ছেলের ক্রিকেট স্বপ্নের জন্য বাড়ি বিক্রি করেছেন, ঋণের দায়ে জেলও খেটেছেন দলীপ... দলীপ চৌধুরি। ইডেনে কেকেআরের বিরুদ্ধে মুকুল চৌধুরির সেই অবিশ্বাস্য ২৭ বলে ৫৪ রানের ইনিংস কি সর্বস্বান্ত বাবার সব ঋণ এক রাতে মিটিয়ে দিল? পড়ুন এক হার না মানা জীবনযুদ্ধের গল্প।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 April 2026 16:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিয়ে হয়নি। ঠিক তখন থেকেই দলীপের ইচ্ছে—তাঁর সন্তান ক্রিকেটার হবে। নবজাতক মুকুলকে দেখে সেই স্বপ্ন বোনা শুরু। যা পূরণ করতে বাড়ি বেচেছেন, ঋণ নিয়েছেন, জেলও খেটেছেন! আত্মীয়রা মুখ ফিরিয়েছে। বলেছে 'পাগল'। তবু দলীপ চৌধুরি (Dalip Choudhary) এতটুকু দমেননি। গতরাতে ইডেন গার্ডেন্সে (Eden Gardens) অনামা মুকুল চৌধুরি (Mukul Choudhary) যখন ম্যাচের শেষ বলে লখনউকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়ছেন, নিশ্চিতভাবে দলীপের মনে পড়েছিল ফেলে আসা জীবন আর বিপর্যয়ের প্রতিটি মুহূর্ত।
'ছেলে জন্মানোর দিন থেকেই ঠিক করেছিলাম'
২০০৩ সালে পড়াশোনা শেষ। দলীপের বিয়েও হয় সেই বছর। পরের বছর মুকুলের জন্ম। দলীপের কথায়, 'ছোট থেকেই ঠিক করেছিলাম—ও ক্রিকেট খেলবে। এত মানুষ সফল হয়, আমার ছেলে কেন পারবে না?' ইতোমধ্যে রাজস্থান প্রশাসনিক পরীক্ষার (RAS) প্রস্তুতি নিলেন ছয় বছর। পাস করতে পারলেন না। রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ধরলেন। তাতেও ব্যর্থ। কিন্তু এত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন থেকে সরলেন না।
২০১৬ সালে বাধ্যত নিতে হল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বাড়ি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে সিকরের এসবিএস ক্রিকহাব (SBS Crickhub)। সেখানে ভর্তি করলেন মুকুলকে। শুরু হল পেশাদার প্রশিক্ষণ। উদয়াস্ত পরিশ্রম। ছেলের পাশাপাশি তিনিও নিজেকে উজাড় করে দিলেন।
বাড়ি বিক্রি, তারপর জেল
ভর্তির সময় বোঝেননি। পর টের পেলেন—হাতে টাকা নেই। একটাই পথ। বাড়ি বিক্রি। ২১ লক্ষ টাকা জুটল। সব ব্যাংকে রাখলেন, যাতে হিসেব থাকে। দলীপের কথায়, 'পরের বছর একটা হোটেল শুরু করলাম। আরও ঋণ নিলাম।' কিন্তু কিস্তি? সেটা চোকাতে পারলেন না। ঋণ মেটানো কঠিন হয়ে উঠল। এরপর? নেমে এল চূড়ান্ত বিপর্যয়৷ দলীপের দু:সহ স্মৃতিচারণ, 'হ্যাঁ, জেলেও গিয়েছি। কিন্তু কোনও প্রতারণা করিনি। কিস্তি সময়মতো দিতে পারিনি বলে এমন হয়েছে।'
আত্মীয়দের চোখে 'পাগল'
এই কঠিন সময়ে পাশে থাকার বদলে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাঁরা প্রত্যেকে আত্মীয়। আজ, যখন সবকিছু অনেকটাই ধাতস্থ, ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারেন না তাঁদের চেতাবনি, 'নিজের জীবন নষ্ট করেছ, এখন ছেলেকে ছেড়ে দাও।' দলীপের কথায়, 'ওদের প্রত্যেকটা কথা আমাকে আরও শক্ত করেছে। মনে হয়েছে, আমি ঠিক পথেই আছি।' আত্মীয়রা সঙ্গ না দিলেও পরিবার হাত ছাড়েনি। সকলে মিলেজুলে এগিয়ে গিয়েছেন।
রূপকথা লেখা হল ইডেনে
লখনউ সুপার জায়ান্টস (Lucknow Super Giants) বনাম কেকেআরের (Kolkata Knight Riders) ম্যাচে শেষ চার ওভারে দরকার ছিল ৫৪ রান। মুকুল একা লড়লেন। হাঁকালেন সাতটি ছয়। ২৭ বলে ৫৪ রান। শেষ বলে এল কাঙ্ক্ষিত জয়।
যে বাবা বাড়ি বিক্রি করেছেন, ঋণের জালে জেলে খেটেছেন, সমাজের কথায় কান না দিয়ে লড়ে গিয়েছেন—গতরাতে ইডেনে মারা মুকুলের প্রতিটা ছক্কায় বাবার বুকে একটু একটু করে জমা হওয়া সমস্ত চাপ হয়তো হালকা হয়েছে।
এই জয় শুধু মুকুলের নয়। সমানভাবে দলীপেরও।