উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন থেকে বম্বের তাবড় তাবড় শিল্পীদের সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান করেছেন 'রুমকি-ঝুমকি। অমলা শঙ্কর থেকে মলিনা দেবী কোলে বসিয়ে আদর করেছেন দুই বোনকে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 16 July 2025 18:06
বেঁচে থাকতে কেউ তাঁর খোঁজ রাখেনি। অথচ মারা যেতেই ভাইরাল হলেন তিনি। ঝুমকি রায়। আসল নাম তনুশ্রী রায় ভট্টাচার্য। ছয়-সাতের দশকের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী জুটি 'রুমকি-ঝুমকি'র ঝুমকির আকস্মিক প্রয়াণে সঙ্গীত মহল ও অভিনয়ের জগৎ শোকসন্তপ্ত। কিন্তু জীবিতকালে ঝুমকি দেখে যেতে পারলেন না তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এত মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে! বেঁচে থাকতে তাঁর দিকে কেউ ফিরেও দেখেনি।
অনেকে জানেনই না কে ছিলেন আদতে এই ঝুমকি রায়? অনেকে আবার রুমকি-ঝুমকি-চুমকি সব একাকার করে ভুল তথ্যের ঝড় বইয়ে দিচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। কেউ বলছে রানি মুখোপাধ্যায়ের মা প্রয়াত। কিন্তু স্বর্ণযুগের প্রতিটি বড় জলসায় আইকনিক শিশুশিল্পী জুটি ছিল দুই বোন 'রুমকি-ঝুমকি'। তখনকার বাঙালিরা সবাই এঁদের নাম জানতেন। আর একই মঞ্চে লোকগানে মাত করে দিতেন আর একটি কিশোর, মাস্টার অরিন্দম। যিনি পরে হন গায়ক অভিনেতা হংসরাজ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়।

জলসা যুগ তখন চলেছিল এই বাংলায়। এমন বহু সুপারহিট ফাংশন আর্টিস্টের জন্ম হয় সেসময়। যাঁরা এক্সক্লুসিভ জলসা আর্টিস্ট ছিলেন। তাঁদের কথা এ যুগে বিস্মৃতপ্রায়। মহম্মদ রফির হিন্দি গান তখন সব জলসায় গাইতেন পি রাজ। লতা মঙ্গেশকরের গান গাইতেন মীনা মুখোপাধ্যায়। রত্না-দেবাশিস নামে দুই ভাইবোনের গানের জুটি খুব জনপ্রিয় ছিল। প্রতি জলসায় একজন করে প্যারোডি আর্টিস্ট থাকতেন। সেই প্যারোডি বাংলা গান এখন উঠেই গেছে। বাংলা প্যারোডি গানের কিং মিন্টু দাশগুপ্ত বিখ্যাত ছিলেন। দুই বেচারা আর দীপেন মুখোপাধ্যায়ের প্যারোডি গানও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সেসময়। দীপেন মুখোপাধ্যায়ের লেটার হেডটা খুব মজার ছিল। দী, তারপর একটা পেনের ছবি। তারপর মুখার্জী। আর ছিল হরবোলা। হরবোলা হিসেবে প্রচন্ড নাম করেছিলেন সাধন-অনুপ। এসব নামগুলো আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে মানুষদের জানাতে বলা প্রয়োজন।
মহুয়া রায়চৌধুরীর কিশোরীবেলার নীলনকশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায় রুমকি-ঝুমকির শুরুর জীবন। সোনালি রায় নামে মহুয়াও অজস্র নাচের ফাংশন করতেন সংসার চালাতে। মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী মেয়েকে এই পথে আনেন। রুমকি-ঝুমকির একেবারে ছোটবেলায় বিনোদন জগতে আসা মা আরতি রায়ের হাত ধরেই। মূলত সংসার চালাতেই দুটি বালিকাকে রোজগারে নেমে পড়তে হয়। রুমকিই পড়ে হন দেবশ্রী রায়। দেবশ্রীর বাড়ির ডাক নাম ছিল চুমকি। তখন দেবশ্রীর কোনও অস্তিত্ব ছিল না। জলসায় নাচতে এসে চুমকি থেকে হয়ে যান রুমকি। যেমন মহুয়ার আসল নাম ছিল শিপ্রা। এমনকি অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের 'নদী থেকে সাগরে' ছবির টাইটেল কার্ডেও দেবশ্রী নয় রুমকি রায় তাঁর নাম। এরপর তরুণ মজুমদার 'দাদার কীর্তি' ছবির সময় রুমকি পরিচয় ঝেড়ে ফেলতে নবাগতা অভিনেত্রীর নতুন নামকরণ করলেন দেবশ্রী রায়।
উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন থেকে বম্বের তাবড় তাবড় শিল্পীদের সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান করেছেন 'রুমকি-ঝুমকি। অমলা শঙ্কর থেকে মলিনা দেবী কোলে বসিয়ে আদর করেছেন দুই বোনকে। এমনকি সুচিত্রা সেন রুমকির নাচ দেখে বলেছিলেন 'এ মেয়ের যা এক্সপ্রেশন বড় হয়ে বড় নায়িকা হবে'। সুচিত্রা সেনের পরবর্তীযুগের প্রথমা নায়িকার পতাকা তো দেবশ্রী রায়ের হাতেই ছিল আট নয়ের দশক জুড়ে।
রুমকি-ঝুমকির নাচের বিশেষত্ব ছিল ওঁরা জনপ্রিয় হিন্দি গানের সঙ্গে নাচতেন। সবই হিন্দি রেট্রো। বাংলায় নাচের গান তো বিশেষ হত না। বিশেষত হিরো-হিরোইনের হিন্দি ডুয়েট গানের রেকর্ড চালিয়ে নাচতেন দুই বোন। ঝুমকি ছিল একটু পুরুষালি তাই হিরোর রোল করতেন আর রুমকি করতেন হিরোইন। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মহঃ রফি, মুকেশ, কিশোর কুমারের সুপারহিট গানে নাচতেন দু'জন।

মহঃ রফির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল রায় পরিবারের। দুই বোনকে টফি চকোলেট উপহার দিতেন মহঃ রফি। আর ওঁদের মেজদিদি কৃষ্ণা রায় (রানি মুখোপাধ্যায়ের মা) মহঃ রফির সঙ্গে ডুয়েট গাইতেন। লতা আশা সবার গান গুলোই তিনি মহঃ রফির সঙ্গে সারা বিশ্বে গাইতেন। রফির সঙ্গে কৃষ্ণা রায় বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন বলা যায়।
দেবশ্রী রায়রা চার বোন আর দুই ভাই। পূর্ণিমা, কৃষ্ণা, ঝুমকি আর চুমকি এবং দুই ভাই সন্তু আর নন্তু। তাঁদের বাবা ছিলেন ভীষণ রূপবান। শান্ত, সৌম্য, স্নিগ্ধ চেহারার। কিন্তু রোজগারে তিনি পিছিয়ে ছিলেন। তার ওপর এতজন সন্তান। প্রথমে মেজ মেয়ে কৃষ্ণা রায়ের ফাংশনের রোজগারেই চলত পরিবার। কৃষ্ণার বিয়ে হয়ে গেল বম্বের বিখ্যাত মুখোপাধ্যায় পরিবারের ছেলে রাম মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। রাম-কৃষ্ণার দুই ছেলে-মেয়ে রাজা আর রানি। সেসময় মা আরতি রায় ছোট দুই মেয়েকেই জলসা করে রোজগারে নামাতে বাধ্য হন। মেয়েদের প্রতিভা কাজে লেগে গেল সংসারে। রোজ রাতেই ফাংশনে নাচ করতে গিয়ে সকালবেলা আর স্কুলে যাওয়া হত না তাঁদের। পড়াশোনাও যে কারণে বেশিদূর এগোল না। কিন্তু খ্যাতির চূড়ায় উঠে গেল 'রুমকি-ঝুমকি' জুটি। মহুয়া রায়চৌধুরী বা দেবশ্রী রায় এরা সবাইই ছিলেন পরিবারের কাছের সোনার ডিম পাড়া হাঁস। মায়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ চলত বাড়িতে। কিন্তু দেবশ্রী আর তনুশ্রী ভীষণ ভালবাসতেন মাকে। শেষদিন অবধি মায়ের সেবা করে গিয়েছেন দুই মেয়ে।

একটা সময় পর রুমকি-ঝুমকি বড় হয়ে গেল। তখন আর তাঁদের সেই ছোটবেলার বাজার রইল না। শিশুশিল্পীরা বড় হয়ে গেলে যা হয় আর কী! দেবশ্রী নাচ আর অভিনয় ক্ষমতার জোরে সিনেমার নায়িকা হয়ে গেলেন। ঝুমকি কী করবেন?
