তিনি যখনই ভাল খেলছেন, বলা হচ্ছে—এটাই কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট। আর ব্যর্থ হচ্ছেন যখন, সেই মুহূর্তে তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আপামর কালো চামড়ার মানুষের যৌথ ব্যর্থতা!

টেম্বা বাভুমা
শেষ আপডেট: 15 June 2025 11:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেপ টাউনের শহরতলি লাঙ্গা। সেখানেই বেড়ে ওঠেন টেম্বা বাভুমা। বাড়ির কাছে চারমাথা রাস্তা। ধুলোভরা, ক্ষয়াটে। তারই একটা লেন ছিল তুলনায় পরিষ্কার, সমতল।
গলি ক্রিকেটেই হাতমকশো। চারমাথা রাস্তার বাকি সমস্ত বাঁকে বল অসমান বাউন্স খেত। কিন্তু ওই সাফসুতরো যে লেন, সেখানে ডেলিভারি আসত সিধে। আর তাই সপাটে, মনের সুখে চার, ছক্কা হাঁকাতে পারতেন বাভুমা।
দলের সবাই ওই চারটে রাস্তার চারখানা নাম দিয়েছিল। একটু বেশি ভাঙাচোরা যেটা, সেটা ‘করাচি’। তুলনায় মসৃণ ‘মেলবোর্ন’। আর সবচেকে ঝকঝকে, বাভুমার প্রিয়্তম যে লেন, তার নাম ‘লর্ডস’।
নয়ের দশকের এক মলিন বিকেলে লাঙ্গার গলিপথ ‘লর্ডসে’ সেঞ্চুরি করা বাভুমা কি কল্পনা করেছিলেন, তিনি আসল ‘লর্ডস’… ক্রিকেটের মক্কা… সেখানে দাঁড়িয়ে পরাক্রমী অস্ট্রেলিয়া বাহিনীকে কুপোকাত করে দেশকে প্রথমবার ‘বিশ্বখেতাব’ জেতাবেন? হ্যামস্ট্রিংয়ের অকথ্য যন্ত্রণা সামলে কামিন্স-স্টার্কদের চোখে চোখ রেখে লড়ে যাবেন? অধিনায়ক তিনি… পাড়ার টিমের নয়, জাতীয় দলের… হয়ে উঠবেন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের অন্যতম আইকন?
জয়সূচক রান তুলে যখন সোল্লাসে দৌড় দিয়েছেন ডেভিড বেডিংহ্যাম, সতীর্থদের মুষ্টিবদ্ধ হাত যখন রোদেলা বিকেলে লর্ডসের আকাশে দিনবদলের জয়চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে, তখন ছবির মতো সুন্দর ব্যালকনিতে বসে বারবার মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন বাভুমা।
তীব্র অবিশ্বাস? চোখের সামনে ঘটে চলা সত্যিকে কিছুতেই সত্যি ভাবতে না পারা?
নাকি ভাষা খুঁজে চলা অবরুদ্ধ আবেগের শরীরী প্রকাশ? সমস্ত সংশয় আর প্রশ্নের মুখে তুড়ি মেরে সেরার শিরোপা জিতে নিলে মুখের কথার বদলে নীরবতাই বাঙ্ময় হয়ে ওঠে—বাভুমার দর্শনও কি তাই?
হয়তো এটাই সত্যি! নয়তো কেন ফাইনাল জিতে সাংবাদিককে সটান বলে বসবেন: ‘আপাতত আমি আর কিছু বলতে চাই না। শুধু এই চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি সামনে রেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকব। তাতেই যে যা বোঝার বুঝে যাবে!’
