ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, স্বজনবিয়োগের বেদনা নতুন নয়। আগেও তুষের আগুনের মতো পুড়িয়েছে আকাশকে। ২০১৫ সাল। মারা যান রামজি সিং, আকাশের বাবা। মাত্র ছ’মাস বাদে মৃত্যু হয় দাদারও।

আকাশ দীপ
শেষ আপডেট: 7 July 2025 12:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র এক মাস আগের ঘটনা।
দিদির ক্যানসার ধরা পড়ার পর হাসপাতাল থেকে নার্সিংহোম ছুটে বেড়াচ্ছেন আকাশ দীপ। আইপিএলে খেলতে পারেননি চোটের জন্য। জাতীয় দলে সুযোগ পাবেন কি না ঠিক নেই। এরই মধ্যে ব্যক্তিগত দুর্যোগ। দিদির ক্যানসার… দিদি যদি ছেড়ে চলে যায়?
ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, স্বজনবিয়োগের বেদনা নতুন নয়। আগেও তুষের আগুনের মতো পুড়িয়েছে আকাশকে। ২০১৫ সাল। মারা যান রামজি সিং, আকাশের বাবা। মাত্র ছ’মাস বাদে মৃত্যু হয় দাদারও। এক বছরে দুজনের আকস্মিক চলে যাওয়া কতটা বিধ্বস্ত করেছিল বিহারের অখ্যাত গ্রাম থেকে উঠে আসা পেসারকে?
রোহতাসের বসতবাটিতে বসে পুরনো সাক্ষাৎকারে আকাশ জানিয়েছিলেন কামব্যাকের কাহিনি। বলেন, ‘আমি জানতাম বাবা ও দাদাকে হারানোর পর আমায় কিছু না কিছু করতে হবে। তাই ক্রিকেট থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিই!’ গত বছর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অভিষেক টেস্টে তিন উইকেট নেওয়ার পর ছেড়ে আসা জীবনকে মনে করে আকাশ বলেন, ‘বাবা যতদিন বেঁচেছিলেন, আমি কিছুই করে দেখাতে পারিনি। তাই এই পারফরম্যান্স বাবার জন্য!’
বল কিংবা ব্যাট হাতে নামামাত্র সবার স্বপ্ন থাকে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলা। আকাশেরও ছিল। কিন্তু সুযোগ জোটেনি। বেড়ে ওঠা নিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘ক্রিকেট নিয়ে সেভাবে চর্চা ছিল না। আমি ২০০৭ সালে টেনিস ক্রিকেট খেলতাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে সিরিয়াস হই ২০১৬ সালে। তবে থেকে মহম্মদ সামি এবং কাগিসো রাবাদাকে অনুসরণ করে চলেছি। এই সময় বাংলা টিম আমায় সাহায্য করে। পরিবারও পাশে দাঁড়ায়!’
বাংলা টিমে হঠাৎ করে উঠে এলেন কীভাবে? স্মৃতিচারণে সেই সময়কার রঞ্জি দলের কোচ অরুণ লাল বলেন, ‘প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম, আকাশ খাঁটি সোনা। এই নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। ওর গতি, সামর্থ্য, শক্তি—সবকিছু রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, কোনওদিন কোনওকিছু নিয়ে অভিযোগ করেনি।’
বিহার ছেড়ে কলকাতায় এলেন ঠিকই। কিন্তু ক্রিকেট খেলতে গেলে তো অতিসীমিত অর্থে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে! হাতে রেস্ত কম, অথচ যাতায়াত, খাওয়াদাওয়ার খরচ রয়েছে। এর জন্য সিএবির ডরমিটরিতে থাকা শুরু করেন। যা সত্যি বলতে সেই সময় থাকার অযোগ্য ছিল। খেতেন ক্যান্টিনে। কোনওদিন ভাল খাবার মিলত, কোনওদিন মিলত না। কিন্তু এই নিয়ে কোনও অভিযোগ তোলেননি আকাশ।
অথচ তোলার কথা ছিল। অন্তত এমনটাই মত অরুণ লালের। তাঁর কথায়, ‘আমি একদিন ডরমিটরি দেখতে গেছিলাম। সত্যি বলছি ওটা নরক, থাকার অযোগ্য। মনে হচ্ছিল, সুস্থ মানুষও এখানে থাকলে রোগে ভুগে মারা যাবে!’
তবু ঘুরে দাঁড়ান আকাশ। স্রেফ হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর অপরাজেয় জেদকে মূলধন করে। অরুণ বলেন, ‘আকাশ খুবই শক্ত মনের ছেলে। ওর সঙ্গে যারা খেলত, সবার চাইতে মানসিকভাবে শক্তিশালী, শারীরিকভাবে কর্মঠ। ওর গ্রামে একটা টিলা ছিল। চারপাশে ঘন জঙ্গল। আকাশ বাড়ি গেলেই সেই টিলায় ছুটে উঠত আর নামত। পরে আমায় সেসবের ভিডিও দেখাত!’
বিহার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে নিষিদ্ধ একজন তরুণ খেলোয়াড় ভিন রাজ্যে খেলতে ছুটে এলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে বাবা ও দাদাকে চোখের সামনে চলে যেতে দেখলেন। অবসাদে ক্রিকেট থেকে গুটিয়ে নিলেম নিজেকে… তাও দিন নয়, মাস নয়… বেশ কয়েক বছরের জন্য। আইপিএলে যখন চোটের কারণে নামতে পারলেন না তখনই খবর এল, দিদি ক্যানসার আক্রান্ত! এর একমাস বাদে এজবাস্টনে নামার অপ্রত্যাশিত সুযোগ এবং কেল্লাফতে!
ক্রিকেট সত্যি অনিশ্চয়তার খেলা!