সাসারাম, দুর্গাপুর, লখনউয়ের অন্ধকার পেরিয়ে এজবাস্টনে ফিনিক্সের মতো উড়েছেন। জীবনের তালে তালে চলেছেন। ছন্দ হারানানি।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 8 July 2025 12:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রিয় গায়ক মহম্মদ রফি। প্রিয় গান ‘ম্যায় জিন্দেগি কা সাথ নিভাতা চলা গ্যায়া’। সাসারাম থেকে দিল্লি হয়ে দুর্গাপুর। শেষতক কলকাতা… বাংলা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি উত্থানে আর পতনে অপ্রত্যাশিত ম্যাজিক দেখেছেন আকাশ দীপ৷
আর কী বাকি থাকে? মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রথমে বাবা। তারপর দাদা—দুজনকেই হারান। বিহার ক্রিকেট অ্যাকাডেমি থেকে বহিষ্কৃত হন৷ পারিবারিক বিপর্যয়ে ঠিক করেন খেলা ছেড়ে দেবেন। ‘তাহলে খাবি কী করে? পেট চলবে কীভাবে?’ কাছের বন্ধু বৈভবের রাগত স্বরে প্রশ্নের ঝাঁজালো জবাব ফিরিয়ে দেন আকাশ দীপ: ‘প্রয়োজনে ট্রাক চালাব। অভাবে মরব না!’
জীবনের সঙ্গে হাতে হাত, পায়ে পা মিলিয়ে চলতে চেয়েছেন। তাই প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জবাব দৃঢ়মুষ্টির কাউন্টার পাঞ্চে ফিরিয়ে দিয়েছেন আকাশ দীপ। এদেশ, সে দেশ ঘুরে কলকাতা এসেছেন। আনন্দের শহর তিলোত্তমা এক স্বপ্নমেদুর যুবকের ভবিষ্যৎ বুনে দিয়েছে। যার শুরু হয় ময়দানের খেপ খেলায়। প্রথমে বিনা পারিশ্রমিকে। তারপর যৎসামান্য অর্থপ্রাপ্তি। কখনও দুশো, কখনও তিনশো। কিন্তু আকাশ জানতেন, এই মুহূর্তে তাঁর দরকার সুযোগ। টাকা নয়, নিরাপত্তা নয়, দাক্ষিণ্য নয়। স্রেফ সুযোগ৷ সেটা মিললেই উপরওয়ালা মুখ তুলে চাইবেন।
ভুল ভাবেননি আকাশ। ময়দানের ছাপোষা টুর্নামেন্টই রং বদলে দেয়। চোখে পড়েন অরুণ লালের, সেই সময় বাংলা রঞ্জি টিমের কোচ। বুঝেছিলেন, আকাশ কাঁচা হতে পারে। কিন্তু খাঁটি। ঝাড়াইবাছাই করলে, একটু সংশোধন একটু পরিমার্জন করলে ফল মিলবে!
এই প্রতিশ্রুতির উপর বিশ্বাস রেখেই তরুণ পেসারকে জায়গা দেন৷ তাও কিনা অশোক দিন্দার মতো পোড়খাওয়া বোলারকে বসিয়ে। ম্যানেজমেন্টের উল্টোস্রোতে হেঁটে!
এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে হয়নি আকাশকে। মিলেছে আইপিএলে সুযোগ৷ জাতীয় দলে অভিষেক—সেই মওকাও হাতছাড়া হয়নি। এজবাস্টনের বাইশ গজে তুবড়ি ছোটালেন—সেও তো পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা। বুমরাহ খেললে জার্সি গায়ে নামাই হত না আকাশের। কিন্তু হাতে আসা চোদ্দোকে যে ষোলো আনা করে তুললেন, তার কৃতিত্ব না কোনও কোচের, না কোনও সুহৃদের… স্রেফ এবং স্রেফ আকাশ দীপের!
