হার নিশ্চিত বলে মনে হলেও, ময়দানে অপ্রত্যাশিত কোনও নায়কের একটা স্পেল পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। গতকাল সেই নায়কের নাম বিহান মালহোত্রা।

বিহান মালহোত্রা
শেষ আপডেট: 18 January 2026 11:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যাচটা তখন কার্যত ভারতের হাতছাড়া। স্কোরবোর্ড দেখাচ্ছে ১০০/২। হাতে আট উইকেট। ডিএলএস হিসেবেও স্বচ্ছন্দে এগিয়ে বাংলাদেশ। গ্যালারির একাংশে ভারতীয় সমর্থকরাও বুঝে গিয়েছিলেন—এখান থেকে ফেরা প্রায় অসম্ভব। ঠিক তখনই রঙ্গমঞ্চে এন্ট্রি নায়কের। অপ্রত্যাশিতি। কারণ ওই অবস্থা থেকে খেলার মোড় ঘোরানো সম্ভব, বিশেষ করে যখন টার্গেট বিরাট কিছু নয়, খোদ টিম ইন্ডিয়ার ম্যানেজমেন্টও কি আশা করেছিল? বিহান মালহোত্রা (Vihaan Malhotra) সেই অসাধ্য সাধন করলেন। তিনি পর্দায় পা রাখতেই যা ঘটল, তা অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপের (U19 World Cup) ক্লাসিক ‘হাউডিনি অ্যাক্টে’র নিখুঁত নিদর্শন!
হাতছাড়া মানেই হেরে যাওয়া নয়!
শনিবার কুইন্স স্পোর্টস ক্লাবে (Queens Sports Club) বৃষ্টিভেজা বিকেলে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ২৯ ওভারে ১৬৫ রান। ২০ ওভার শেষে ১০২/২। ডিএলএস পার স্কোরের (DLS par score) থেকে অনেকটাই এগিয়ে। ওপেনাররা সেট। মিডল অর্ডারের ব্যাটাররা আত্মবিশ্বাসী। ভারতের বোলারদের চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট।
এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচে ফেরার কোনও সহজ রাস্তা ছিল না। ব্যাট হাতে টিম ইন্ডিয়া আগেই ধাক্কা খেয়েছে। বোলারদের জারিজুরি সেভাবে কাজে লাগছিল না। তখনই অধিনায়ক আয়ুষ মাত্রে (Ayush Mhatre) শেষ তাস হিসেবে বল তুলে দিলেন পার্ট-টাইম অফস্পিনার বিহান মালহোত্রার হাতে।
এক স্পেলেই মোড়বদল
বিহান নামার সঙ্গে সঙ্গেই বদলাতে শুরু করল দৃশ্যপট। কোনও তাড়াহুড়ো নেই। ফ্লাইট আছে। গতি কম-বেশি। নিপুণ ভ্যারিয়েশন। ব্যাটারকে এগতে প্রলুব্ধ করা—তারপর ফাঁদে ফেলে ভুল করানো। ঠিক এই ফর্মুলাতেই একে একে সাজঘরে ফিরলেন কালাম সিদ্দিকি, শেখ পারভেজ জীবন, রিজান হাসান আর সামিউন বসির। চূড়ান্ত ফলাফল? মাত্র ৩৩ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট। স্কোর ১০২/২ থেকে আচমকাই ১৪২/৭। জয়ের উত্তেজনা থেকে বাংলাদেশ শিবিরে ছড়িয়ে পড়ল পরাজয়ের আতঙ্ক। ডাগআউটে হতবাক মুখ। বিহানের বোলিং ফিগার তখন চোখ কপালে তোলার মতো—৪ ওভারে ৪/১৪!
তাঁর স্পিনের ধাঁধায় নেমে আসা ধসটাই গতকাল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যে ম্যাচে ভারত কার্যত হেরে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছিল, সেখানেই জন্ম নেয় প্রত্যাবর্তনের গল্প।
শেষ আঘাত—নাটকীয় সমাপ্তি
বাংলাদেশের শেষ ভরসা অধিনায়ক আজিজুল হাকিম (Azizul Hakim) ধৈর্য ধরে খেলছিলেন। কিন্তু বাঁ-হাতি স্পিনার খিলান প্যাটেলের (Khilan Patel) একটি ভুল বোঝা ফুলটসেই শেষ হয়ে যায় লড়াই। হেনিল প্যাটেল (Henil Patel) টেলএন্ডারদের উপড়ে দিতেই খেল খতম! যদিও আসল নাটক তুলে রাখা ছিল শেষ দৃশ্যের জন্য। ম্যাচের ওন্তিম উইকেট—দূর লং-অন বাউন্ডারিতে দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে ক্যাচ! ধরলেন সেই বিহান মালহোত্রাই। মাঠে উল্লাস। সতীর্থদের জড়িয়ে ধরা। ভারত লড়াই জিতে গেল ১৮ রানে।
ব্যাটে ব্যর্থ, বলে নায়ক
মজার বিষয়, বিহান নিজে ব্যাট হাতে করেছিলেন মাত্র ৭ রান। কিন্তু ক্রিকেট যে ব্যাটিং-বোলিংয়ের হিসেব ছাড়াও মাথার খেলা—কালকের ম্যাচ তার চূড়ান্ত প্রমাণ। আগ্রাসন নয়, শৃঙ্খলাই জিতিয়েছে ভারতকে। এর আগে ইনিংস গড়েছিলেন বৈভব সূর্যবংশী (Vaibhav Suryavanshi) ও অভিজ্ঞান কুণ্ডু। বল হাতে শুরুটা ভালো করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ হাসি হাসল সেই ভারত-ই—একজন অফস্পিনারের অলৌকিক স্পেলের সৌজন্যে। এই জয় শুধু পয়েন্ট হাসিল নয়… চিরায়ত সংস্কারের গল্প। যেখানে হার নিশ্চিত বলে মনে হলেও, ময়দানে অপ্রত্যাশিত কোনও নায়কের একটা স্পেল পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। গতকাল সেই নায়কের নাম বিহান মালহোত্রা।