‘প্রেসিডেন্ট’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য বিচলিত নন। জানিয়েছেন, এখনই রিভিউ নয়। কিন্তু সমর্থকদের একাংশের বক্তব্য, এই ব্যর্থতা নিয়ে একটা খোলামেলা আলোচনা তো অন্তত হওয়া উচিত।
.jpeg.webp)
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও মহম্মদ সামি
শেষ আপডেট: 20 February 2026 12:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রঞ্জি ট্রফির (Ranji Trophy) সেমিফাইনালে আবার থমকে গেল বাংলা। ঘরের মাঠে এগিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য পরাজয়! তবু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের (CAB) সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly) স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এখনই কোনও রিভিউ বা ‘ময়নাতদন্ত’ হবে না। তাঁর যুক্তি—একটা ম্যাচ খারাপ খেললেই এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন উঠছে, এটা কি সত্যিই শুধু ‘একটা ম্যাচে’র গল্প?
৯৯ রানে ধস: খেলার মোড় কোথায় ঘুরল?
সেমিফাইনালে জম্মু ও কাশ্মীরের (Jammu & Kashmir) বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ২৮ রানের লিড। মহম্মদ সামি (Mohammed Shami) একাই তুলে নেন ৮ উইকেট (৮/৯০)। সেই পারফরম্যান্স অনেকটাই এগিয়ে রাখে বাংলাকে। স্বাভাবিকভাবে আশা ছিল, ব্যাটসম্যানেরা এবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে নেবেন।
কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়! ২৫.১ ওভারে ৯৯ রানে অলআউট গোটা টিম। এটাই টার্নিং পয়েন্ট। যে পিচে দুই দল প্রথম ইনিংসে তিনশোর বেশি করেছে, সেখানে এমন ধস ব্যাখ্যাতীত। যার জেরে সামির পরিশ্রম, সুদীপের ম্যারাথন ইনিংস—সব চাপা পড়ে গেল, মাশুল গুনল গোটা টিম।
বস্তুত, এটা নকআউট ম্যাচে বাংলার প্রথম ভাঙন নয়। ২০১৬-১৭ মরসুমে দিল্লির বিরুদ্ধে ৮৬ অলআউট। ২০২১-২২-এ মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ৫৪/৫। দুঃস্বপ্নের ইতিহাস যেন বারবার তাড়া করে চলেছে!
ফিল্ডিং সেট-আপে গলদ, ‘প্ল্যান বি’ কই?
শুধু ব্যাটিং নয়, কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন জমেছে। অভিমন্যু ঈশ্বরনের (Abhimanyu Easwaran) অধিনায়কত্বে ফিল্ড সেটিং বরাবর রক্ষণাত্মক। মহম্মদ সামি, আকাশ দীপ (Akash Deep), মুকেশ কুমারের (Mukesh Kumar) মতো পেসার বল করছেন, অথচ দুই স্লিপের পাশে গালি উধাও! কখনও একটাই স্লিপ। ব্যাটের কানায় লেগে বল গলে যাচ্ছে ফাঁকা জায়গা দিয়ে। গোটা ম্যাচে জম্মু-কাশ্মীর তিন বার চাপে পড়েছিল—১৩/৩, ১৫৬/৫, ২৩১/৮। প্রত্যেকবারই তারা পাল্টা আক্রমণে খেলায় ফেরে। কয়েকটা বাউন্ডারির পরই ফিল্ড ছড়িয়ে দেওয়া হয়। চাপটা ধরে রাখার চেষ্টা কোথায়?
আরও বড় প্রশ্ন, যখন পেসাররা ওভারপিছু চার রান করে দিচ্ছেন, তখন বাঁ-হাতি স্পিনার শাহবাজ আহমেদকে (Shahbaz Ahmed) কেন মাত্র ১২ ওভার বল করানো হল? তাঁর ইকোনমি ২.৩৬। স্পষ্টতই কার্যকর। তবু বেশি ব্যবহার করা হল না। ‘প্ল্যান বি’ নামক বস্তু কি আদৌ ছকে রেখেছিল বাংলার টিম ম্যানেজমেন্ট?
ব্যাটিং অর্ডারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস?
অলরাউন্ডার সুরজ সিন্ধু জায়সওয়ালকে (Suraj Sindhu Jaiswal) প্রথম ইনিংসে চার নম্বরে, দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ নম্বরে পাঠানো হয়। অথচ তাঁর স্বাভাবিক জায়গা আট নম্বর। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ব্যাটিং গড় ১৯.১৮। আর এই পরীক্ষার ফল—২০, ০ এবং ১৪! স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত ব্যাটারদের অনেক পরে নামতে হয়েছে। চাপের মুহূর্ত কি পরীক্ষার সময়? নাকি এটা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসকে চিনিয়ে দেয়?
গোদের উপর বিষফোঁড়া বিকল্প উইকেটকিপার-বিতর্ক! অভিষেক পোড়েল (Abishek Porel) চোট পাওয়ার পর হাবিব গান্ধীকে (Habib Gandhi) সুযোগ দেওয়া হল। যিনি সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে সহজ ক্যাচ ফসকেছেন! ম্যাচের মোড় কি সেখানেই ঘুরে যায়নি?
‘একটা ম্যাচ’ নাকি দীর্ঘমেয়াদি ট্রেন্ড?
বাংলার সমস্যা শুধু লাল বলে নয়। সাদা বলের সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি (Syed Mushtaq Ali Trophy) ও বিজয় হজারে ট্রফি (Vijay Hazare Trophy)—দু’টো টুর্নামেন্ট থেকেই গ্রুপ পর্বে বিদায় নিতে হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যর্থতা বহুমুখী। ১৯৮৯-৯০ মরসুমে শেষ রঞ্জি জয়ের পর থেকে বারবার খালি হাতে ফেরা। রানার্স-আপ ১৩ বার। যে কারণে সওয়াল উঠছে—এই ব্যর্থতা কেবল ‘দুর্ভাগ্য’, নাকি ঘাটতি রয়েছে মানসিকতা, পরিকল্পনাতেও?
‘প্রেসিডেন্ট’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly) অবশ্য বিচলিত নন। জানিয়েছেন, এখনই রিভিউ নয়। কিন্তু সমর্থকদের একাংশের বক্তব্য, এই ব্যর্থতা নিয়ে একটা খোলামেলা আলোচনা তো অন্তত হওয়া উচিত। কোচ, অধিনায়ক, ম্যানেজমেন্ট—সবার সঙ্গে বসে অকপট বিশ্লেষণ! ক্রিকেটে ভুল হতেই পারে। কিন্তু ত্রুটি থেকে শিক্ষা না নিলে সংশোধন কীভাবে সম্ভব? বাংলার পেস আক্রমণ দেশের মধ্যে অন্যতম সেরা। কিন্তু ম্যাচ জেতাতে লাগে ১১ জনের তুল্য অবদান, সঠিক কৌশল আর স্নায়ুর জোর। সেমিফাইনালে এই তিনটিতেই ঘাটতি ছিল। ময়নাতদন্ত না করলেও এতকিছুর অন্তর্দর্শন সম্ভব? নাকি আবারও ‘ভাল খেলেও হেরে যাওয়া’র আত্মতুষ্টি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাইছে সিএবি?