গ্রামোফোন কোম্পানিকে গুলজার (Gulzar) বলেছিলেন, অবসর যাপনের জন্যই যখন গান শোনা, তখন এই গান দিয়েই অ্যালবামের নাম রাখা হোক (dil dhundta hai phir wahi fursat ke raat din)।

গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 29 November 2025 14:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নয়ের দশকের (90's) একেবারে গোড়ার কথা। পুরনো হিন্দি গানের সংকলন (evergreen hindi songs) নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানি তখন বাজারে নতুন একটা ক্যাসেট ছেড়েছে। ততদিনে হিন্দি গানের পরিসরে ঢুকে পড়েছেন কুমার শানু। গানের ঘরানা বদলে বদলে যাচ্ছে গুলশন কুমারের (Gulshan Kumar) অনুপ্রেরণায়। চায়ের দোকান থেকে বাড়ির স্টিরিও সর্বত্র ছেয়ে রয়েছে টি-সিরিজের সেই ক্যাসেট। কুমার শানুর (Kumar Sanu) আবেগ ঢেলে দেওয়া গান—'তেরি আশিকি ভি ইয়ে রঙ্গ লাই…ওয়াফা ম্যানে কি, তু নে কি বেওয়াফাই’। প্রেম দাগা খাওয়া যৌবন সে গানে ডুবে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আহা এ তো আমারই গান। আমার জন্যই লেখা।
অথচ তারই সমান্তরাল ভাবে ক্যাসেটের দোকানে হুড়মুড়িয়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে গ্রামোফোন কোম্পানির পুরনো হিন্দি গানের সেই সংকলন—‘ফুরসত কে রাতদিন’ (Fursat Ke Raat Din)। আলাদা করে লতা মঙ্গেশকর বা ভূপিন্দর সিংয়ের জন্য নয়। সেই কবির জন্য ওই অ্যালবামের সবগানই যাঁর লেখা— গুলজার (Gulzar)।
অ্যালবামের ১০টি গানের মধ্যে অনন্য ছিল ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া মওসম ছবির টাইটেল ট্র্যাক ‘দিল ঢুঁন্ডতা হ্যায় ফির ওহি ফুরসত কে রাত দিন’ (dil dhundta hai phir wahi fursat ke raat din)। গ্রামোফোন কোম্পানিকে গুলজার বলেছিলেন, অবসর যাপনের জন্যই যখন গান শোনা, তখন এই গান দিয়েই অ্যালবামের নাম রাখা হোক।
গুলজারের সেই অনবদ্য, চিরনতুন, চিরসবুজ গানেরই এবার পঞ্চাশ বছর। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫, অবসরমাখা দিন খুঁজে ফেরার এমন গান আর দ্বিতীয় হয়নি হিন্দি সিনেমায়। গুলজার যে অনুভূতির দরজা খুলে দিয়েছিলেন, তা শুধু আলস্যের কথা নয়; এর মধ্যে আছে সময়, স্মৃতি, ভালোবাসা আর হারিয়ে-ফেলা এক পৃথিবীর পূর্ণদৈর্ঘ্য দর্শন। মদন মোহনের মায়াবী সুরে, ভূপিন্দর সিং ও লতা মঙ্গেশকরের নরম-স্বচ্ছ গলায়—হিন্দি চলচ্চিত্রে নস্টালজিয়ার অন্যতম সেরা উদাহরণ হয়ে রয়ে গেছে সেই গান।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গান ও গুলজারের পুরো রচনাশৈলী নিয়ে বহু একাডেমিক বিশ্লেষণ হয়েছে। গবেষকরা তাঁর কবিতা, গানের কথা ও গদ্যের ভিতর থেকে ‘সময়’, ‘স্মৃতি’, ‘রোজকার জীবনের রূপক’ ও ‘আবেগের গঠন’—এসবই আলাদা করে দেখিয়েছেন। এমনকি ‘দিল ঢুঁন্ডতা হ্যায়’ গানটি নিয়ে একটি পূর্ণ গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছে। এক আন্তর্জাতিক জার্নালে গুলজারের কবিতাকে বর্ণনা করা হয়েছে এই বলে—“তিনি অনুভূতিকে চিন্তায়, আর চিন্তাকে গানে রূপান্তর করেছেন। এ গানে আবেগ যেমন আছে, তেমনই আছে এক ধরনের দার্শনিক ভাবনা—হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরে পাওয়ার অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা”।
