধুয়েমুছে রাখার দায় নেই। কিন্তু তার ঝঙ্কার কি স্নায়ুর গহন তন্ত্রীতে ঢেউ তোলে না?
এই সমস্ত প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন পরিচালক অন্নপূর্ণা বসু। ছবির নাম ‘স্বার্থপর’। পুরু ফ্রেমে দেখতে গেলে নারীর পৈতৃক সম্পত্তিতে সমানাধিকার চাওয়ার গল্প৷ কিন্তু অতল গভীরে এক একলা মেয়ের অস্তিত্ব খুঁজে চলার কাহিনি। বিয়ের পর বাপের বাড়ি ছেড়ে এলে কি আর কোনও কিছুই নিজের থাকে না? স্বামীর কাছেও তিনি কতটা গৃহীত? কতখানি অনুগৃহীত? স্বাধীন উপার্জনের, মাথা উঁচু করে বাঁচার যুদ্ধে কি তাঁকে পাশে পান আদৌ? ‘নিজে’ কে? ‘নিজের’ বলতে কতটুকু? প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলে না। কিন্তু উত্তর চাইতে গেলেই যুক্তি ভুলে নীতির দোহাই তুলে এঁটে দেওয়া হয় ‘স্বার্থপরে’র তকমা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্রমশ জটিল হতে থাকা গিঁট আলগা করতে চেয়েছেন অন্নপূর্ণা। খুঁজেছেন ‘স্বার্থপরে’র আসল ব্যাখ্যা।
সমস্যা চোখে-দেখা। তাই গল্পটাও পরিচিত। অপর্ণা (কোয়েল মল্লিক) বাড়ির বউ। ঘুম থেকে উঠেই বরের টিফিন গোছগাছ। মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর তোড়জোড়। বাজার করা। হেঁশেল ঠেলা। এই নিয়েই দিন বয়ে যায়। নিজের পায়ের তলায় জমি খুঁজতে ব্যবসায় নামতে চায় সে। কোম্পানি ‘কপারওয়্যার’। কাজ শুরুর আগে দরকার অন্তত ৫০ হাজার টাকা। স্বামী দেবর্ষি (ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী) কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী। তার কাছে এতখানি টাকা বউ বিজনেস করবে বলে এক লপ্তে দিয়ে দেওয়াটা বাতুলতা ও অহেতুক মনে হয়। সরাসরি ‘না’ বলে না। খেলায়। অপর্ণাও লাটিমের মতো বনবন করে ঘোরে।
এমন সময় সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণে, খানিক ইমার্জেন্সিতেই, সে টাকা তুলতে বাধ্য হয়। দেবর্ষিকে জানাতে গিয়েও তাড়ার চোটে গুছিয়ে বলে ওঠা হয় না। এই নিয়ে শুরু তর্ক, ঝামেলা। অফিস আর রান্নাঘরের তফাত বোঝাতে বসে দেবর্ষি। উঁচু গলায়। উদ্ধত মেজাজে। অপর্ণা নম্র। নীচু সুরেই জানায়, অফিসের বাবুরা যে টিফিনটি খান, সেটা ওই রান্নাঘরেই রাঁধা! দেবর্ষি কারণ জিজ্ঞাসার আগেই ভেবে নেয়, নিশ্চয় ব্যবসা শুরুর চক্করে অতখানি টাকা বিনা বাক্যব্যয়ে তুলে নিয়েছে অপর্ণা। স্ত্রীকে কথা বলতে দেওয়ার ফুরসতটুকু দেয় না।
ঠিক এই সময় অপর্ণা বাপের বাড়ি গঙ্গানগরে যায়। গিয়ে জানতে পারে, ‘দাভাই’ সৌরভ (কৌশিক সেন) তার ছোটবেলার খেলাঘর লিজ দিয়ে রিভারসাইড গেস্ট হাউস বানাবে। এক সংস্থার সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় পাকা। অপর্ণার মত-অমতের প্রশ্নটুকু মাথায় আসেনি৷ কারণ, সৌরভ ধরেই নেয়, বাপের সম্পত্তিতে তার বোনের কোনও অধিকার নেই। অতএব হ্যাঁ কিংবা না-এর সওয়াল আসে না!
