১৫ বছর পরে ফিরে এসেও যদি এমন নজির মেলে ধরেন, তবে শিরোনামে দেওয়া প্রবাদের কথাটাই তাঁর নামের সঙ্গে খাপে খাপ মিশে যায়—‘সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়!’

বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 24 December 2025 16:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখে জানানো হয়েছিল: ফিট থাকতে খেলতে হবে৷ কোথায়? না, ঘরোয়া ময়দানে। টুর্নামেন্টের নাম? বিজয় হাজারে ট্রফি৷ শেষবার নেমেছিলেন ১৫ বছর আগে৷ যখন তিনি সবে কেরিয়ার গোছাতে শুরু করেছেন৷ অনেক কিছু প্রমাণ করা বাকি।
প্রায় দেড় দশক পরে গদিতে বসা নির্বাচকরা যখন জানিয়ে দেন, বিশ্বকাপে স্কোয়াডে জায়গা পেতে চাইলে রাজ্যের জার্সি গায়ে ফের একবার ঘাম ঝরাতে হবে, নইলে টিকিট মিলবে না—প্রথমটায় অস্মিতায় ঘা লেগেছিল বিরাটের৷ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরপর সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে যা বোঝানোর বুঝিয়ে বেঁকে বসেন৷ তারপর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইউ-টার্ন৷ নিশ্চয় মনে মনে কিছু একটা শপথ করে ফেলেছিলেন সেদিন৷ নয়তো এভাবে পালটি খাওয়ার বান্দা তো বিরাট কোহলি নন!
শপথ যে ছিল, নিশ্চিত প্রমাণ মিলল আজ৷ বেঙ্গালুরুর সেন্টার অফ এক্সিলেন্সের রুদ্ধদ্বার ময়দানে৷
১৫ বছর পর প্রত্যাবর্তন, তবু ছবিটা বড় চেনা
দীর্ঘদিন বাদে বিজয় হাজারেতে নামা। নামের পাশে কোনও উঠতি কিংবা প্রতিশ্রুতিমান তারকা-তকমা নেই, গ্যালারি শুনশান, নেই হুড়োহুড়ি… কিন্তু ব্যাট হাতে নেমে প্রথম কয়েকটা বলেই বুঝিয়ে দিলেন—ফরম্যাট বদলালেও একচুল পাল্টাননি বিরাট। ২৯৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দিল্লির ইনিংসের হাল ধরলেন শুরু থেকেই। না তাড়াহুড়ো, না অহেতুক ঝুঁকি। চোখে-মুখে সেই পুরনো আত্মবিশ্বাস। দ্রুত লয়ে রান তোলার সেই চিরচেনা অভ্যাস!
‘ভিন্টেজ বিরাট’: অফ-সাইডে রাজত্ব
এই ইনিংসের সবচেয়ে বড় বার্তা—নিয়ন্ত্রণ। অফ-সাইডে একের পর এক নিখুঁত শট। কভার অঞ্চল ফের নিজের করে নিলেন। শুধু এক-দুই নয়, বড় শটেও আত্মবিশ্বাস। কভার ছুঁয়ে, লং অফের উপর দিয়ে ছক্কা! তিনটে ছয়ে বুঝিয়ে দিলেন, শরীর এখনও কথা শোনে।
আর দৌড়? স্প্রিন্ট? যেটা কিনা বিরাটের হলমার্ক? এক রানকে দুইয়ে, দুইকে তিনে বদলানোর সেই খিদে একটুও কমেনি। ৩৭ রান এল সিঙ্গেল থেকে। ডাবলসে আরও আট। ৩৫-এর কোঠায় পৌঁছেও ফিটনেসে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। আর ঠিক এই জায়গাতেই তিনি আলাদা, এখনও অপ্রতিরোধ্য!
রেকর্ডের মাইলফলক, নজর কিন্তু ম্যাচ
ইনিংস চলাকালীন একটার পর একটা রেকর্ড ছুঁয়ে ফেললেন। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১৬ হাজার রান পার করা মাত্র দ্বিতীয় ভারতীয় ব্যাটার। কিন্তু সে সব নিয়ে বাড়তি কোনও উচ্ছ্বাস নেই। লক্ষ্য একটাই—দলকে জেতানো। ৯৪ বলে ১১৮ থেকে ধীরে ধীরে ইনিংসটা বড় করলেন। শেষমেশ ১০১ বলে ১৩১। ১৪টা চার, তিনটে ছয়—পরিসংখ্যান চোখধাঁধানো, আসল সৌন্দর্য গাঁথা ইনিংসের ছন্দে। শেষ পর্যন্ত পিভিএসএন রাজুর বলে আউট হলেন। কিন্তু ততক্ষণে কাজ যা করার করে ফেলেছেন। দিল্লির রান চেজের ভিত পাকা।
বার্তা স্পষ্ট: ফর্ম ঘরোয়া দিয়েও প্রমাণ হয়
এই সেঞ্চুরি শুধু একটি শতরান নয়। এ এক নিপাট জবাব। নির্বাচকদের উদ্দেশে, সমালোচকদের উদ্দেশে… হয়তো নিজের কাছেও! আন্তর্জাতিক মঞ্চে রান করে দেখানো এক কথা আর কেরিয়ারের প্রান্তবেলায় ঘরোয়া ক্রিকেটে নেমে দায়িত্ব নিয়ে দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া আরেক ধাঁচের চ্যালেঞ্জ। বিরাট আজ দুটোকেই এক সূত্রে মিলিয়ে দিলেন।
২০২৭-এর বিশ্বকাপ অনেক দূরে। কিন্তু গোছানো, নিয়ন্ত্রিত ইনিংস বুঝিয়ে দিল—পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বিরাট কোহলি এখনও প্রাসঙ্গিক, এখনও ভয়ংকর, এখনও নির্ভরযোগ্য। ১৫ বছর পরে ফিরে এসেও যদি এমন নজির মেলে ধরেন, তবে শিরোনামে দেওয়া প্রবাদের কথাটাই তাঁর নামের সঙ্গে খাপে খাপ মিশে যায়—‘সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়!’