আজ আদিত্য চোপড়ার ৫৩তম জন্মদিনে ফিরে দেখা, কীভাবে তিনি শুধু বাবার তৈরি সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পাননি, বরং নিজের দূরদর্শিতায় গোটা সিনে রাজ্যটাকে নতুন ভাবে গড়ে তুলেছেন।

আদিত্য চোপড়া
শেষ আপডেট: 21 May 2025 15:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ আদিত্য চোপড়ার ৫৩তম জন্মদিনে ফিরে দেখা, কীভাবে তিনি শুধু বাবার তৈরি সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পাননি, বরং নিজের দূরদর্শিতায় গোটা সিনে রাজ্যটাকে নতুন ভাবে গড়ে তুলেছেন। যখন আপনি গুগলে সার্চ করেন, ‘একজন সফল ব্যবসায়ী কাকে বলে?’, তখন এআই উত্তর দেয়— যিনি নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক জ্ঞান ও বাজারের গতিপ্রকৃতির উপর গভীর দখল রাখেন। বলিউডে এই সংজ্ঞায় সবচেয়ে নিখুঁতভাবে মেলে যে নামটি, তা হল আদিত্য চোপড়া। রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও, আদিত্য শুধু সেই চামচ আঁকড়ে ধরেননি, তাঁকে সোনায় রূপান্তর করেছেন। নেটফ্লিক্সের ডকু-সিরিজ ‘দ্য রোম্যান্টিকস’-এ অনিল কাপুরের মন্তব্য ছিল, ‘আদিত্য সেই বিরল ছেলে, যে তার বাবার ছায়া টপকে গিয়েছেন।’

যশ চোপড়া: একজন শিল্পী, যিনি ব্যবসা বুঝতেন না
যশ চোপড়া ছিলেন রোমান্টিক সিনেমার বরপুত্র, বলিউডের এক স্বর্ণযুগের নির্মাতা। তবে ব্যবসার মঞ্চে তাঁর পদক্ষেপ ছিল অনেকটাই হোঁচট খাওয়া। বড় ভাই বি.আর. চোপড়ার অধীনে কেরিয়ার শুরু করে, পাঁচটি ছবি পরিচালনার পর ১৯৭০ সালে তিনি গড়েন নিজের প্রতিষ্ঠান — যশরাজ ফিল্মস। ‘দাগ’ (১৯৭৩) দিয়ে যাত্রা শুরু হয়ে, ‘দিওয়ার’, ‘কভি কভি’, ‘ত্রিশূল’, ‘কালা পত্থর - একের পর এক হিট। কিন্তু আটের দশকে এসে যেন ছন্দপতন। ‘সিলসিলা’ (১৯৮১) তাঁর ড্রিম প্রজেক্ট হলেও বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। সময় বদলাচ্ছিল, সমাজে আলোচনায় উঠে আসছিল সংরক্ষণনীতি, অযোধ্যা বিতর্ক, সামাজিক ন্যায়বিচার — অথচ যশ চোপড়া তখনও কাশ্মীরের টিউলিপে ডুবে। দর্শক বদলে গিয়েছিল, পরিচালক বদলাতে পারেননি। সেই এক ভুল কিন্তু ছেলে আদিত্য করলেন না।
আদিত্য চোপড়া: বিশ্লেষক
ডকু-সিরিজে করণ জোহর বলেন, ‘আদির ঘরে একটা মোটা খাতা ছিল। তাতে প্রতিটা সিনেমার বক্স অফিস প্রেডিকশন, বিশ্লেষণ, ফলাফল — সব লিখে রাখত। ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই এ সব করতো।’ হৃতিক রোশন জানান, ‘পুরো সিনেমা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন কলামে ভাগ করে রাখতো, সঙ্গে বক্স অফিস ফিগার। ও তখন থেকেই একজন প্রোডিউসার-ডিরেক্টরের মতো চিন্তা করত।”
এই ভাবনা থেকেই ১৯৯৫ সালে আদিত্য সিদ্ধান্ত নেন ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’ (DDLJ) নিজেই প্রযোজনা করবেন, কোনও স্টুডিওর সঙ্গে যৌথভাবে নয়। পরে আদিত্য বলেন, ‘কল্পনা করুন, যদি আমরা ডিডিএলজে-র ৫০% আয় ভাগ করে দিতাম, তাহলে যশ রাজ ফিল্মস আজকের অবস্থানে পৌঁছত না।’
যশ রাজ ফিল্মস: প্রেমের উদ্যান থেকে মাল্টি-জঁর সাম্রাজ্য
২০০৪ সালে যশ রাজ ফিল্মস নিজের মিউজিক লেবেল চালু করে। ২০০৫-এ শুরু হয় নিজস্ব স্টুডিও — বিশ একর জায়গায় নির্মিত ফিল্ম নির্মাণের জন্য আধুনিক এক হাব। একসময়ের এক-দু’বছরে একটি ছবি তৈরি করা সংস্থা, আজ একাধিক ছবি একসঙ্গে প্রযোজনা করে। ২০০৪ সালে আদিত্য নতুন যুগের সূচনা করেন: ‘হাম তুম’ (রোমান্টিক কমেডি), ‘ধুম’ (অ্যাকশন থ্রিলার), ‘বীর-জারা’ (স্মরণীয় প্রেম কাহিনী) — একসঙ্গে তিনটি ভিন্ন স্বাদের ছবি। তিনটিই সুপারহিট। এটাই ছিল যশ রাজ ফিল্মস-এর সীমার বাইরে পা রাখার সাহসী পদক্ষেপ।
তারকা গড়ার কারিগর
যশ রাজ ফিল্মস ট্যালেন্টের মাধ্যমে তিনি খুঁজে আনেন অনুষ্কা শর্মা, রণবীর সিং, ভূমি পেডনেকারের মতো নতুন মুখ। তিনি শাহরুখ খানকে রোমান্টিক হিরোর ইমেজ না ছাড়ার পরামর্শ দেন — পরিণামে তিনি হয়ে ওঠেন গ্লোবাল আইকন। করণ জোহর যখন ফ্যাশন ডিজাইন শিখতে প্যারিস যাবেন ভাবছিলেন, তখন আদিত্য তাঁকে বোঝান যে তিনি একজন ফিল্মমেকার! এক্সপেরিমেন্টাল চিন্তার আরও এক নিদর্শন — যশ রাজ ফিল্মস স্পাই ইউনিভার্স, যা শুরু ‘এক থা টাইগার’ থেকে, পরবর্তীতে ‘ওয়ার’, ‘পাঠান’-এ এসে পৌঁছায় মার্ভেল-স্টাইল ফ্র্যাঞ্চাইজির চূড়ায়।

যশ চোপড়া যে স্বপ্ন বুনেছিলেন প্রেম দিয়ে, আদিত্য চোপড়া সেই স্বপ্নকে রূপ দিয়েছেন পরিকল্পনায়। বলিউডে আদিত্য শুধু একজন পরিচালক বা প্রযোজক নন — তিনি একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট, একজন ভবিষ্যৎবক্তা, এক বিরাট সিনে সাম্রাজ্য গড়ার কারিগর। তাঁর গল্প আসলে এক ব্যবসায়ী-মনস্ক গল্পকারের গল্প — যার কলম চলে ডায়ালগে, আর দৃষ্টিভঙ্গি চলে ডেটায়।