অপর্ণা বিমূঢ়। হতবাক। দাদা তার হাতে কাগজ ধরায়। সই করতে বলে। কলের পুতুলের মতোই সে দস্তখত করে ফেলে। আর এরপরই ঘনিয়ে ওঠে আসল সংকট! অপর্ণা অঙ্ক মেলাতে পারে না। খুঁজতে থাকে নিজেকে। সত্যিই কি সে পাওনা হকটুকু চেয়ে ভুল করেছে? যে ঘরে গেলে প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব আজও খুঁজে পায়, তাতে তার ‘অধিকার’ নেই—একথা সে বলবে কেমন করে?
ঠিক এমন পরিস্থিতিতে দুই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অবতারণা। জল যে অনেক দূর গড়াতে চলেছে, তা প্রথমে বুঝিয়ে দেন সরখেলবাবু (অনির্বাণবাবু)। ধুরন্ধর উকিল। যে কোনও মূল্যে কেস জিততে বদ্ধপরিকর। নীতির জায়গা নেই। অন্যদিকে কাউন্টারপার্টে গোবিন্দ লাহা (রঞ্জিত মল্লিক)। যাঁর কাছে নৈতিকতাই সব৷ অপর্ণা খানিক কাকতালীয়ভাবেই গোবিন্দবাবুর দ্বারস্থ হয়। অন্যদিকে দাদার হাত ধরে সরখেল। যুদ্ধের ফলাফল কী? কে হারল? জিতল কে? উত্তর মিলবে ক্লাইম্যাক্সে।
কিন্তু ‘স্বার্থপর’ তো দিনের শেষে থ্রিলার নয়। সোশ্যাল ড্রামা। ফলে জেতা-হারা রোমাঞ্চ নয়, এই ছবি যে প্রশ্নগুলো তোলে, সেটাই মুখ্য। শীর্ষ আদালত যতই বলুক, কন্যা মানে সারা জীবনের কন্যা—তা কি আদৌ মেয়েদের দাবি আদায়ে এতটুকু ছাপ ফেলেছে? সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, ‘অবিভক্ত যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে মেয়েদের সারা জীবন সমান অধিকার রয়েছে।’কিন্তু সেই ‘অধিকার’ চাইতে গেলেই কি শুনতে হয় না ‘দায়িত্বপালনে’-র বুলি? স্বামীগৃহে যাওয়ার আগে ও পরে বাপ-মায়ের দায় কতটুকু তুমি নিয়েছ? কতখানি তোমার দাদা-ভাইয়েরা পালন করেছে? বাবার অসুস্থতায় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হল। তার হিসেব চুকিয়েছ কখনও? সেখানে ভাগাভাগি হয়েছে? ঝক্কি পোহানো? তার বাঁটোয়ারা? ঘরের সিলিং মেরামত থেকে পাইপ সারাইয়ের বিড়ম্বনা? আধাআধি মাপজোখ হয়েছে কখনও? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে সম্পত্তির বখরাটুকু বুঝে নেওয়ার মানে কি? ‘অধিকার’ আর ‘দায়িত্ব’ যে হাত ধরাধরি করে চলে! এমন প্রশ্ন আর বিস্ময়ের মোকাবিলা অপর্ণাদের সেই কবে থেকে করে যেতে হয়েছে, আজও করে যেতে হচ্ছে!
খাতায়-কলমে ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের সমানাধিকার দেওয়া হয়নি। প্রায় ৫০ বছর পরে, ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সেই আইন সংশোধন করে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সমানাধিকারের কথা বলা হয়। ছবির দ্বিতীয়ার্ধ মূলত কোর্টরুম ড্রামা। সেখানে উঠেছে এই নিয়ে বেশ কিছু কূট তর্ক। ‘অধিকার’, ‘দায়িত্ব’, ‘উপহার’, ‘আদায়’, ‘স্বার্থ’—এমনই কি প্রজন্মবাহিত সংস্কার আর বিশ্বাসকে খোলা চোখে দেখা!
