পটাপট উইকেট তুলেছেন। তারপর ফিরে গেছেন নিজের মার্কে—এই শান্ত অথচ দৃঢ় আত্মবিশ্বাসই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

হেনিল প্যাটেল
শেষ আপডেট: 16 January 2026 13:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উদ্বোধনী দিনে নজর ছিল ব্যাটারদের দিকে। কিন্তু আলো কাড়লেন এক তরুণ পেসার। অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে (U19 World Cup 2026) ভারতের প্রথম ম্যাচে আমেরিকার বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়ে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন হেনিল প্যাটেল (Henil Patel)। বয়স মাত্র ১৮। কিন্তু বোলিংয়ে ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ আর আক্রমণ—সব মিলিয়ে পরিণতির ছাপ একেবারে স্পষ্ট।
৫ উইকেট বদলে দিল ম্যাচের মোড়
বুলাওয়ায়োতে আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের সহজ জয়ের ভিতটা গড়ে দেন হেনিল। মাত্র সাত ওভারে পাঁচ উইকেট। শুরুতেই নতুন বলে নিখুঁত লাইন-লেংথ। সুইং, বিশেষ করে আউটসুইং, মার্কিন ব্যাটারদের বারবার বিভ্রান্ত করে তোলে। যখন বৈভব সূর্যবংশী (Vaibhav Suryavanshi) বা আয়ুষ মাত্রে (Ayush Mhatre) ব্যাট হাতে প্রভাব ফেলতে পারেননি, তখন বোলিং দিয়েই ম্যাচের রাশ টেনে নেয় ভারত। হেনিলের ৫/১৬—অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে সর্বকালের সেরা স্পেলগুলোর অন্যতম। এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে তাঁর আগে শুধু কামাল পাসি (২০১২) আর অনুকূল রায় (২০১৮) এর চেয়ে ভালো পারফর্ম করেছেন।
পাঁচতারা বোলিং। কিন্তু বল ছাড়া হেনিলের উদযাপন ছিল সংযত। বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই। নেই উন্মাদনায় ফেটে পড়া। পটাপট উইকেট তুলেছেন। তারপর ফিরে গেছেন নিজের মার্কে—এই শান্ত অথচ দৃঢ় আত্মবিশ্বাসই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
ডেল স্টেইনের ভক্ত, আক্রমণই মূল মন্ত্র
প্রচারবিমুখ হলেও হেনিল কখনও নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি। তাঁর আদর্শ ডেল স্টেইন (Dale Steyn)। আগ্রাসন, নির্ভীকতা আর ব্যাটারকে চাপে রাখার মানসিকতা—সবটাই দক্ষিণ আফ্রিকার পেস কিংবদন্তির থেকে শেখা। হেনিলের কথায়, ‘ডেল স্টেইনের বোলিং এমন ছিল, যে কোনও ব্যাটারই সহজে খেলতে পারত না। আমিও তেমনই আক্রমণাত্মক থাকতে চাই।’ তবে পার্থক্য এক জায়গায়—স্টেইনের মতো উত্তেজক সেলিব্রেশন নয়, কাজের কাজ নিঃশব্দে করে যাওয়ায় বিশ্বাসী হেনিল।
গতকালের ম্যাচই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথম ওভারে আমরিন্দর গিলের উইকেট। এরপর একের পর এক ভুল শট খেলতে বাধ্য করা, থার্ড ম্যান অঞ্চলে ক্যাচ, ঢিলেঢালা ড্রাইভে ফাঁদ—সবটাই ছিল পরিকল্পিত। এই বয়সে এমন ‘ম্যাচ সেন্স’ খুব কম বোলারের মধ্যেই দেখা যায়।
গুজরাতের গ্রাম থেকে বিশ্বমঞ্চ—হেনিলের লম্বা জার্নি
গুজরাতের ভালসাড় জেলায় জন্ম। বড় হওয়া জুজওয়া নামে ছোট্ট গ্রামে। জনসংখ্যা মেরেকেটে তিন হাজারের কিছু বেশি। সেখানেই স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলতে খেলতে তৈরি হওয়া। ধাপে ধাপে জেলা, রাজ্য, তারপর জাতীয় অনূর্ধ্ব–১৯ দলে জায়গালাভ।
ডানহাতি মিডিয়াম ফাস্ট। নতুন বলে সুইংই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যাট হাতেও অবদান রাখতে পারেন। কোচেদের নজরে, হেনিলের সবচেয়ে বড় গুণ পরিশ্রম আর ধারাবাহিকতা। শরীরী ভাষায় কোনও তাড়াহুড়ো নেই। অ্যাকশন মসৃণ, ফলো-থ্রু পরিষ্কার।
উদ্বোধনী ম্যাচের পর গ্রামে উৎসব। মিষ্টি, বাজি, টিভির সামনে ভিড়। জেলার মাঠ থেকে ছেলের বিশ্বকাপ মঞ্চে সাফল্য—এই নিখাদ আবেগ হেনিলকে শক্তি জুগিয়ে চলে নিরন্তর!
সামনে কী?
তরুণ বোলার নিজেও জানেন, এই পাঁচ উইকেট কেবল শুরু। সামনে বাংলাদেশ আর নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দল। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে নাম আরও ছড়াবে। ভারতের পেস আক্রমণে নতুন মুখ হিসেবে তিনি যে নজরে পড়ে গিয়েছেন, তা বিলক্ষণ টের পেয়েছেন হেনিল। অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ মানেই ভবিষ্যতের দরজা। বুলাওয়ায়োর সাত ওভারের স্পেলই কি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল? সময়ই জবাব দেবে। আপাতত অত দূর দেখতে নারাজ হেনিল। শার্প ফোকাসে আগামী ম্যাচ। লক্ষ্য ফের একবার ‘নীরব ঘাতক’ হয়ে ওঠা।