জম্মু-কাশ্মীরের কাহিনি শুধু ক্রিকেটীয় উন্নতির নয়, এটা মানসিকতারও অভিমুখ বদল। আগে হার এড়ানো ছিল একমাত্র টার্গেট। এখন যে কোনও মূল্যে জয় ছিনিয়ে নেওয়া।

জম্মু ক্রিকেট টিম
শেষ আপডেট: 19 February 2026 12:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রঞ্জি ট্রফির (Ranji Trophy) ইতিহাসে ৬৬ বছর মাঠে পা রেখেছে। এতদিনে প্রথম ফাইনাল। জম্মু-কাশ্মীর (Jammu & Kashmir), যারা একসময় উত্তর জোনের ‘খেলো প্রতিপক্ষ’বলে পরিচিত ছিল, এবার তারাই শক্তিশালী বাংলাকে হারিয়ে শিরোপার মাত্র এক ধাপ দূরে। অনেকেই চমকিত, কেউ কেউ হতবাক! কিন্তু দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটকে কাছ থেকে দেখেন যাঁরা, তাঁদের চোখে, এই রূপান্তর হঠাৎ নয়। পরিকল্পনা আর ধারাবাহিকতার ফল।
৭১/৪ থেকে ফাইনাল—ভয়ের বদলে বিশ্বাস
কল্যাণীতে হাইভোল্টেজ সেমিফাইনাল। লক্ষ্য ১২৬। স্কোর ৭১/৪। চাপে দল। সেই সময় নামলেন আবদুল সামাদ (Abdul Samad)। করলেন ২৭ বলে ৩০। ব্যাট থেকে বেরল তিনটি সুবিশাল ছক্কা। ম্যাচ ঘুরে গেল। প্রথম ইনিংসেও অধিনায়ক পরশ দোগরার (Paras Dogra) সঙ্গে তাঁর ১৪৫ রানের জুটি ভিত গড়ে দেয়।
দোগরা—১০ হাজার ফার্স্ট ক্লাস রানের মালিক—দলে এসেছেন কোচ অজয় শর্মা (Ajay Sharma) ও তৎকালীন সভাপতি মিঠুন মানহাসের (Mithun Manhas) উদ্যোগে। তাঁর শান্ত স্বভাব দলকে স্থিরতা দিয়েছে। জম্মুর ক্রিকেটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিক ভারসাম্য। যার ফল দেখা যাচ্ছে ময়দানের পারফরম্যান্সে। এই মরসুমে দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, বাংলা—কঠিন প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে জয়। আগের মরসুমেও মুম্বইক-নিধন! বার্তা স্পষ্ট—তারা আর ভয়ে কুঁকড়ে থাকা দল নয়, বুক চিতিয়ে লড়াই করতে শিখেছে।
কোচিং রুমে শৃঙ্খলা, ময়দানে স্পর্ধা
দলের রূপান্তরের পেছনে শক্ত কোচিং সেট-আপ। অজয় শর্মা (Ajay Sharma) ধাতে কড়া। জয়-পরবর্তী উদ্যাপনেও শৃঙ্খলার ছাপ স্পষ্ট। বোলিং কোচ পি কৃষ্ণ কুমার (P Krishna Kumar)—এনসিএ-তে (NCA) ১৫ বছর পেসারদের অ্যাকশন ঘষামাজা করেছেন। ফিল্ডিং কোচ দিশান্ত ইয়াগনিক (Dishant Yagnik) ফিটনেসে জুড়েছেন নতুন মাত্রা। ইয়াওয়ের হাসান (Yawer Hassan), বংশজ শর্মা (Vanshaj Sharma)—নতুন তারকা, ব্যাটিং ভরসা। যুদ্ধবীর সিং (Yudhvir Singh), বাঁ-হাতি সুনীল কুমার (Sunil Kumar)—দ্রুতগতির বোলিং আক্রমণে এনেছেন গতি ও বৈচিত্র্য। সবচেয়ে বড় কথা, শেষ চার-পাঁচ ব্যাটার নিয়মিত ১৫০ রান যোগ করছেন। ন’নম্বরে নেমে ৪২ করে সামিদের (Mohammed Shami) ছত্রভঙ্গের নায়ক আকিব নবী। নিচের সারির এহেন ব্যাটিংই জম্মু দলকে আলাদা শক্তি দিয়েছে।
আকিব নবী—ধারাবাহিকতার নতুন নাম
এই দলের মেরুদণ্ড আকিব নবী (Auqib Nabi)। কব্জির ভঙ্গিতে সামির ছায়া, আউটসুইংয়ে ডেল স্টেইনের (Dale Steyn) আগ্রাসন। এই মরসুমে ৯ ম্যাচে ৫৫ উইকেট। গড় ১২.৭২। ছ’বার পাঁচ উইকেট শিকার। সংখ্যাই গল্প বলে দিচ্ছে!
বাংলার দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৯ অলআউট—তাঁর স্পেলেই ভিত তৈরি। শুধু বল নয়, ব্যাট হাতেও চরম অবদান। বারামুল্লা থেকে ৬০ কিমি দূরে প্র্যাকটিসে যেতেন ছোটবেলায়। এখন দিল্লি ক্যাপিটালসের (Delhi Capitals) সঙ্গে আইপিএলে মোটা টাকার চুক্তি। যদিও আপাতত লক্ষ্য একটাই—রঞ্জি শিরোপা, তারপর ভারতীয় জার্সি গায়ে চড়ানো।
নবী বলেছেন, ‘গত বছর ঠিক করেছিলাম, আর মাঝপথে থামব না। সুযোগ বারবার আসে না।’আত্মবিশ্বাসে কোনও কমতি নেই। জুড়ে দিয়েছেন, ‘ফাইনালও জিতব। আমরা যোগ্য টিম!’
সব মিলিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের কাহিনি শুধু ক্রিকেটীয় উন্নতির নয়, এটা মানসিকতারও অভিমুখ বদল। আগে হার এড়ানো ছিল একমাত্র টার্গেট। এখন যে কোনও মূল্যে জয় ছিনিয়ে নেওয়া। ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’তকমা ঝরে গেছে। জায়গা নিয়েছে পরিকল্পিত ক্রিকেট, দৃঢ় নেতৃত্ব আর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স।
ফাইনাল সামনে। কিন্তু তার আগেই প্রমাণিত—জম্মু-কাশ্মীর আর হঠাৎ চমক নয়, খেতাব জেতার ধারাবাহিক প্রতিদ্বন্দ্বী।