স্মিথের ভাষায়, ‘গিবসের ইনিংস অবিশ্বাস্য, পন্টিংয়েরও। শেষ বলে ফিনিশ, আবেগের ঢেউ—ওয়ান্ডারার্সে ওইদিন যা হয়েছিল, তা সর্বকালের সেরা ওয়ানডে!’ ইতিমধ্যে দু’দশক পেরিয়ে গিয়েছে। বিজয়ী অধিনায়কের কথাটা আজও মিথ্যে মনে হয় না।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 12 March 2026 14:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা দলের গায়ে জন্মলব্ধ জড়ুলের মতো লেগে রয়েছে ‘চোকার্স’ তকমা। প্রভূত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও হাইভোল্টেজ ম্যাচে বা টুর্নামেন্টের অন্ত্যপর্বে অনিবার্যভাবে হেরে আসা থাকা—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জয়ের সুযোগ হেলায় ভাসিয়ে দিয়ে! কখনও কোনও তারকার শিশুসুলভ ভুল, কখনও গোটা দলের ট্র্যাজিক পতন—তীরে এসে তরী ডোবানোর ট্র্যাডিশন কিছুতেই দূর করতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট টিম৷ প্রচুর গালমন্দ, বিস্তর সমালোচনা, মনোবিদ নিয়োগ থেকে কোচ বদল—সব হয়েছে। কিন্তু অস্বস্তির ইতিবৃত্ত বদলানো যায়নি!
চাকাটা ঘুরেছিল একবার৷ এক ম্যাচের জন্য। আজ থেকে পাক্কা কুড়ি বছর আগে। ভেন্যু: জোহানসবার্গ৷ প্রতিপক্ষ: দুর্ধর্ষ অস্ট্রেলিয়া। টার্গেট: ৪৩৫ রান৷ বড় লক্ষ্য: সিরিজ বিজয়৷ টি-২০ ক্রিকেট চালু হওয়ার আগের জমানায়, যখন চারশো পেরনোকে জয়ের আগাম ইঙ্গিত বলে মনে করা হত, তখন সমস্ত প্রতিকূলতা আর মানসিক চাপের বলয় ভেঙে ৪৩৪ হাঁকানো অজিদের ঘোল খাইয়েছিল প্রোটিয়ারা। জিতে নিয়েছিল রুদ্ধশ্বাস লড়াই৷ সিরিজ হাতে এসেছিল৷ কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যেটা: অন্তত একদিনের জন্য হলেও চোকার্স অপবাদ হটিয়ে বিশ্বক্রিকেটের সম্ভ্রম আদায় করেছিল স্মিথের টিম আফ্রিকা!
পন্টিংয়ের ব্যাটে রেকর্ড, অজিদের ৪০০ পার
ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাটিং নেয় অস্ট্রেলিয়া। প্রথম থেকেই রান উঠতে থাকে ঝড়ের গতিতে। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট (Adam Gilchrist) ৫৫-তে ফিরলেও ব্যাটন তুলে নেন সাইমন কাটিচ। হাঁকান ৭৯ রান। ইনিংসের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠেন রিকি পন্টিং (Ricky Ponting)। একাই তোলেন ১৬৪। শেষদিকে সঙ্গত মাইকেল হাসির, অপরাজিত থেকে যোগ করেন ৮১ রান। যার সুবাদে ৫০ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৪৩৪/৪—সেই সময়ের নিরিখে ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলগত সংগ্রহ।
শোনা যায়, ড্রেসিংরুমে আসার পর দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটাররা ফ্যালফ্যাল করে স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায়, অনেকে হেসে ওঠেন। যদিও সেই মুহূর্তে হাসি না পেয়ে উপায়ও ছিল না!
গিবসের ১৭৫-এ রান চেজ শুরু
খানিক বাদে দক্ষিণ আফ্রিকা মাঠে নামে। পরের ইনিংস শুরু হয়। আর শুরু হতেই প্রথম বল থেকে আক্রমণের ইঙ্গিত ছুড়ে দেন অধিনায়ক স্মিথ (Graeme Smith)। ৯০ রান করেন দুরন্ত গতিতে। কিন্তু তাঁকে ছাপিয়েও ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন হার্সেল গিবস (Herschelle Gibbs)। অজি বোলারদের নির্মম কায়দায় কচুকাটা করতে থাকেন। কাউকে সেদিন রেয়াত করেননি ডান হাঁতি ওপেনার। স্মিথের সঙ্গে জুটিতে ওঠে ১৮৭ রান। গিবস থামেন ১৭৫-এ। যাকে আজও ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে মনে রাখা হয়!
অস্ট্রেলিয়া শিবিরে তখন ভোম্বল দশা! বল গড়াচ্ছে, রান উঠছে, উত্তেজনা বাড়ছে। শেষ কয়েক ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার আস্কিং রেট ছিল ঊর্ধ্বগামী। কিন্তু উইকেট পড়লেও সেদিন গতি থামেনি। শেষ বলে মার্ক বাউচার (Mark Boucher) যখন উইনিং শট খেলেন, স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করে ফুটে ওঠে: ৪৩৮/৯। এক উইকেটে জয় ছিনিয়ে নেয় প্রোটিয়ারা। তাও এক বল বাকি থাকতে!
৮৭২ রান, ৮৭ চার, ২৬ ছক্কা
পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলের মোট রান ৮৭২। যা ওয়ানডে ইতিহাসে এখনও সর্বোচ্চ। ম্যাচে মোট ৮৭টি চার ও ২৬টি ছক্কা। দুই শিবিরের বোলাররা এতটাই অসহায়, যে প্রতিটি ওভারে বাউন্ডারির বন্যা দেখা ছাড়া সেদিন বিকল্প উপায় ছিল না। পাঁচ ম্যাচের সিরিজের শেষ ওয়ানডে। জিতে ৩-২ ব্যবধানে ট্রফি নিজেদের ক্যাবিনেটে তোলে দক্ষিণ আফ্রিকা।
স্মিথের স্মৃতিচারণ
বছর কয়েক বাদে এক সাক্ষাৎকারে স্মিথ সেদিনের গল্প বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, অস্ট্রেলিয়া ইনিংস শেষ করার পর ড্রেসিংরুমে এসে জ্যাক ক্যালিস নাকি রসিকতার ছলে বলেছিলেন, ‘অজিরা আসলে ১৫ রান কম করেছে!’ শুনে সাজঘরের সবাই হেসেছিলেন। কিন্তু অলক্ষ্যে, অসচেতনভাবে হাসির মধ্যেই—কীভাবে তাড়া করতে হবে—তার সংকল্পও নেওয়া হয়েছিল সেদিন।
স্মিথের ভাষায়, ‘গিবসের ইনিংস অবিশ্বাস্য, পন্টিংয়েরও। শেষ বলে ফিনিশ, আবেগের ঢেউ—ওয়ান্ডারার্সে ওইদিন যা হয়েছিল, তা সর্বকালের সেরা ওয়ানডে!’ ইতিমধ্যে দু’দশক পেরিয়ে গিয়েছে। বিজয়ী অধিনায়কের কথাটা আজও মিথ্যে মনে হয় না।