বাভুমা নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে বলে দিয়েছেন—‘খাটো’ কে? উচ্চতা দিয়ে মাপা যায় না একজন খেলোয়াড়ের কৌলীন্য। আর বুমরাহ তাঁর আচরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন—ভুল হলে স্বীকার করতে লজ্জা নেই।
.jpeg.webp)
বাভুমা ও বুমরাহ
শেষ আপডেট: 16 November 2025 16:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মজা-মশকরার ছলেও কত অন্যায্য, অবমাননাকর মন্তব্য করে ফেলি আমরা, অক্লেশে, সাক্ষী ছিল ইডেন (Eden Gardens)। ইডেনের বাইশ গজ। তেম্বা বাভুমা (Temba Bavuma), দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক, ‘বাউনা’-র মানে বোঝেন না। এলবিডব্লুর (LBW) আবেদন নাকচ হওয়ার পর ডিআরএস (DRS) নেওয়া উচিত কি উচিত নয়, এই নিয়ে যখন শলা-পরামর্শ চলছে, নির্দ্বিধায় বাভুমাকে এই শব্দেই (বাংলায়: বেঁটে/ বামন) সম্বোধন করেন জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah)৷
যতটা আত্মমগ্ন, প্রচারবিমুখ দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক, মানে জানলেও প্রতিবাদ করতেন বলে মনে হয় না। কিন্তু স্ট্যাম্প মাইকে (Stump Mic) সবটুকু ধরা পড়ার পর যখন চারিদিকে ছিছিক্কার উঠেছে, তারপরেও মুখ ফুটে কিছু বলার প্রয়োজন অনুভব করেননি। যতটুকু বলার ব্যাট হাতেই বোঝালেন। কার্যত আস্তাবল হয়ে যাওয়া অসমান বাউন্সের বাইশ গজে একাই কুম্ভ হয়ে লড়ে গেলেন৷ হাঁকালেন দুরন্ত হাফসেঞ্চুরি। মাপের বিচারে কেরিয়ারের প্রথম সারিতে না থাকলেও মানের বিচারে এই ইনিংস টপ থ্রি-তে জায়গা করে নেবে নিশ্চয়!
ম্যাচের শেষবেলায় তাই ছবিটা ছিল অন্যরকম। দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa) যখন ইতিহাস গড়ার উদযাপনে মত্ত, ভারতীয় ড্রেসিংরুম হতাশ, তখন দেখা গেল—বুমরাহ এগিয়ে এসে বাভুমার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। যে সম্পর্ক প্রথম দিনের স্ট্যাম্প-মাইক বিতর্কে তলানিতে ঠেকেছিল, ম্যাচ শেষে তা মিটে গেল অকপট কথোপকথনে। বাভুমা হাসলেন, বুমরাহ হাসলেন—প্রফেশনাল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ব্যক্তিগত সম্মান ঠিক কীভাবে বজায় রাখতে হয়, সেই ক্লাসিক ছবি মেলে ধরল টিভি ক্যামেরা।
পরিস্থিতিটা ভারতের জন্য যতটা বিব্রতকর, দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য ততটাই অনুপ্রেরণাদায়ক। বাভুমার উপর প্রথম দিন থেকেই চাপ ছিল—শর্ট বল, এলবিডব্লু, রিভার্স সুইং (Reverse Swing), আর তার সঙ্গে শরীরী গড়নকে ইঙ্গিত করে ভেসে আসা কু-মন্তব্য। এতকিছুর পরও তিনি মাথা ঠান্ডা রাখলেন। ম্যাচের কঠিনতম পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে দাঁড়ালেন। তাঁর ৫৫*—সংখ্যায় ছোট হলেও ম্যাচের সবচেয়ে মূল্যবান ইনিংস। বাইশ গজ যখন আচমকা হিংস্র হয়ে উঠছে, বল কখনও লো, কখনও উঠে গিয়ে গলার কাছে, সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে টেম্বার ব্যাটিং পরিমিত, শান্ত, দৃঢ়।
ভারতীয় ব্যাটাররা যেখানে ভয় আর তাড়াহুড়োর চাপে ভুল করে বসেছেন, সেখানে বাভুমা বিপরীত মেরুতে। ফ্রন্ট-ফুটে এসে ডিফেন্ড, স্পিনে শরীরের সঙ্গে ব্যাট লাগিয়ে রাখা, বুদ্ধিদীপ্ত লেট প্লে—প্রতিটি শটে ধরা পড়েছে স্কুলপাঠ্য টেকনিক। ইনিংসের শেষে তিনি শুধু দলকে লিড-ই দেননি, দলের মানসিক আত্মবিশ্বাসও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
ম্যাচের ভাগ্য এমনিতেই অল্প ব্যবধানে ঝুলছিল। ভারতের ১২৪ রান তাড়া করা কোনওদিনই সহজ হত না এই ধরনের অশান্ত পিচে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের স্পেল একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল কি? সিমন হার্মারের (Simon Harmer) অফস্পিন, জেরাল্ড কোয়েটজির (Gerald Coetzee) গতি, মার্কো জানসেনের (Marco Jansen) বাউন্স—সব মিলিয়ে পন্থ-রাহুলরা বুঝতেই পারেনি কোন বলটা কোথায় যাবে। বাভুমার ইনিংসের গুরুত্ব ঠিক এখানেই—ওই ৫৫ রান না হলে ভারতকে ৯৩–এ গুটিয়ে দিলেও ম্যাচের দিশা এমন দাঁড়াতই না।
বুমরাহ ম্যাচ শেষে যেভাবে বাভুমাকে জড়িয়ে ধরলেন, তা শুধু একটি বিতর্কের ইতি নয়—একটা বড় বার্তাও বটে। মাঠে লড়াই হতে পারে তীব্র, ভুল বোঝাবুঝিও জমতে পারে, আবেগেও অতিরিক্ত কিছু বেরিয়ে আসাও অস্বাভাবিক কিছু নয়—কিন্তু খেলা শেষের অর্থ সেই উত্তাপের চিরসমাপ্তি। নিজের ভুল আর স্খলন এড়িয়ে না গিয়ে মেনে নেওয়া। তারপর বৈরিতা ভুলে এগিয়ে চলা। দুই দেশের সম্পর্ক, দুই দলের মর্যাদা, আর সবচেয়ে বড় কথা—ক্রিকেটের আদর্শ—সবই টিকে থাকে ওই জড়িয়ে ধরার ক্ষণকালীন মুহূর্তে।
বাভুমা নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে বলে দিয়েছেন—‘খাটো’ কে? উচ্চতা দিয়ে মাপা যায় না একজন খেলোয়াড়ের কৌলীন্য। আর বুমরাহ তাঁর আচরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন—ভুল হলে স্বীকার করতে লজ্জা নেই। দুই তারকার ছোট্ট আলাপচারিতা ইডেনের শোরগোলের চেয়ে অনেক বড় ও তেজোবান একটা কথা বলল—ক্রিকেটে শ্রদ্ধা এখনও আছে, থাকবে। আর বাভুমা আলাদা করে প্রমাণ করে দিলেন, উচ্চতা নয়, মেরুদণ্ডই একজন খেলোয়াড়ের আসল অভিজ্ঞান।