নিষ্ক্রমণের মুহূর্তে যেন ব্যাটের চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন তুলে দিলেন উসমান—এই খেলা, আর এই সমাজ… সত্যিই কি সবার জন্য সমান?

উসমান খোয়াজা
শেষ আপডেট: 2 January 2026 13:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্রিকেটাররা সাধারণত প্রেস কনফারেন্সে স্ক্রিপ্ট মেনে কথা বলেন। রান, ফর্ম, দল—এই তিনে ঘোরে আলোচনা। কিন্তু উসমান খোয়াজা (Usman Khawaja) কখনওই সেই ছাঁচে গড়া মানুষ নন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিজের শেষ টেস্টের আগে, চলতি অ্যাশেজের ফাইনাল ম্যাচের প্রাক্কালে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে তিনি জানালেন অবসরের সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই বিদায়ী সাংবাদিক বৈঠকে ক্রিকেট গৌণ। আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল বর্ণবিদ্বেষ, ইসলামোফোবিয়া, রাজনীতি—আর এক জীবনের জমে থাকা ক্ষত।
স্কোরবোর্ডের বাইরের গল্প
উজির কথায় স্পষ্ট ছিল ক্ষোভ আর ক্লান্তি। অ্যাশেজ শুরুর পর থেকেই যে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ডে’র মুখোমুখি হয়েছেন, তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁর মতে, এটা আজকের নয়—সারা কেরিয়ার জুড়েই চলেছে। মিডিয়ার একাংশের আচরণ, সমাজের গোপন পক্ষপাত—সব মিলিয়ে যেন বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে, তিনি ‘অন্যদের মতোই’। প্রান্তিক কিংবা সমাজের বাইরে আলাদা কেউ নন।
এই খোলাখুলি কথা বলার খেসারতও কি কম চোকাতে হয়েছে? খোয়াজা জানেন, ক্রিকেটের বাইরে কথা বললে সমালোচনা আসবেই। তবু তিনি চুপ থাকেননি। যাঁর কাছে ন্যায়বোধ আলাদা করে মাঠের ভেতর-বাইরের বস্তু নয়, তাঁর পক্ষে এমন পরিস্থিতিতে মুখে কুলুপ এঁটে থাকাটা হয়তো অসম্ভবও!
প্যালেস্তাইন থেকে পার্লামেন্ট: অনড় অবস্থান
প্রেস কনফারেন্সে উসমান সরাসরি জানালেন, প্যালেস্তাইন প্রসঙ্গে কথা বলায় অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন সহজ—স্বাধীনতা আর সমান অধিকারের কথা বললে কেন বিতর্ক হবে? উজির কথায়, ‘জানি, ক্রিকেটের বাইরে কিছু বিষয়ে কথা বলেছি বলে আমি নিজেকে খোলা মাঠে রেখে দিই। অনেকেই এটা পছন্দ করেন না। কিন্তু এখনও বুঝতে পারি না—সব মানুষ স্বাধীনতা পাবে, প্যালেস্তাইনবাসীরাও সমান অধিকার পাবে—একথা বলাটাই বা এত বড় সমস্যা কেন?’
পাশাপাশি তিনি স্বীকার করেছেন, এভাবে কথা বললে তাঁকে টার্গেট বানানো সহজ। বিশেষ করে ডানপন্থী রাজনীতির সমালোচনা করলে আক্রমণ আরও জোরালো হয়। খোয়াজার স্পষ্ট অভিযোগ, অস্ট্রেলিয়ার কিছু ডানপন্থী রাজনীতিক (right-wing politicians) ইচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসন-বিরোধী মনোভাব আর ইসলামোফোবিয়াকে উসকে দেন। বলেন, ‘ওরা যখন বিভাজন আর ঘৃণা তৈরি করতে চায়, আমি তখন ঠিক উল্টোটা করার চেষ্টা করি। তাই জানি, সবাই আমাকে ভালোবাসবে না!’
‘গ্যাসলাইট করবেন না’: বিদায়ের আগে শেষ বার্তা
সমালোচনার ধরন সম্পর্কেও তিনি সচেতন। খোয়াজা জানেন, অনেকেই বলবেন: ‘উজি আবার রেস কার্ড খেলছে।’তাই আগেভাগেই সতর্ক করে দেন, ‘ডোন্ট গ্যাসলাইট মি।’তাঁর মতে, এই ঘটনাগুলো নতুন নয়—ঘটে চলেছে প্রতিদিন। শুধু আমরা কথা বলি না।
শেষ যুদ্ধে নামার আগে, অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে ৮৮ টেস্ট খেলা অভিজ্ঞ ব্যাটার স্পষ্ট করে দিলেন—এই কথাগুলো বলার পেছনে ব্যক্তিগত ক্ষোভের চেয়েও বড় উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি চান, ভবিষ্যতের ‘পরের উসমান খোয়াজা’-র পথটা সহজ হোক। ‘আমি চাই না পরের উসমানকে আমার মতো লড়াই করতে হোক। আমি চাই সে—হোক ছেলে বা মেয়ে—সবার মতোই আচরণ পাক। কে কেমন দেখতে, কোন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে—এই স্টেরিওটাইপ যেন আর না থাকে।’বিদায়ী বার্তায় ক্রিকেটের বাইরে অনেক গভীর সত্যকে যেন ছুঁতে চান খোয়াজা। ময়দানে তাঁর অবদান নিয়ে ইতিহাস বিচার করবে। কিন্তু নিষ্ক্রমণের মুহূর্তে যেন ব্যাটের চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন তুলে দিলেন উসমান—এই খেলা, আর এই সমাজ… সত্যিই কি সবার জন্য সমান?