বাভুমা আজ প্রবলভাবে সরব হতে পারতেন। আজ তাঁরই কথা বলার দিন। কেরিয়ারে কী না শুনতে হয়েছে, কত অপবাদ আর গঞ্জনার পাহাড়ই না বয়ে বেড়াতে হয়েছে। খর্বকায় শরীর, কৃষ্ণকায় রং… কখনও বর্ণ, কখনও জাতিকে নোংরাভাবে সামনে টেনে বিদ্রূপ, কটূক্তির বর্ষণ চলেছে। ব্যাট হাতে ফর্ম, পরিসংখ্যান তোলা থাক। একটি ম্যাচ ব্যর্থ হলেই ধেয়ে এসেছে তির্যক শ্লেষ, বাঁকা মন্তব্য। তাঁকে শিখণ্ডী বানিয়ে ফালা ফালা করা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো চামড়ার মানুষদের। যাঁদের কেউই সেভাবে জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে পারেননি। অপেক্ষা করতে হয়েছিল মাখাইয়া এন্তিনি পর্যন্ত। তার আগে তো বটেই, পরেও কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটারদের মাথা খুঁড়ে মরতে হয়েছে, দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ জোটেনি।
হয়তো সে কারণেই পুরস্কার নিতে এসে বাভুমা হাল্কা চালে বলে দেন, ‘এবার থেকে, আশা করি, আমায় কালো চামড়ার আফ্রিকান ক্রিকেটারের বাইরে অন্য চোখে দেখা শুরু হবে!’
যদিও নয়ের দশকে যখন কেপ টাউনের এক ছোট শহরে বেড়ে উঠছেন বাভুমা তখন থেকেই এই ‘নজর বদলে’র শুরু। দেশের প্রথম সারির সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে আগে শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ ছাত্রছাত্রীরাই পড়ার সুযোগ পেতেন, তাদের দুয়ার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্যও উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। আর এই অবরোধ ভাঙার ছাপ শিক্ষা-বাণিজ্য-বিনোদন ছাপিয়ে এসে পড়ে খেলার ময়দানে। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের জাত চেনানোর পর বাভুমা পান জাতীয় দলের সুযোগ।
কিন্তু সেই সুযোগ যে কাঁটার মুকুট হতে চলেছে, বোধ হয় ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি বছর চব্বিশের তরুণ। যখন জাতীয় টিমের টুপি মাথায় দিলেন তখন দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর দল। এই পরিস্থিতিতে যে কোনও অনভিজ্ঞ, উঠতি ক্রিকেটারের অগ্নিপরীক্ষার প্রথম সওয়ালই আসা উচিত স্কিল আর ফর্ম নিয়ে।
কিন্তু শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট মহল চোখ দুটো বড় বড় করে বাভুমাকে মাপতে বসে তার ক্রিকেটীয় দক্ষতা নয়, একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার আদৌ ব্যাট করতে পারে কি পারে না—এই নিয়ে!
আর ঠিক তখনই বাভুমার কাঁধে চেপে বসে আরও বড় বোঝা। সে বোঝা তাঁর জাতিকে নিয়ে, তাঁর বর্ণের মানুষদের নিয়ে। তিনি যখনই ভাল খেলছেন, বলা হচ্ছে—এটাই কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট। আর ব্যর্থ হচ্ছেন যখন, সেই মুহূর্তে তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আপামর কালো চামড়ার মানুষের যৌথ ব্যর্থতা! বাইরের দুনিয়া, যারা দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিবৈষম্য নিয়ে নামেমাত্র ওয়াকিবহাল, কোনও রকম সহমর্মিতা বা সহানুভূতি দেখায়নি।
কিন্তু এরপরেও ২০২১ সালে একদিনের ক্রিকেটে জাতীয় দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন বাভুমা। মাত্র ছ’খানা ওয়ান ডে আর আটটা টি-২০ ম্যাচের পরেই দলের নেতৃত্ব পেলেন একজন নাদান, অপরিচিত কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার—এই তথ্যকে যেভাবে নেওয়ার ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করে আফ্রিকার ক্রিকেট মহল। বাভুমার নামের আগে জুড়ে যায় ‘কোটা অধিনায়কে’র তির্যক, অপমানকর বিশেষণ। পরের বছর টি২০ বিশ্বকাপে শোচনীয় ফল পরিস্থিতি আরও অসহনীয় করে তোলে। বাভুমাকে শুধু নেতৃত্ব থেকে নয়, দল থেকে তাড়ানোর রব উঠতে শুরু করে।