ঝুমকির গানের গলা ভাল ছিল। ঝুমকির চেহারায় তখন একটা পশ্চিমী চটক ছিল। নিজের লাল কার্ল চুল করে ভীষণ ফ্যাশনেবল পোশাক পরতেন তিনি। গায়িকা হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু হল ঝুমকির। গালিব বারে প্রতি সন্ধ্যেতে জমে উঠত ঝুমকি রায়ের হিন্দি গান। সেসময় মুন্না নামে মহঃ রফি কন্ঠে এক তরুণও গালিব বারে গাইতেন। পরে যিনি হলেন মহঃ আজিজ। অমৃক সিং অরোরার গানের শুরুও ওখানে।
গালিব বার থেকে ঝুমকি বহু ফাংশনেরও অফার পেতে লাগলেন। শৈলেন্দ্র সিং থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আর ডি বর্মণের সঙ্গেও গান গেয়েছেন ঝুমকি।
শুধু তাই নয় একবার পুজোয় দেবশ্রী রায় আর ঝুমকি রায়ের পুজোর গান বেরল। গান গাইলেন দেবশ্রী নিজের গলায়। 'দুর্গা মা এলো ঘরে' ক্যাসেট বেশ হিট করেছিল। 'শোন শোন মোর গান' দেবশ্রী আর ঝুমকির বেশ হিট করেছিল। অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গেও অ্যালবাম করেছিলেন ঝুমকি 'স্বপ্নেতে কোন সজনা এসে' সুরারোপ করেছিলেন ইলিয়া রাজা। নিজের বেশ কিছু আধুনিক গানের অ্যালবামও বার করেন চুমকি।

কিন্তু গায়িকা হিসেবে দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হতে পারেননি ঝুমকি। মৌলিক গান গাইলেও শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পাননি তিনি। যে মর্যাদা তাঁর পাওয়ার কথা ছিল সেই সম্মান পাননি। একটা সময়ের পর শুধুমাত্র দেবশ্রী রায়ের দিদি এই পরিচয়ই হয়ে যায় তনুশ্রীর। অথচ বাংলা বিনোদনের জগতের বিবর্তনের সাক্ষী তনুশ্রী।
তনুশ্রী বিয়ে করেছিলেন পরিচালক সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে। সঞ্জয় মৃণাল সেনের সহকারী পরিচালক ছিলেন প্রথম দিকে। পরে নিজের একাধিক সিরিয়াল, টেলিছবি করেছিলেন। সৃজনশীল ছাপ সঞ্জয়ের পরিচালনায় ছিল। সঞ্জয়ের বাজনার হাত ছিল ভাল। গানে-বাজনায় প্রেম থেকে পরিণয় হয় তাঁদের। দেবশ্রী ও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে ঝুমকি আর সঞ্জয়ের বিয়ে হয়। পরের বছর বিয়ে হয় দেবশ্রীর প্রসেনজিতের।
ঝুমকি রায়ের আর একটি দিক ছায়া দেবীর মেয়ের মতো ছিলেন তিনি। চুমকি ঝুমকি দু'জনকেই নিজের মেয়ে ভাবতেন ছায়া। সারাজীবন ছায়া দেবীকে কনক বলে ডেকেছেন ওঁরা দুই বোন। কনক মারা যাবার পর হবিষ্যি করে পারলৌকিক ক্রিয়া মেয়ের মতোই করেন ঝুমকি।

ঝুমকি আর সঞ্জয় নিঃসন্তান দম্পতি। গোপাল ঠাকুরকে নিজের সন্তান ভেবে সঙ্গে রাখতেন ঝুমকি। দুটো গোপালকে রোজ সুন্দর করে সাজিয়ে পুজো করতেন, এমনকি গোপাল নিয়ে তীর্থভ্রমণেও যেতেন ঝুমকি। গোপালের মধ্যেই সারাজীবন তিনি খুঁজতে চেয়েছেন সন্তানের মায়া। মা হতে না পারলেও, ঝুমকির ব্যবহারে ছিল অনেক বেশি মাতৃত্ব।
