আসলে এই পরিসংখ্যান তৈরি হয়েছে এক বিশেষ হিসাবনিকাশের দৌলতে। যে কারণে না খেলেও রেটিংয়ের চূড়ায় উঠে গিয়েছেন কোহলি। নেপথ্যে আইসিসির অ্যালগরিদম আপডেট এবং দুই বন্ধুর গল্প!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 20 July 2025 18:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরিয়ারের তুঙ্গে যখন, বোলারদের দাপটের সঙ্গে শাসন করেছেন, একহাতে ভেঙেছেন রেকর্ড, অন্যহাতে গড়েছেন, তখনও এই নজির বিরাট কোহলির (Virat Kohli) অধরা ছিল।
আজ যখন কেরিয়ারের অন্ত্যলগ্নে, টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন সদ্য, গত বছর টি-২০ ক্রিকেটকে আলবিদা জানিয়েছেন, তখন ক্রিকেটের তিন ফর্ম্যাটে ন’শোর উপর রেটিং (ICC Ratings) তোলার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করলেন কোহলি। টেস্টে ৯০৯, ওয়ান ডে-তে ৯৩৭ এবং টি-২০-তে ৯০৯—তিন মঞ্চে এমন মাইলস্টোন ছোঁয়ার রেকর্ড খুব বেশি কারও নেই।
কিন্তু এই সূত্রেই দানা বেঁধেছে প্রশ্ন: যিনি টি-২০ পাক্কা এক বছর খেলেননি, তিনি কীসের ভিত্তিতে এমন বড় অঙ্কে পৌঁছতে পারেন? আইসিসি র্যাঙ্কিং কি তবে স্রেফ কথার কথা? পরিসংখ্যান, পারফরম্যান্স—কিছুই কি দেখা হয় না?
বিরাটের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, ক্রিকেটে এমনটা আগে হয়নি—একথা ঠিক। একজন ক্রিকেটার ময়দানে নামেননি বেশ কয়েক মাস, তবু হঠাৎ একদিন তিনি সবাইকে ছাপিয়ে উঠে এলেন তালিকার শিখরে। রহস্য কী?
একটু ধোঁয়াশা রেখেই এর উত্তর হতে পারে: দুই বন্ধুর কম্পিউটার নাড়াঘাঁটা আর নয়া অ্যালগরিদম আবিষ্কার!
গত বুধবার আইসিসি-র পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়, বিরাট কোহলি প্রথম খেলোয়াড়, যিনি তিনটি ফরম্যাটেই ন’শোর বেশি রেটিং পেয়েছেন। শুধু পুরুষ ক্রিকেটেই নয়, মহিলা ক্রিকেটেও এমন নজির বিরল। অথচ অদ্ভুত কাণ্ড: টি-টোয়েন্টিতে কোহলি শেষ ম্যাচ খেলেছেন গত বছর। বিশ্বকাপ জেতার পরেই নিয়েছেন অবসর। তাহলে এই নতুন রেটিং এল কোথা থেকে?
আসলে এই পরিসংখ্যান তৈরি হয়েছে এক বিশেষ হিসাবনিকাশের দৌলতে। যে কারণে না খেলেও রেটিংয়ের চূড়ায় উঠে গিয়েছেন কোহলি। নেপথ্যে আইসিসির অ্যালগরিদম আপডেট এবং দুই বন্ধুর গল্প!
আর সেই গল্প জানতে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮৬ সালে। গর্ডন ভিন্স (Gordon Vince) নামে এক পেশাদার প্রোগ্রামার একদিন খেলার ছলে একটি ‘ক্রিকেট সিমুলেশন সফটওয়্যার’ বানিয়ে ফেলেন। যেখানে তিনি কাল্পনিক ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট ম্যাচের একটি কাল্পনিক স্কোরকার্ড দাঁড় করান। সেই রানের তালিকা এতটাই বাস্তবোচিত ছিল যে, রব ইস্টঅ্যাওয়ে (Rob Eastaway), ভিন্সের কাছের বন্ধু, আপ্লুত হয়ে লিখে ফেলেন আস্ত ম্যাচ রিপোর্ট! তারপর সেটা পাঠিয়েও দেন ‘দ্য ক্রিকেটার’ (The Cricketer) ম্যাগাজিনে।
দুই বন্ধুকে চমকে দিয়ে পত্রিকার ঠিক পরের সংখ্যায় সেই নিবন্ধ ছেপে বেরয়। ক্রিকেটবিশ্বের নজরে আসে গর্ডন আর রবের আজব কীর্তি! এতটাই চর্চা শুরু হয় যে, ইংল্যান্ডের তখনকার অধিনায়ক টেড ডেক্সটার (Ted Dexter) তাঁদের ডেকে পাঠান। শুরু হয় আলাপ। কথায় কথা বাড়ে আর জন্ম নেয় ক্রমাঙ্ক নির্ণয়ের প্রাথমিক খসড়া। যা আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের প্রথম রূপরেখা গড়ে দেয়!
