বিরাট জানেন, চার বছর পর তাঁর বয়স হবে ৩৯-এর কাছাকাছি। ভারতীয় ক্রিকেট এখন তরুণকেন্দ্রিক। তাই জায়গা পাকা রাখতে হলে শুধু অভিজ্ঞতা নয়—‘ইমপ্যাক্ট’ জরুরি!
.jpeg.webp)
বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 1 December 2025 11:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনন্ত চাপ নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন৷ এমনিতেই ধারাবাহিক ক্রিকেটের মধ্যে নেই৷ লাল বল এবং সংক্ষিপ্ততম ফর্ম্যাট থেকে অবসর নিয়েছেন৷ অস্ট্রেলিয়ায় গেলেও প্রথম দু'ম্যাচে খাতা খোলার আগেই আউট। তিন নম্বর ওয়ানডে-তে ৭৪ করলেও ধারাবাহিকতার প্রমাণ দেওয়া জরুরি ছিল। কারণ বিশ্বকাপের আগে অগ্নিপরীক্ষা কম। অথচ রান চাই। সেটাও বিরতি ছাড়া!
রাঁচির ময়দানে তার প্রথম খুঁটি দৃঢ়ভাবে পুঁতে দিলেন বিরাট কোহলি। বোঝালেন, তিনি প্রস্তুত৷ উজ্জীবিত৷ আত্মবিশ্বাসী৷ এবং অবশ্যই বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলানোর উদ্দেশ্যে পালটে ফেলেছেন নিজের খেলার স্টাইলও। সেটা হতে পারে ইনিংস সাজানো সংক্রান্ত, বাউন্ডারি হাঁকানো কিংবা স্ট্রোকপ্লে নিয়ে। ক্রিজের ব্যবহার, পার্টনারশিপ বিল্ড আপ—সবেতেই নয়া ভার্সানে ধরা দিলেন কোহলি!
রাঁচির ইনিংসটা কেন স্পেশ্যাল—এটা বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, বিরাট কোহলি (Virat Kohli) আসলে কী কী বদলালেন। এত বছর ধরে তাঁর ওয়ান ডে ব্যাটিংয়ের যে টেমপ্লেট—ধীরে ধীরে সেট হওয়া, গ্যাপ খুঁজে স্ট্রাইক রোটেট করা, পরে উইকেট পড়ে গেলে চাপ সামলে ম্যাচ টেনে নেওয়া—রাঁচিতে সেটা দেখা গেল না। এখানে তিনি প্রথম পাঁচ ওভারের মধ্যেই দু’খানা ছয় মারলেন, পেসারদের বিরুদ্ধে স্ট্রোক মেরে লেংথ নষ্ট করলেন আর শুরুতেই বুঝিয়ে দিলেন—আজ তিনি ড্রাইভিং সিটে!
এই আগ্রাসন এতদিনকার আগ্রাসনের তুলনায় আলাদা। হঠাৎ আসেনি। পুরোটা হিসেব কষে করা প্ল্যান। কারণ বিরাট জানেন, এখন তাঁর পজিশনে প্রতিযোগী কম না—শ্রেয়াস (Shreyas Iyer), তিলক (Tilak Varma), গিল (Shubman Gill)—অনেকেই দলের ‘ভবিষ্যৎ’ হিসেবে লাইন-আপের ওয়ান ডাউনে খেলার অপেক্ষায়। তাই ‘এঙ্কর' রোল ধরে রেখে ‘আর্লি ইমপ্যাক্ট' যোগ করা—এটাই হয়ে উঠেছে তাঁর নতুন অস্ত্র।
রাঁচির ইনিংস এই কারণে আরও গুরুত্বপূর্ণ—এটা কোহলির বর্ণাঢ্য কেরিয়ারের মাত্র তৃতীয় ইনিংস, যেখানে তিনি ৭টা ছয় মেরেছেন (Seven Sixes)। বাকি দুটো ছিল তাঁর সবচেয়ে বিস্ফোরক নক—জয়পুর ২০১৩ (vs Australia) আর তিরুবনন্তপুরম ২০২৩ (vs Sri Lanka)। অর্থাৎ, এই গিয়ারটা তিনি আকছার অন-অফ করেন। এবার কিন্তু মনে হল, বদলটাকেই স্থায়ী করতে চাইছেন।
আরও একটা বড় পরিবর্তন—একই লেন্থে তিন দিকেই শট খেলা! একটা ফুল বলকে তিনি কখনও লং অফে তুলে দিলেন, কখনও লং অনে, আবার সেটা থেকেই মিডউইকেটে ‘হুইপ’! মানে বোলারের কোনও পূর্বানুমান নেই। বিপক্ষ যখন ডিফেন্সিভ ফিল্ড সাজাচ্ছে ‘পুরনো’ কোহলির জন্য, তখন নতুন কোহলি সেটা ভেঙে দিচ্ছেন!