ঝুমকিকে কাছের মানুষরা ঝুমা বলেই ডাকতেন বেশি। কেউই বোঝেনি, ঝুমকি নিজেও জানতেন না তাঁর সময় শেষ হয়ে এসছে। ভক্তিপ্রাণা ঝুমকি গুরুপূর্ণিমার আগের দিন লেক মার্কেট থেকে পরের দিনের পুজোর বাজার নিজহাতে করেছিলেন। ঠাকুরের আসন ঝেড়েমুছে নিজেই পরিস্কার করে সাজিয়ে দিলেন ফুল দিয়ে। প্রাণের প্রদীপ দুই গোপালকে নিজে হাতে সাজালেন। পরের দিনের ঠাকুরের ভোগ রান্নার সব প্রস্তুতি শেষ। এসবই যেন ঘটছিল পরদিন সূর্য উঠলেই ঝুমকির চিরতরে প্রস্থান হবে বলে। কোনওরকম অসুস্থতা রাতে ছিল না।
গুরুপূর্ণিমার সকাল হতেই হাতে অসহ্য ব্যথা। এমন ব্যথা তো তাঁর হতই মাঝেমধ্যে। শরীর লাগতে লাগল খারাপ। দেরি না করে গাড়ি ভাড়া করে সোজা বর চলে গেলেন ঝুমাকে নিয়ে হাসপাতালে। গাড়িতে যেতে যেতেই স্বামীর কোলে মাথা দিয়ে এলিয়ে পড়েন ঝুমকি। হাসপাতালে তাঁকে স্ট্রেচারে তোলা হয়, তখন সঞ্জয় হাসপাতালে ভর্তির অফিসিয়াল কাগজ সই করছেন। তখনই স্ট্রেচার ধরা ছেলেরা জানায় ঝুমকি রায় তো গাড়িতেই মারা গিয়েছেন। এমন আচমকা মৃত্যু স্বামী সহ কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি।

পিঠোপিঠি বোনের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে দেবশ্রী অঝোরে কাঁদতে থাকেন। অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়ে গেল দিদির চলে যাওয়াতে দেবশ্রী রায় কেন এলেন না। যাদের প্রতি মিনিটে কথা হত কেন এই দেবশ্রীর অন্তরাল? আসলে মরদেহ আর সহ্য করতে পারেন না দেবশ্রী। বহু বছর আগেই দেবশ্রী শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন বড়দা সন্তুর প্রয়াণে। তবে বর্তমানে রায় পরিবারে একের পর এক মৃত্যু। চলে গেলেন মা আরতি রায়, তারপর বড়দি পূর্ণিমা রায়, এরমাঝে ঝুমার দেওর, তারপর ঝুমা নিজেই হঠাৎ চলে গেলেন। কারুর মরদেহ দেখতেই দেবশ্রী যাননি। কিন্তু শোক ভুলতেও তিনি পারছেন না। যদিও সবাই আশা করেছিল সর্বক্ষণের সঙ্গী ঝুমকিকে দেখতে চুমকি ঠিক যাবেন।
ঝুমকি ছিলেন ভক্তিমতী মহিলা। সবসময় গোপাল সেবা আর সত্য সাইবাবার আশ্রয়ে থাকতেন। এমন ভাগ্য কম বিবাহিতা মেয়ের কপালে জোটে। গুরুপূর্ণিমার দিন বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীবারে স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে পাড়ি দিলেন ঝুমকি রায়। ঠাকুরের আসন তখন ফুল দিয়ে সাজানো, ধূপের ধোঁওয়া উঠছে, যেন নিজেকেই গোপালের চরণে সমর্পণ করে দিলেন তনুশ্রী।