যত সময় গড়ায়, অ্যালগরিদম বদলে যায়। একাধিক প্রশ্ন ওঠে। যেমন, একটা ম্যাচ বা এক ইনিংসের ভিত্তিতে কাউকে একেবারে ওপরে তুলে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? ১৯৮৮-তে নবাগত নরেন্দ্র হিরওয়ানি বা শ্রীলঙ্কার ব্রেন্ডন কুরুপ্পু মাত্র একটি ম্যাচ খেলে অবাস্তব রেটিং পেয়ে গিয়েছিলেন। তখন থেকেই শুরু হয় রেটিংয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা।
খোলনলচে বদলে বিস্তারিত পরিবর্তন আসে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি। আইসিসি ঘোষণা করে, এখন থেকে সব দেশের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ পূর্ণ মর্যাদা লাভ করবে। যার অর্থ: রোমানিয়া, গ্রিস, মাল্টা, সার্বিয়ার মত দেশও যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলে, তবুও সরকারি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ বলে গণ্য হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে দেখা দেয় এক নতুন সমস্যা—তথাকথিত খাটো দেশের খেলোয়াড়দের খাতায়-কলমে দুর্দান্তপরিসংখ্যান। কিন্তু তাঁরা তো কখনও বড় দলের বিরুদ্ধে খেলেন না। তাহলে তাঁদের রেটিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে রোমানিয়ার অলরাউন্ডার রেবেকা ব্লেকের নাম। মাত্র ১৩ ম্যাচ খেলে ২টি সেঞ্চুরি, ৫টি হাফ সেঞ্চুরি—ব্যাটিং গড় একশোর উপর! বল হাতেও উইকেটপ্রতি রান মাত্র ২৪, ইকোনমি ছয়ের নিচে। কিন্তু তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল গ্রীস, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, সার্বিয়া। প্রশ্ন ওঠে—এমন খেলোয়াড়কে কতটা ওপরে তোলা উচিত?
বিতর্কের টানেই আসল প্রশ্ন জেগেছে: র্যাঙ্কিং কি শুধু পারফরম্যান্স দেখবে? না মাপবে প্রতিপক্ষের মানও?
এই চক্করে দাঁও মেরেছেন কোহলি। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে ৪১ বলে ৬৬ রান করেছিলেন। সেই পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সে সময় তাঁর রেটিং দাঁড়ায় ৮৯৭। এতদিন সেটাই ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু চলতি বছর যখন আইসিসি টি-টোয়েন্টি রেটিংয়ের পুরনো হিসাবগুলো নতুন ফর্মুলায় রিফ্রেশ করে, তখন সেই পারফরম্যান্স নতুন অ্যালগরিদমে আরও বেশি গুরুত্ব পায়। এর ফলে তাঁর রেটিং বেড়ে দাঁড়ায় ৯০৯—যা আগে কখনও হয়নি!
তবে সমস্যা একটাই—এই আপডেট নিয়মিত হয় না। শেষ হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ফলে কোহলি-সহ অনেকেই হঠাৎ বদলে যাওয়া রেটিংয়ে ওঠানামা করলেন। কেউ কেউ নতুন রেকর্ডের শিখরে পৌঁছে গেলেন, আবার কেউ পড়লেন পিছিয়ে।
আইসিসি-র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অনেক সময়েই এই রেটিংয়ের সঠিক তথ্য দেয় না। বরং গর্ডন ভিন্স এবং রব ইস্টঅ্যাওয়ের তৈরি এই সাইটটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। সেখানে শুধু বর্তমান নয়, বরং তারিখ অনুযায়ী ইতিহাস-সহ সব তথ্য পাওয়া যায়। ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এ এক লুপ্ত রত্নভাণ্ডার বৈকী!