সবচেয়ে ভাল দিক, পরিচালক নিজে কোনও পক্ষ নেননি। খোলা পাতার মতো পুরো প্রতর্ক সামনে মেলে ধরেছেন। সরখেল বনাম লাহার উক্তি-প্রত্যুক্তিতে যুক্তি বনাম আবেগ। কিন্তু তাতে পরিচালকের আসক্তি, পক্ষপাত বা এজেন্ডার বাড়তি বাটখারা নেই। ফলে দর্শক নিজেদের মতো করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। খোলা মনে।
আলাদা করে বলতে হয় অভিনয়ের কথা। কাস্টিং খাপে-খাপ। অহেতুক পরীক্ষানিরীক্ষার ঝুঁকি নেননি পরিচালক। কোয়েল তাঁর পরিচিত মেজাজে। অনুচ্চকিত স্বরে কথা বলা কোণঠাসা অন্ত:পুরচারিণী বনাম এজলাসে ছুটে বেড়ানো একলা মেয়ে— বাইনারিটা প্রায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘প্রায়’ বলছি, তার কারণ, মাঝেসাঝেই অতিরিক্ত নরম, সহ্যাতীত পেলব হতে গিয়ে তাল কেটেছে। যেমন, ‘আমি কিছু শুনতে চাই না’ বলা স্বামীকে ৫০ হাজার টাকা কেন ব্যাঙ্ক থেকে তুলেছেন, তার আসল কারণ জানাতে কয়েক দিন লেগে গেল—এটা খানিক অবিশ্বাস্য!
কৌশিক সেন দাদা সৌরভ বসুর ভূমিকায় স্বভাবসুলভ মেজাজে। ঠিক-ভুল, সাদা-কালো, নায়ক-ভিলেনের মাঝামাঝি সূক্ষ্ম স্তর ছুঁতে, দর্শকদের দোটানায় ঠেলতে যে তারে অভিনয় বাঁধতে হয়, এতদিনের মঞ্চ-অভিজ্ঞতায় কৌশিকের তা বিলক্ষণ রপ্ত। ‘স্বার্থপরে’ও সেই সাবলীলতায় ধরা দেন। রঞ্জিত মল্লিক নীতিনিষ্ঠ, অতীতের জৌলুস হারানো উকিল হিসেবে স্বমেজাজে স্বচ্ছন্দ। বিচারকের কুর্সিতে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী আদালতের গ্রাম্ভারি ঠাট বজায় রেখেছেন। শুধু গোবিন্দ লাহাকে ‘আপনি ইন্টারাপ্ট করবেন না, আপনারও টার্ন আসবে’ বলার পরেও তাঁকে বলতে না দিয়ে পরদিন রায় ঘোষণার নিদান দিলেন কেন—ঠিক বোধগম্য হল না!
এমন কিছু ছোটখাটো বিচ্যুতি বাদ দিলে ‘স্বার্থপর’ তার লক্ষ্যভেদে সফল। ক্যামেরার কাজ চরিত্রের অস্বস্তি, দোটানাকে মূর্ত করেছে। সম্পাদনা গোছানো। জিৎ গাঙ্গুলি সংগীত পরিচালনায়। সাকুল্যে তিনটে (একই সুরে দুটো ধরলে) গান। যা বাড়তি ক্লেদ নয়, ছবিতে জুড়ে দেয় আলাদা স্তর। আলাদা করে বলতে হয় আবহসংগীতের কথা। যা টেনশন ও আবেগকে জীবন্ত করে তুলেছে।
বড় স্কেলে খেলতে চাননি অন্নপূর্ণা। ছবির অধিকাংশ জুড়ে ইন্ডোর শ্যুট। সামাজিক সমস্যা, লিঙ্গবৈষম্যের শুরুয়াত তো ঘর থেকেই। ঘরোয়া অস্বস্তি আর বাইরের রাজনীতিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন পরিচালক। ‘স্বার্থপর’ অভিধানের পাতা ছাড়িয়ে দর্শকদের মনে তর্কের জন্ম দেয়। রাখে একটাই প্রশ্ন: কুলুঙ্গির ‘অধিকার’, তা সারাইয়ের ‘দায়িত্বে’র মধ্যে জমে থাকে যৌথ স্মৃতির ধুলো! তার স্বত্ব নিয়ে বাঁটোয়ারা চলে কি?