আর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গুলজারের সৃষ্টিতে ‘সময়’ কেবল প্রেক্ষাপট নয়—এটি নিজেই একটি চরিত্র। কখনও তা কোমল স্মৃতির আলো ছড়ায়, কখনও আবার কষ্টের অতীতকে সামনে এনে দাঁড় করায়। গুলজারের কবিতায় সময় একেবারেই সরলরৈখিক নয়; মনে হয় যেন বৃত্তাকারে ঘুরে ফিরে আসে—যা ছিল, তা-ই আবার অন্যরূপে ধরা দেয়। এই গানটিও ঠিক সে রকম—বর্তমানের কথা প্রায় নেই, কিন্তু অতীত এত জীবন্ত যে যেন হাতে ছোঁয়া যায়।
ফুরসত—এক হারানো সময়ের দেশ
এই গানটির প্রাণশব্দ ‘ফুরসত’। অর্থাৎ অবসর। একটু থমকে থাকা সময়। কোনও তাড়া নেই, কোনও শিডিউল নেই—শুধু থাকা। গানের স্তবকে গুলজার যে ছবিগুলো আঁকেন, সেগুলো কতটাই না ছোট, কতটাই না সাধারণ—শীতের রোদে উঠোনে শুয়ে থাকা, প্রিয়জনের ওড়না টেনে মুখ ঢেকে দেওয়া, বিকেলের নরম সময়টুকু নষ্ট করে ফেলা, কিছু না করে শুধু ভাবতে থাকা..
এগুলো নিয়েই তাঁর কবিতা। খুব সাধারণ শব্দেই অসাধারণ দৃশ্য নির্মাণ করেছেন তিনি। উঠোন, রোদ, রাত- দিন—অতিশয় সরল শব্দ। কিন্তু এগুলো মিলে তৈরি হয়ে গেছে এক হারিয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত জীবনের ছবি—যেখানে সময় ঘড়িতে নয়, রোদ-বৃষ্টি-শীত দিয়ে মাপা যায়।
অনেক সমালোচক বলেছেন—এ গানে মির্জা গালিবের মৃদু প্রতিধ্বনি রয়েছে। গালিবের এক শেরের ভাব যেন এখানে নতুন করে জন্ম নিয়েছে। গুলজার সেই শেরকে কপি করেননি; বরং তার সুর, তার নস্টালজিয়াকে তিনি সুনিপুণভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে টেনে এনেছেন।
এই গানকে নিয়ে আলোচনায় সুর ও গায়কির কথা উল্লেখ না করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মদন মোহনের সুর যেন ইচ্ছে করেই সময়কে ধীর করে দেয়—দীর্ঘ টানা নোট, অল্পসল্প বাদ্যযন্ত্র, আর এক ধরনের অস্থিরতাহীন গতি। গানটিতে শব্দ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যবর্তী নীরবতাও ঠিক ততটাই যেন অর্থবহ।
ভূপিন্দর সিংয়ের গাওয়া সংস্করণে এই অনুভূতি আরও বেশি তীব্র। তাঁর নিম্নস্বরে গায়কি যেন গভীর রাতে নিজের মনেই কথা বলা—নরম, আত্মমগ্ন, নিঃশব্দ এক স্বীকারোক্তি।
গুলজারের কবিতা নিয়ে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তাঁর লাইনে প্রায়ই থাকে তিনটি বিন্দু, অসমাপ্ত বাক্য আর ইচ্ছাকৃত বিরতি, যা শব্দের ফাঁকে ফাঁকে নীরবতার জগতে প্রবেশ করতে পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়।
‘দিল ঢুঁন্ডতা হ্যায়…’ (Dil dhoondta hai) ঠিক এই নীরবতাকে শ্রুতিমধুর করে তোলে। হৃদয় যে ‘ফুরসত’-এর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসে থাকে, তা এখানে শুধু কথায় বর্ণিত নয়—সুরের ধীরতা, বিরতির দীর্ঘশ্বাস, আর গানের ফাঁকা জায়গাগুলোর মধ্য দিয়ে সেই অবসর মূর্ত হয়ে উঠেছে।