তার উপর, এই পিচ ব্যাটসম্যানদের পক্ষে ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার পেসাররা হিট-দ্য-ডেক করে বাউন্স তুলছিলেন। যে কারণে বিরাট সামনে এগিয়ে বোলারের লেংথ করে দিলেন এলোমেলো। ব্যাকফুট পাঞ্চ, ফ্রন্টফুট লফট, কভার ড্রাইভ—সবই সোজা ব্যাটে। এটাই তাঁর ব্যাটিংয়ের ক্লাসিক সৌন্দর্য—আক্রমণাত্মক হলেও শটের নান্দনিকতা নষ্ট হয়নি।
কালকের ইনিংসটাকে আরও সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে তাঁর পার্টনারশিপ। রোহিত (Rohit Sharma) এখন একটু ঝুঁকিহীন রোল খেলছেন—দীর্ঘক্ষণ নেটে থাকা, স্থির থেকে দলকে প্ল্যাটফর্ম দেওয়া। দুজনে মিলে যে ১৩৬ রানের পার্টনারশিপ তৈরি করলেন, সেটা দেখিয়ে দিল—সিনিয়ররা এখনও ‘ডিলিভারি মেশিন’! এই জুটি থাকলে তরুণেরা চাপে পড়ে না—বড় ম্যাচে যা অমূল্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিরাট আগ্রাসী শট খেললেও নিজের ‘ডিসিপ্লিন’ হারাননি। রান নেওয়ার গতি, এক-কে দুইয়ে পরিণত করার শিল্প, চাপের মধ্যে ঠান্ডা মাথা—সবই এসেছে স্বাভাবিক ছন্দে। ফারাক শুধু একটাই—এবার বাউন্ডারি তাঁর ব্যাকআপ প্ল্যান নয়, বরং প্রধান পরিকল্পনার অংশ।
পাশাপাশি আরও একটা দিক—ফিটনেস। এত দৌড়, এত ব্যাট কন্ট্রোল—দেখেই বোঝা যায় তিনি এখনও শারীরিকভাবে শীর্ষে। টিম ম্যানেজমেন্টও বুঝবে—যদি তাঁকে রোটেশন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলে ২০২৭ পর্যন্ত সহজেই খেলতে পারবেন।
এর পিছনে কি আরও বড় ছবি আছে? উত্তর: হ্যাঁ। স্পষ্ট করে বললে—২০২৭ বিশ্বকাপ (2027 World Cup)। এই বয়সে এসে কোনও ক্রিকেটার নিজেকে বদলান না, যদি না তাঁর সামনে স্পষ্ট লক্ষ্য থাকে। বিরাট জানেন, চার বছর পর তাঁর বয়স হবে ৩৯-এর কাছাকাছি। ভারতীয় ক্রিকেট এখন তরুণকেন্দ্রিক। তাই জায়গা পাকা রাখতে হলে শুধু অভিজ্ঞতা নয়—‘ইমপ্যাক্ট’ জরুরি! রাঁচি থেকে যার যাত্রা শুরু হল। ধোনির শহরের ময়দানই হতে পারে বিরাট কোহলির ওয়ানডে কেরিয়ারের অন্তিম অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠা।