২০২৭ বিশ্বকাপের পথ দীর্ঘ, কঠিন। এখনই এই বিতর্কে ঢুকে গেলে ক্ষতি শুধু বোর্ডের নয়, দলেরও। বিরাট কি এই স্টাইলে টানা দু-তিন বছর চালিয়ে যেতে পারবেন? তাঁর শরীর কি একই ছন্দ ধরে রাখবে?
.jpeg.webp)
বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 1 December 2025 14:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যাচ শেষের প্রেজেন্টেশনে বারবার ‘মেন্টালিটি'-র কথা বলছিলেন বিরাট। প্রতিতুলনায় এসেছিল ‘শরীর' (সেই সূত্রে ফিটনেসের) প্রসঙ্গও৷ দুইয়ের তুল্যমূল্য লড়াইয়ে প্রথমটিকেই এগিয়ে রাখলেন সেঞ্চুরিয়ান বিরাট কোহলি৷ আর এক অর্থে নাকচ করলেন ফোর্ডের ফরমান: বিশ্বকাপে খেলতে চাইলে ঘরোয়া ক্রিকেটে নামো! বিরাট এবং রোহিত শর্মা দুজনেই যেহেতু টেস্ট ও টি-২০ থেকে অবসর নিয়েছেন এবং সাতাশের বিশ্বকাপের আগে যেহেতু খুব বেশি ওয়ান ডে সিরিজ নেই, তাই বিসিসিআইয়ের নির্দেশ ‘রো-কো' জুটির কেউ-ই মানবেন না—এর সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু বোর্ডের দাবিতে যে সুরে সুর মেলাচ্ছেন না, আকারে-ইঙ্গিতে তা বুঝিয়ে দিলেন বিরাট। কাল, রাঁচির মাঠে দুরন্ত সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে।
এখন প্রশ্নটা সোজা—কে ঠিক? বোর্ড? নাকি বিরাট?
রবিবার ম্যাচের পর কোহলি যা বললেন, তার সার কথা সহজ ভাষায়—তিনি নিজেই জানেন তাঁর শরীর-মন কোন অবস্থায় আছে। ‘প্রস্তুতি’ নামক শব্দটাকে দেখেন অন্য চশমায়। বিরাটের ভাষায়, ‘আমি কখনও বিরাট প্রস্তুতির ভক্ত নই! আমার ক্রিকেট আসলে মানসিকতার খেলা।’ আর এই একটি লাইনই যেন পুরো বিতর্কটা খুলে দিয়েছে। বোর্ড ভাবছে—শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচ দিয়ে ফর্ম ধরা যায় না, সিনিয়রদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে ছন্দে আসা দরকার। আর বিরাটের দাবি—ফর্ম আসে মানসিক জায়গা থেকে। শরীর ঠিক আর মস্তিষ্ক পরিষ্কার থাকলে, ম্যাচ-প্রস্তুতির আলাদা রুটিন লাগে না।
যে বিপুল অভিজ্ঞতা কোহলির, তাতে যুক্তিও আছে। প্রায় সাড়ে তিনশো ওয়ানডে খেলেছেন। পনেরো-ষোলো বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার, সমস্ত ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। নিজের কথাতেই, ‘এক-দেড় ঘণ্টা নেটে ব্যাট করতে পারলে বুঝে যাই সব ঠিক আছে!’ একভাবে দেখলে সেটাও তো ‘প্রস্তুতি’-ই! শুধু বোর্ড যেটা চায়, সেই ধাঁচের নয়।
কিন্তু বিসিসিআইয়ের যুক্তি কি ভুল? যখন ভবিষ্যত পরিকল্পনা চলছে, তখন সিনিয়রদের দৃষ্টান্ত স্থাপন জরুরি। ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁদের উপস্থিতি তরুণদের জন্য বিশাল প্রণোদনা। একইসঙ্গে নির্বাচকরা মাঠে দাঁড়িয়ে দেখতে পান—সিনিয়রদের শরীর কতটা সাড়া দিচ্ছে। এই জায়গা থেকেই উঠে আসে ‘দায়িত্বে’র কথা।
বিরাটের যুক্তিটাও তাই বলে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার নয়। তিনি এখন একটিমাত্র ফরম্যাটে খেলেন। বাকি সময় কাটে কঠোর ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ে। তাঁর বক্তব্য—ফিটনেস আজকাল আর ক্রিকেটের জন্য আলাদা করে কিছু নয়, তাঁর জীবনেরই অংশ। প্রতিদিন সেই শৃঙ্খলায় বাঁচেন। ম্যাচে নেমে দৌড়ঝাঁপ, রিফ্লেক্স—সবই একটা বড় প্রস্তুতির অঙ্গ মাত্র!
বিরাট রাঁচিতে যা দেখালেন, তাতে সন্দেহ নেই—শরীর বা মন, কোনওদিক থেকেই তিনি ক্লান্ত নন। বরং, চাঙ্গা। সপ্রতিভ। ৩৭ বছর বয়সে দাপিয়ে ছুটলেন ২২ গজ। শট-প্লেসমেন্ট নিখুঁত, প্রতিটা বলে মনঃসংযোগ—এগুলো ‘ম্যাচ প্র্যাকটিস’ছাড়া হয় না—এটাই বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। কিন্তু বিরাটের ব্যক্তিগত ব্যাকরণ যেন এর উলটো উদাহরণ। তাঁর কথায়, ‘যতক্ষণ আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত, শরীর ফিট, আর খেলার জন্য উত্তেজনা রয়েছে—ততক্ষণ কোনও সমস্যা নেই!’ এটা স্রেফ রুটিন নয়, তাঁর জীবনের গতি-ও বটে।
এখানেই এসেছে দূরত্ব। বোর্ড চাইছে একই নিয়ম সবার জন্য। বিরাট জানাচ্ছেন—সবার শরীর, সবার মানসিকতা, সবার বয়স এক নয়। তা ছাড়া তিনি যে স্তরে খেলছেন, সেখানে প্রস্তুতির সংজ্ঞাই বদলে গেছে।
যদিও সত্যি একটাই—২০২৭ বিশ্বকাপের পথ দীর্ঘ, কঠিন। এখনই এই বিতর্কে ঢুকে গেলে ক্ষতি শুধু বোর্ডের নয়, দলেরও। বিরাট কি এই স্টাইলে টানা দু-তিন বছর চালিয়ে যেতে পারবেন? তাঁর শরীর কি একই ছন্দ ধরে রাখবে? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কি বিশ্রামই হবে প্রধান শর্ত? নাকি তখন বোর্ডের কথাই মানতে হবে?—এই সব সওয়ালের জবাব মেলা বাকি। একদিকে সিনিয়র খেলোয়াড়ের অধিকার—নিজের শরীর-মন বোঝার অধিকার। অন্যদিকে বোর্ডের কর্তব্য—দলের স্বার্থ দেখা। দুইয়ের সংঘর্ষ কিন্তু বেশ তীব্র।