২০০১ সালে মুক্তি পেয়েছিল লগন, গদর, কভি খুশি কভি গম ও দিল চাহতা হ্যায়—যে চারটি ছবি একসঙ্গে বদলে দিয়েছিল বলিউডের কাহিনি।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 6 November 2025 12:40
মুম্বইয়ের থিয়েটারের বাইরে মানুষের ভিড়, হাতে টিকিট, একরাশ উত্তেজনা। কেউ বলছেন, “আজ আমিরের নতুন ছবি বেরিয়েছে!”—লগন। পাশের লাইনে কেউ ফিসফিসিয়ে বলছে, “না না, সানি দেওলের গদর দেখতে যাচ্ছি!” সেই দিন, ২০০১ সালের ১৫ জুন, বলিউডে একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছিল দু’টি সুপারহিট ছবি। আর বছর শেষ হওয়ার আগেই দর্শক আরও এক উপহার পেয়েছিল—ফারহান আখতারের 'দিল চাহতা হ্যায়'। কেউ জানত না, এই তিন ছবিই একদিন একসঙ্গে বদলে দেবে হিন্দি সিনেমার ভাষা, মেজাজ আর মানচিত্র।
ফলে বুঝতেই পারছেন ২০০১ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। বলিউড তখন একসঙ্গে দেখেছিল তিনটি যুগান্তকারী সিনেমা। 'লগন', 'গদর' এবং 'দিল চাহতা হ্যায়'। বাণিজ্যিক সাফল্যের দিক থেকে এই বছর ছিল একেবারে ‘ব্লকবাস্টার’। একই বছরে 'কভি খুশি কভি গম' (K3G)-এর মতো ছবিও মুক্তি পায়। কিন্তু দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নেয় এই তিনটি ছবি, যা আজও সময়ের সীমানা ছাপিয়ে আইকনিক।
একই শুক্রবার মুক্তি পেয়েছিল 'লগন' এবং 'গদর'। দু’টি ছবিই দেশপ্রেমের আবেগে ভরপুর, তবে উপস্থাপনায় ছিল আকাশ-পাতাল ফারাক। অশুতোষ গোওয়ারিকরের লগন-এ আমির খান এক সাধারণ গ্রামের যুবক, যিনি নিজের দল নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্রিকেট খেলায় জয় ছিনিয়ে নেন। চার ঘণ্টার এই ছবিটি শুধুমাত্র গল্পে নয়, নির্মাণেও যুগান্তকারী ছিল। কারণ এটি ছিল প্রথম বলিউড ছবি যেখানে সিঙ্ক সাউন্ড ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ডাবিং নয়, শ্যুটিংয়ের সময়েই সংলাপ রেকর্ড করা হয়েছিল। সেই সময়ে এটি ছিল এক বিপ্লব।

অন্যদিকে অনিল শর্মার গদর, এক প্রেম কথা-য় সানি দেওল এক শিখ চরিত্রে, যিনি সীমান্ত পেরিয়ে নিজের মুসলিম স্ত্রীকে (অমীষা পটেল) পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনেন। ছবির সংলাপ, আবেগ আর দেশপ্রেম মিশে তৈরি করে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। গদর ছিল সানি দেওলের জীবনের সবচেয়ে বড় হিট, যার জনপ্রিয়তা বহু বছর পরও অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে 'গদর ২' মুক্তির পর আবার নতুন করে আলোচনায় আসে।

করণ জোহরের ‘কভি খুশি কভি গম’। ২০০১-এর আর এক বিশাল হিট ছিল করণ জোহরের কভি খুশি কভি গম। ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল তার কাস্ট। অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, হৃতিক রোশন, কাজল, রানি মুখার্জি ও করিনা কাপুর। বিলাসবহুল সেট, ঝলমলে সব পোশাক, জমকালো আচার-অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে এই ছবিটি বলিউডের পারিবারিক সিনেমার দিকে আইকনিক হয়ে থেকে গেছে আজও। সেই সময় থেকেই করভাচৌথ আর জারদৌজি পোশাক বলিউডপ্রেমী মেয়েদের নতুন ফ্যাশন হয়ে যায়।
যে ছবি বদলে দিয়েছিল শহুরে সিনেমার ভাষা, নাম ‘দিল চাহতা হ্যায়’। সব হিসেব পালটে দিয়েছিল ফারহান আখতারের পরিচালনায় তৈরি দিল চাহতা হ্যায়। এটি ছিল বলিউডের এক নতুন যুগের সূচনা। এই ছবিতে প্রথমবার এমন এক শহুরে জীবনচিত্র দেখা যায়, যেখানে তিন বন্ধু (আমির খান, সইফ আলি খান ও অক্ষয় খান্না) মুম্বই-গোয়ার তরুণ প্রজন্মের চিন্তাকে তুলে ধরে। তাদের বিলাসবহুল জীবন, স্বাধীন চিন্তা, বন্ধুত্ব আর প্রেমের জটিলতা এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উঠে আসে।

‘দিল চাহতা হ্যায়’-এর সংলাপ, গান, ফ্যাশন—সবই তরুণ প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে ‘ট্রেন্ডসেটার’। আমিরের ‘সোল প্যাচ’ দাড়ি বা সইফের “cake khane chalte hain” সংলাপ তখনকার শহুরে কথ্য ভাষায় জায়গা করে নেয়।
২০০১ সালের আর এক গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা ছিল মীরা নায়ারের মনসুন ওয়েডিং। করণ জোহর বা সূর্য বরজাতিয়ার জমকালো বিয়ের গল্পের বিপরীতে এই ছবিটি দেখায় এক বাস্তব, মধ্যবিত্ত পরিবারের বিয়ের আয়োজন। যেখানে হাসি, কান্না, দ্বন্দ্ব, আর্থিক সংকট সবই একসঙ্গে দেখানো হয়েছিল। নাসিরউদ্দিন শাহ, লিলেট দুবে, শেফালি শাহ, রাজত কাপুরদের অনবদ্য অভিনয় ছবিটিকে বাস্তবতার ছোঁয়ায় মিশিয়ে দেয়।
বলিউডের নতুন দিগন্ত
২০০১ শুধু বড় হিটের বছর ছিল না, বরং বলিউডের নান্দনিকতা, গল্পবিন্যাস ও চরিত্র নির্মাণে এক মৌলিক পরিবর্তনের বছর ছিল। এই এক বছরেই দর্শক দেখেছে গ্রামীণ ভারত (লগন), দেশভাগের আবেগ (গদর), শহুরে বন্ধুত্ব ও প্রেম (দিল চাহতা হ্যায়), এবং বাস্তব সমাজের মুখ (মনসুন ওয়েডিং)। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ভারতীয় সিনেমা বুঝিয়ে দিয়েছিল—তার গল্প বলার ভাষা বদলাতে প্রস্তুত সে।