আজ থেকে আট বছর আগে বিমানবন্দরে পতাকা নেড়ে যাঁদের স্বাগত জানিয়েছিলেন, তাঁদেরই পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই জিতলেন জেমাইমা। নাদান ‘ফ্যান’ এখন ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ‘ফিনিশার’।

'বিজয়িনী' জেমাইমা
শেষ আপডেট: 31 October 2025 13:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৭ সাল। কিশোরী তখন। টেলিভিশনের পর্দায় হরমনপ্রীত কৌরের (Harmanpreet Kaur) ১৭১ রানের ইনিংস দেখে মুগ্ধ। একদিনেই ফ্যান বনে যান!
আট বছর পর সেই মেয়েই অস্ট্রেলিয়াকে (Australia) হারিয়ে ভারতকে (India) তুললেন বিশ্বকাপ ফাইনালে। সেদিনের ফ্যান, আজ মাঠে শেষতক দাঁড়িয়ে এনকাউন্টার খতম করলেন! ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে (DY Patil Stadium) বৃহস্পতিবার মহিলাদের বিশ্বকাপের (Women’s World Cup) শেষ চারের লড়াইয়ে জেমাইমা রদ্রিগেসের অপরাজিত ১২৭ রান থামাল অস্ট্রেলিয়ার ১৫ ম্যাচের জয়রথ। ১৬ বছর বয়সে একদিন হরমনের মতো ইনিংস খেলার স্বপ্ন দেখা কিশোরী আজ নিজেই নায়িকা!
২০১৭ সালের সেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেই ভারত রুখে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার টানা ২৬ ম্যাচ জিতে চলার রেকর্ড। একদিনেই খ্যাতির চূড়ায় উঠে যান হরমনপ্রীত কৌর। মুম্বইয়ের এক কিশোরী তখন হকির স্টিক ছেড়ে হাতে নিয়েছেন ক্রিকেট ব্যাট। ব্রিস্টলের মাঠে হরমনপ্রীতের ছক্কায় যেন নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন জেমাইমা। কয়েক দিন পর মুম্বই বিমানবন্দরে ভারতীয় দল ফিরলে তেরঙা পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি—চোখে পরাজয়ের ছায়া নয়, শুধুই অনুপ্রেরণা।
২০২৫ সালে ছবিটা উলটে গেল। এবার মাঠে ছিলেন জেমাইমা নিজে, সঙ্গে স্বপ্নের নায়িকা হরমনপ্রীত কৌর। প্রতিপক্ষ সেই অস্ট্রেলিয়া—অপরাজিত, আত্মবিশ্বাসী, প্রবল শক্তিশালী। আগের ম্যাচে ৩৩১ রান তাড়া করে জিতেছিল ভারতেরই বিরুদ্ধে। এবার সেমিফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে তুলল ৩৩৮। শুরুর ১০ ওভারের মধ্যেই ফিরে গেলেন স্মৃতি মান্ধানা (Smriti Mandhana)।
কিন্তু এখান থেকেই কামব্যাকের লড়াই শুরু করল জেমাইমা–হরমন জুটি। একেকটা সিঙ্গল, একেকটা ড্রাইভ, একেকটা সীমানা পেরনো বল বাঁধল ১৬৭ রানের পার্টনারশিপ, যা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ।
হরমনপ্রীত থেমে যান ৮৯ রানে। ব্যথায় নড়তে পারছিলেন না, ভুল শটে আউট। কিন্তু জেমাইমা তখনও অটল। শেষ পর্যন্ত ক্রিজে দাঁড়িয়ে ভারতের জয় নিশ্চিত করেন। তাঁর ১২৭ রানের ইনিংসে ছিল ১৪টি চার, কোনও ছয় নয়—অর্ধেক রানই দৌড়ে তোলা। ক্লান্ত শরীর, তবু নির্ভুল হিসেব। ‘সে আমার হয়ে ক্যালকুলেশন করছিল,’ ম্যাচের পরে বলেন হরমনপ্রীত, ‘আমরা প্রতিটা ওভারে কত রান তুলেছি, ও আগেই বলে দিচ্ছিল!’
অথচ এই ইনিংসের পেছনে লুকিয়ে এক লম্বা সংগ্রামের গল্প। গত বিশ্বকাপে বাদ পড়েছিলেন জেমাইমা। ২০২২ সালে ফর্মহীনতায় বাইরে বসে দেখতে হয়েছে অন্যদের। কেউ বলেছে, ‘রিলস কুইন’, কেউ, ‘ক্রিকেটে মন নেই’। ব্যাটের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় দেন বেশি। চাপ, উদ্বেগ, আত্মসংশয়—সব কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই!
ইংল্যান্ডের (England) বিরুদ্ধে খারাপ পারফরম্যান্সের পর দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। কিন্তু নিজেকে আবার গুছিয়ে তোলেন নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) বিরুদ্ধে। নিজের শহরে, দর্শকের সামনে ৭০ রানের ঝলমলে ইনিংসে। সেখান থেকেই শুরু প্রত্যাবর্তন। মাত্র ১০ মিনিট আগে জানতে পারেন—অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিনি ব্যাট করবেন তিন নম্বরে। সেটাই বদলে দিল ভাগ্য!
‘যখন বাদ পড়েছিলাম, তখন নিজেকে বোঝাতাম—নিজের কিছু প্রমাণ করতে নয়, দলের জন্য খেলতে হবে!’ ম্যাচ শেষে বললেন জেমাইমা। বিশ্বাস রেখেছেন, স্থির থেকেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যাটই লিখে দিয়েছে ভারতের ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রান চেজ—৩৩৯-এর প্রকাণ্ড লক্ষ্য পেরিয়ে জয়।
আজ থেকে আট বছর আগে বিমানবন্দরে পতাকা নেড়ে যাঁদের স্বাগত জানিয়েছিলেন, তাঁদেরই পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই জিতলেন জেমাইমা। নাদান ‘ফ্যান’ এখন ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ‘ফিনিশার’।