আবারও আলো ঝলমলে কলকাতা। নভেম্বরের হাওয়ায় ভেসে আসছে সিনেমার গন্ধ। টলিপাড়ার আকাশে ফিরে আসছে সেই সিনে ম্যাজিক—৩১তম আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)।

শেষ আপডেট: 28 October 2025 15:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আবারও আলো ঝলমলে কলকাতা। নভেম্বরের হাওয়ায় ভেসে আসছে সিনেমার গন্ধ। টলিপাড়ার আকাশে ফিরে আসছে সেই সিনে ম্যাজিক—৩১তম আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই সিনেমার মহোৎসব। শহর যেন এক সপ্তাহের জন্য পরিণত হবে সেলুলয়েডের রাজধানীতে, যেখানে গল্প মিলবে গানে, আলো মিশবে আবেগে।
সাংবাদিক সম্মেলনের মঞ্চে এ দিন হাজির ছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। পাশে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল সেন, হরনাথ চক্রবর্তী, শান্তনু বসু, কোয়েল মল্লিক, জুন মালিয়া—সবাই যেন একসঙ্গে সিনেমার ভাষায় উচ্চারণ করলেন একটাই কথা, “এ উৎসব আমাদের গর্ব।” অরূপ জানালেন, এবারের উৎসবের উদ্বোধন করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর প্রতি বছরের মতো এই বারও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করবেন ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর নৃত্যের ছন্দে শুরু হবে সিনেমার রঙিন সপ্তাহ।
উৎসবের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বাংলা সিনেমার এক চিরন্তন মাইলফলক—অজয় কর পরিচালিত, উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘সপ্তপদী’ (১৯৬১)। সেই কালজয়ী প্রেমের গল্প দিয়ে শুরু হবে চলতি বছরের চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা। মনে হবে, সময় যেন এক নিমেষে ফিরে গেছে অতীতের সাদা-কালো দিনগুলিতে, যেখানে প্রেম মানে ছিল শুদ্ধতা, ত্যাগ আর সংবেদন।
এই বছরের KIFF-এ দেখানো হবে মোট ২১৫টি চলচ্চিত্র, যার মধ্যে রয়েছে ১৮৫টি পূর্ণদৈর্ঘ্যের এবং ৩০টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি। অংশগ্রহণ করছে ৩৯টি দেশ, ১৮টি ভারতীয় ভাষা ও ৩০টি বিদেশি ভাষায় নির্মিত ছবি নিয়ে। ২১টি প্রেক্ষাগৃহে চলবে এই চলচ্চিত্র-উৎসবের আসর।
ফোকাস কান্ট্রি হিসেবে এ বছর নির্বাচিত হয়েছে পোল্যান্ড—দেখানো হবে ১৯টি অসাধারণ পোলিশ ছবি। আর “Unheard India” বিভাগে থাকছে ৮টি বিরল ভারতীয় ভাষার চলচ্চিত্র। সিনেমার ভাষায় এই বৈচিত্রই তো আসলে ভারতের শক্তি, যা এই উৎসবকে আরও মানবিক করে তোলে।

এ বছর উৎসবে থাকবে দুই শ্রদ্ধার্ঘ অধ্যায়—Centenary Tribute এবং Special Tribute। Centenary Tribute-এ স্মরণ করা হবে ঋত্বিক ঘটক, রিচার্ড বার্টন, স্যাম পেকিনপাহ, সন্তোষ দত্ত, সলিল চৌধুরী ও রাজ খোসলাকে। ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’, ‘কমলগান্ধার’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিগুলির বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁর সেলুলয়েডের দর্শন ফিরে আসবে বড়পর্দায়।
অন্যদিকে, Special Tribute-এ থাকছেন রবার্ট রেডফোর্ড, ক্লডিয়া কারদিনালে, ডেভিড লিঞ্চ, শ্যাম বেনেগাল, অরুণ রায়, রাজা মিত্র ও শশী আনন্দ—সিনেমার জগতে যাঁদের অবদান আন্তর্জাতিক পরিসরে এক অমর ছাপ রেখে গেছে।
এছাড়াও, ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ‘সত্যজিৎ মেমোরিয়াল লেকচার’, যেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলিউডের কিংবদন্তি পরিচালক রমেশ সিপ্পি। তাঁর উপস্থিতিতে উদযাপিত হবে “শোলে”-এর ৫০ বছর—যে ছবি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
প্রতিবারের মতো এবারও রয়েছে বাংলা প্যানোরামা বিভাগ, যেখানে দেখা যাবে বছরের সেরা বাংলা ছবিগুলির সংকলন। থাকবে প্রতিযোগিতা বিভাগ, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও তথ্যচিত্রের প্রদর্শনীও।

আরও এক বিশেষ তথ্য—FIAPF (International Federation of Film Producers Association, Belgium) দ্বারা স্বীকৃত এই উৎসব আজ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্রমেলার মধ্যে গণ্য। এবারে অংশগ্রহণের জন্য জমা পড়েছিল প্রায় ১৮২৭টি চলচ্চিত্র, যার মধ্যে মনোনয়ন পেয়েছে ৪৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য, ১৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও ১০টি তথ্যচিত্র। চলচ্চিত্র উৎসব মানে শুধুমাত্র পর্দার সামনে বসে সিনেমা দেখা নয়, মানে একসঙ্গে চলা বহু ভাষা, সংস্কৃতি ও ভাবনার। KIFF আবারও প্রমাণ করতে চলেছে—“Where Cinema Connects The World।”
এই আলো-ছায়ার মেলবন্ধনে কলকাতা আবার এক সপ্তাহের জন্য হয়ে উঠবে আবেগের শহর, সেলুলয়েডের হৃদয়। উত্তম-সুচিত্রার সেই কালজয়ী প্রেমের ছবি দিয়ে শুরু হয়ে যাবে নতুন গল্পের উৎসব। যেমন সিনেমা আমাদের শেখায়—শেষটা যতই সুন্দর হোক, যাত্রার শুরুটাই আসলে সবচেয়ে জাদুময়।