আর এই গোটা জার্নিটা যিনি চোখের সামনে থেকে দেখেছেন, তিনি বৈভব কুমার। আকাশের অভিন্নহৃদয় বন্ধু। চেয়েছিলেন বড় ক্রিকেটার হতে। কিন্তু পারেননি। তবু বিকল্প পেশা হিসেবে ব্যবসা নয়, একান্ত প্যাশনের জোরে রয়ে গিয়েছেন ক্রিকেটেই। সামলান আকাশের অ্যাকাডেমি। সাসারামে। সেই সাসারাম যেখানকার এক অন্ত্যজ গ্রামে বেড়ে উঠেছেন এই মুহূর্তে দেশের সবচাইতে চর্চিত ক্রিকেটার।
‘আমি জানি না, রফির গান ওকে কেমন আনন্দ দেয়। ‘জো মিল গ্যায়া উসি কো মুকাদ্দার সমঝ লিয়া’ (যা জুটেছে তাকেই সৌভাগ্য হিসেবে মেনে নিয়েছি) ওর প্রিয় লাইন৷ হয়তো এই গানই ওকে শান্তি দেয়, সুখে রাখে।’—বক্তব্য বৈভবের৷
ভুল বলেননি। পরিশ্রম করেছেন ঠিকই। ধাক্কা খেয়েও স্বপ্নের থেকে দূরে সরে যাননি। কিন্তু ভাগ্যের অমোঘ সংকেতকেও অবজ্ঞা করেননি আকাশ। নয়তো কী করে বলতে পারেন, ‘আন্তর্জাতিক ভুলে যান, চমড়ার বলের ক্রিকেট খেলার কোনও স্বপ্নও ছিল না। আমার কাছে খেলা ছিল মরুভূমিতে একবিন্দু জল খোঁজার মতো বিষয়!’?
দিদি, যিনি সম্প্রতি লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত, থাকতেন লখনউয়ে। একদিন তাঁর বাড়ি পৌঁছে যান আকাশ৷ ভর্তি হন মদন লালের অ্যাকাডেমিতে। কিন্তু ঠাটবাট দেখে মোহভঙ্গ হয়। স্বপ্নজয়ের যাত্রা শুরুর আগেই থমকে যান। জানিয়ে দেন, ক্রিকেট খেলা তাঁদের মতো গরিবদের কম্ম নয়। ক্রিকেট বড়লোকদের খেলা!
কিন্তু এই সময় হাতের মুঠি শক্ত করে ধরে রাখেন বন্ধু বৈভব। পরামর্শ দেন এগিয়ে যাওয়ার। প্রথমে দুর্গাপুর৷ তারপর কলকাতা। আরও একবার, হয়তো শেষবার চেষ্টা করে দেখা যাক। এই কথায় জোর পান আকাশ। চলে আসেন কলকাতা। কার্যত নামেমাত্র টাকায় এদিক-ওদিক খেলার পর ভিডিওকন ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে নাম লেখান। ট্রায়াল দেন৷ সিলেক্টেড হন৷
আর প্রথম টুর্নামেন্ট খেলতে নেমেই তুফান তোলেন। ৪৫ উইকেট নিয়ে বাংলার কোচ অরুণ লালের নজরে আসেন৷ ২০১৯-২০ মরশুমের রঞ্জিতে নামেন। মাত্র ৯ ম্যাচে তুলে নেন ৩৫ উইকেট। এই পারফরম্যান্সই বদলে দেয় আকাশের জীবন।
‘একদিন ওকে বলেছিলাম, ‘তুই জানিস, চাইলে কত কী করতে পারিস?’ আমার প্রশ্ন শুনে আকাশ বলেছিল, ‘স্যার রঞ্জি খেলে নিয়েছি। ব্যাস, আর কিছু চাই না!’ এই জবাব শুনে আমি টানা ৪৫ মিনিট ধরে ওকে যা নয় তা বলেছিলাম। কেঁদে ফেলেছিল আকাশ। মনোজ তিওয়ারি এসে আমায় সরিয়ে দেয়। কিন্তু যাওয়ার আগে আমি বলে যাই, ‘তুই এখনই এত ভাল যে চাইলেই কোনও না কোনও আইপিএল টিম তোকে ১০ কোটিতে কিনে নেবে। আর যদি আরও পরিশ্রম করিস, আগামীতে জাতীয় দলে জায়গাও করে নিতে পারবি!’
গুরু অরুণ লালের কথা ভুল ছিল না। তাঁর ধমকের মান রেখেছেন আকাশ। সাসারাম, দুর্গাপুর, লখনউয়ের অন্ধকার পেরিয়ে এজবাস্টনে ফিনিক্সের মতো উড়েছেন। জীবনের তালে তালে চলেছেন। ছন্দ হারানানি।
আকাশ ছন্দ হারায় না!