কিন্তু ঠিক তখনই পরিস্থিতি একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যায়। কোচের গদিতে বসেন শুকরি কোনার্ড। যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য নিয়ে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন। আর জানতেন বাভুমার শক্তি ও দুর্বলতা। নির্মোহ দৃষ্টিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একদিকে বাভুমাকে ওয়ান ডে টিমের নেতৃত্ব থেকে অব্যহতি দেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে পদচ্যুত খেলোয়াড়কেই টেস্ট টিমের অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেন! আসলে কোনার্ড বুঝেছিলেন, টেকনিকের দিক দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটই বাভুমার আসল বিচরণভূমি। সেখানেই তিনি নিজেকে ও দলকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
বাভুমা কোচের মান রাখেন। অধিনায়কত্ব লাভের পরেই ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে করেন ১৭২ রান। ৫৭ টেস্টে দ্বিতীয় শতরান। আর এই একটি ইনিংসই যেন ফ্লাডগেট খুলে দেয়। পরপর আরও দুটি সেঞ্চুরি করে নিন্দুকদের মুখে ঝামা ঘষে দেন বাভুমা। হাঁকান পাঁচটি হাফ-সেঞ্চুরি। দলের হয়ে গত দু’বছরে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক রান সংগ্রাহক, সেরা ব্যাটিং গড়ের মালিকও এই খর্বকায়, কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার!
হয়তো এই ধারাবাহিকতাই বাভুমাকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, গড়ে তু্লেছে সংযম। হয়তো এই কারণেই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ রানের মাথায় হ্যামস্ট্রিংয়ের যন্ত্রণা শুরু হলেও মাঠ ছাড়েননি তিনি। জানতেন ওই মুহূর্তে মাঠের বাইরে যাওয়া মানেই লড়াই থেকে বিদায়। এই প্রস্থান তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারবেন না। ফের একবার তীরে এসে তরী ডুববে, ‘চোকার্স’ তকমাটা ঢিল হয়ে ছুড়তে শুরু করবে ট্রোলারের দল, নিন্দুকরা ফের একবার তাঁর দায়বদ্ধতাকে কাঠগড়ায় তুলে কৃষ্ণাঙ্গ কমিউনিটিকে বিঁধবে—এটা বাভুমা কাছে অকল্পনীয়।
তাই ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘হাল ছেড়ে দেওয়াটা অবশ্যই একটা অপশন। সেটা সবসময় যে কোনও লড়াইয়ে দেখা যায়। মনের আড়ালেও চলতে থাকে। কিন্তু আমার কাছে ওই মুহূর্তটাই ছিল প্রমাণের সুযোগ… নিছক কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটারের ঊর্ধ্বে উঠে একজন খেলোয়াড় যে কিনা তার দেশের আশা পূরণ করতে পেরেছে—এই পরিচিতি তৈরির সুযোগ। আমি বুক চিতিয়ে হাঁটতে চেয়েছিলাম। আশা করি আমাদের দেশ এই জয় থেকে অনুপ্রেরণা পাবে।‘
ছেলেবেলায় মসৃণ ‘লর্ডসে’র রাস্তায় খেলা টেম্বা বাভুমা কোনও দিন কল্পনা করেননি তিনি ইংল্যান্ডের আদত লর্ডসে খেলবেন, দেশকে বিশ্বখেতাব জেতাবেন। কিন্তু একটা আবছা ফ্যান্টাসি সব সময় মনের গভীরে ঢেউ তুলত। ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাজুক হেসে স্বীকার করেছেন বাভুমা।
কে বলে স্বপ্ন সত্যি হয় না!